জীবনের সঙ্গে সংগ্রাম করে আজও টিকে আছে বেদে সম্প্রদায়। জীবন ও জীবিকার তাগিদে অনেক বেদে দল বেঁধে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে বেড়ায়। কোথাও স্থায়ীভাবে বসবাস না করায় পরিবারের সঙ্গে যাযাবরের মতো জীবন কাটে শিশুদেরও। তাই বিদ্যালয় চোখে পড়ে না এই শিশুদের। শিক্ষাগ্রহণের মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিতই থাকে শিশুরা।
সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখে বেদে সমাজের প্রচলিত ব্যবসাকেই আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন তারা। তবে পূর্বপুরুষের পেশাগত কারণে সামাজিকভাবে অবহেলিত ও অভিভাবকদের সচেতনতার অভাবে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বেদে শিশুরা।
এক জন কোমলমতি শিশুর হাতে যখন বইখাতা থাকার কথা, তখন বেদে শিশুর হাতে তুলে দেওয়া হয় সাপের বাক্স। বাবা ও মায়ের দেখাদেখি ছোট থেকেই এসব পেশায় জড়িয়ে পড়ছে এ সম্প্রদায়ের শিশুরা। বেড়ে উঠছে কোনো ধরনের একাডেমিক শিক্ষা ছাড়াই। তাদের কাছে শিক্ষা বলতে, সাপ ও বাদর খেলা শেখা। বাজার ও গ্রামেগঞ্জে সাপ খেলা ও বিভিন্ন কাজে বাবা ও মাকে সহযোগিতা করাই তাদের মূল কাজ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার পাগলা বাজারসংলগ্ন টিএনটি মাঠে বাঁশের চেরা ও পলিথিনের সাহায্যে অস্থায়ী ছোট ছোট ডেরা বেঁধে খুপরি ঘরে ঘাঁটি গেড়ে বাস করছেন প্রায় ৩০টি বেদে পরিবার।
বেদে শিশু মুহিনা বেগম (১২) জানায়, কোনোদিন স্কুলে যাইনি। এই এলাকার ছেলেমেয়েদের স্কুলে যেতে দেখে আমারও স্কুলে গিয়ে লেখাপড়া কর?তে ইচ্ছে হয়। কিন্তু ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা বাবামায়ের সঙ্গে গ্রামের পাড়া-মহল্লায় ঘুরে বেড়াই। গ্রামের শিশুদের খেলা দেখাই। লেখাপড়া করে আমরা অন্য পেশায় কাজ করতে চাই।
বেদেনি হেলেনা বিবি (৪০) জানান, আমাদের শিশুদের পড়াশোনা করানোটা কঠিন। জীবিকা অন্বেষণে শিশুরাও আমাদের সহযোগিতা করে। আর্থিক অসচ্ছলতা আর ভাসমান জীবনে শিক্ষা আমাদের শিশুদের জন্য দুর্বোধ্য ব্যাপার। শিশুদের পড়াশোনার আগ্রহ থাকলেও পরিস্থিতির কারণে সেটা আর হয়ে ওঠে না।
বেদে সর্দার শেখ মিয়া (৬০) জানান, সারা দিন বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে ফিরে আসতে প্রায়ই সন্ধ্যা হয়ে যায়। আমাদের সাহায্যের জন্য শিশুদেরও নিয়ে যাই। তাদের পেশাগত বিভিন্ন বিষয় শেখাই। তবে কোনো অভিভাবক চায় না, তার সন্তান অশিক্ষিত থাকুক। আমাদের অল্প আয়ে সন্তানদের পড়াশোনা চালানো কঠিন। আমাদের এখানে অনেক শিশু রয়েছে। তারা কেউ স্কুলে যায় না। তারা নিজের নামটাও লেখতে পারে না।
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ রজত কান্তি সৌম বলেন, অনেক সময় অনেক বেসরকারি সংগঠন এসব পরিযায়ী শিশুদের জন্য নানা ধরনের প্রকল্প নিয়ে থাকে। সরকারও চেষ্টা করে যাচ্ছে তাদের মধ্যে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে। সমস্যা হচ্ছে তাদের বসবাস একটি নির্দিষ্ট জায়গায় না থাকা। এ কারণে এসব উদ্যোগ সব সময় সফল হয় না।
তিনি বলেন, তাদের পুনর্বাসনের আওতায় এনে সাধারণ শিশুদের মতো‘মেইন স্ট্রিমথ’শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বেদে পল্লীর মানুষদের পেশাবদলের চিন্তা করতে হবে। আপাতত মোবাইল স্কুলের মাধ্যমে তাদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

