শেরপুরের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ে মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্য নিয়ে একের পর এক অভিযোগ উঠলেও থামছে না মাদক পাচার। বরং মাদক পাচারের তথ্য সংগ্রহে সাংবাদিকদের প্রবেশ ঠেকাতে এবার ‘নিষিদ্ধ এলাকা’ বানানোর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, সীমান্তের গোমড়া, সন্ধ্যাকুড়া, হলদীগ্রাম ও রাংটিয়া এলাকায় কোনো সাংবাদিক প্রবেশ করলে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
এর আগে মাদক পাচার নিয়ে সংবাদ সংগ্রহের কারণে হামলার শিকার হন দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার ঝিনাইগাতী উপজেলা সংবাদদাতা খোরশেদ আলম। ২০২৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে নলকুড়া ইউনিয়নের সন্ধ্যাকুড়া বাজারে তার ওপর মব হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে। হামলায় গুরুতর আহত হন তিনি। এ সময় তার মোটরসাইকেল, মোবাইল ফোন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে পুলিশ মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করলেও প্রায় এক বছরেও মোবাইল ফোনটি উদ্ধার হয়নি বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভারত সীমান্তবর্তী এসব এলাকা দিয়ে দিন-রাত অবাধে বিপুল অর্থের মাদক পাচার হচ্ছে। মাদক পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন যানবাহন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কয়েকটি যানবাহন আটক হলেও পাচার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকার পরও অনেক মাদক কারবারি প্রকাশ্যে তৎপর রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
অভিযোগ রয়েছে, মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িতদের একটি অংশ স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় তারা নানা ধরনের সুরক্ষা ও আইনি সহায়তা পেয়ে থাকে। কোনো কারবারি আটক হলে দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও একই কাজে যুক্ত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, একটি বিশেষ বংশগোষ্ঠীর কয়েকটি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
২০২৫ সালে নলকুড়া ইউনিয়নের গোমড়া গ্রামের অনাহারি ও গৃহহীন বিধবা সখিনা বেগমকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে আর্থিক সহায়তা আসে। ওই অর্থে তার জন্য একটি টিনশেড ঘর নির্মাণ করা হয়। ঘর নির্মাণের সময় সাংবাদিক খোরশেদ আলম সেখানে গেলে স্থানীয়ভাবে মাদক পাচারসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য তার কাছে আসে বলে তিনি জানান।
তার দাবি, এ সময় স্থানীয় এক ইউপি সদস্য তাকে ওই এলাকায় যেতে নিষেধ করেন। পরে মাদক পাচার নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পরই সন্ধ্যাকুড়া বাজারে তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
এলাকাবাসীর দাবি, মাদক পরিবহনে আটটি কভার্ড ভ্যান ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে চারটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হলেও বাকি চারটি এখনও মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক পাচার এখন ওইসব এলাকায় অনেক পরিবারের দীর্ঘদিনের পেশায় পরিণত হয়েছে এবং এক প্রজন্মের পর আরেক প্রজন্ম এ কাজে যুক্ত হচ্ছে।
তবে স্থানীয়দের করা ‘এলাকার ৯০ শতাংশ মানুষ মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত’—এমন দাবির পক্ষে সরকারি বা নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
গ্রামবাসীরা জানান, ২০২৫ সালে ওই এলাকার কয়েকজন ব্যক্তি পিকআপভ্যানে করে মাদক নিয়ে ময়মনসিংহের ফুলপুরে যায়। সেখানে একটি গোয়েন্দা সংস্থা তাদের অনুসরণ করলে তারা পিকআপভ্যান নিয়ে নকলা উপজেলার একটি পল্লী এলাকায় চলে আসে। সেখানে গরুচোর সন্দেহে স্থানীয়দের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। পরে গণপিটুনিতে মসলেউদ্দিন ও নুর ইসলাম নামে দুই ব্যক্তি নিহত হন বলে স্থানীয়রা জানান।
তাদের মৃত্যুর পর পরিবারের অন্য সদস্যরা আবারও মাদক ব্যবসায় জড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সীমান্ত এলাকায় মাদক পাচার নিয়ে চলতি মাসে অনুষ্ঠিত ঝিনাইগাতী উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক রুবেলসহ কমিটির সদস্যরা। সভায় মাদক পাচার বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নলকুড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রুকুনুজ্জামান বলেন, এলাকায় মাদক পাচার রোধে স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
ঝিনাইগাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম নুর মোহাম্মদ বলেন, তিনি সম্প্রতি থানায় যোগদান করেছেন। যোগদানের পর কয়েকটি অভিযানে তিন লাখ টাকার বেশি মূল্যের মাদক উদ্ধার করা হয়েছে এবং মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। মাদক পাচার
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানার পরও সীমান্তে মাদক পাচার কীভাবে অব্যাহত রয়েছে? আর মাদক পাচারের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের যদি হামলা ও হত্যার হুমকির মুখে পড়তে হয়, তাহলে সীমান্তের এই ‘নিষিদ্ধ এলাকা’য় আসলে কার নিয়ন্ত্রণ চলছে—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

