কম্পিউটার ও অনলাইন সুরক্ষার ১০ ধা¬প

আপডেট : ২৪ জুন ২০১৯, ২০:৫২

প্রযুক্তিবিশ্বের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অনলাইন কিংবা অফলাইনে পিসি এবং বিভিন্ন অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা। প্রযুক্তিবিশ্বের এগিয়ে যাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে এবং কখনো কখনো প্রযুক্তিবিশ্বের চাইতেও হ্যাকাররা এগিয়ে থাকায় পিসি এবং অনলাইন অ্যাকাউন্টগুলোকে নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রে এখন বাড়তি নানা ধরনের কসরত করতে হচ্ছে সবাইকে। এমন ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বলয় গড়ে তুলতে ১০টি কার্যকরী ধাপ এই লেখায় তুলে ধরা হলো—

 

শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ও পাসওয়ার্ড ম্যানেজার ব্যবহার করা

যেকোনো ধরনের অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তায় প্রথম এবং প্রধান অস্ত্র হলো শক্তিশালী এবং কঠিন একটি পাসওয়ার্ড। প্রচলিত শব্দ এবং ছোট ছোট শব্দের পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা হলে তা হ্যাক করা হ্যাকারদের জন্য অনেক সহজ। তাই পাসওয়ার্ডকে যথাসম্ভব শক্তিশালী করে তুলতে হবে। এরজন্য আপনি মনে রাখতে পারবেন এমন কোনো শব্দই প্রথমে বেছে নিতে হবে। এরপর ওই শব্দটিকে একটু ভিন্নভাবে ব্যবহার করতে পারেন পাসওয়ার্ড হিসেবে। এক্ষেত্রে শব্দটিকে একাধিক ভাগে ভাগ করে এই ভাগগুলোকে উল্টিয়ে নিতে পারেন। আবার লেখার সময় বড় ও ছোট হাতের অক্ষর ব্যবহার করলে পাসওয়ার্ডটির শক্তি বেড়ে যাবে। সেই সাথে যুক্ত করুন কিছু সংখ্যা। সমর্থন করলে হ্যাশ বা অ্যাট দ্য রেটের মতো বিভিন্ন প্রতীকও ব্যবহার করতে পারেন। তাতে পাসওয়ার্ড ভাঙা কঠিন হবে। আর একই পাসওয়ার্ড একাধিক অ্যাকাউন্টে কখনই ব্যবহার করবেন না। তবে অনেক অনেক অ্যাকাউন্টে এমন জটিল জটিল সব অনন্য পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে তা মনে রাখার কাজটিও কঠিন। এক্ষেত্রে ভালো একটি পাসওয়ার্ড ম্যানেজারের ব্যবহার আপনাকে অনেকটাই সুরক্ষিত রাখবে। সেক্ষেত্রে পাসওয়ার্ড ম্যানেজারটি নিজে থেকেই বিভিন্ন অ্যাকাউন্টের জন্য জটিল সব পাসওয়ার্ড তৈরি করে দেবে। আপনাকে কেবল পাসওয়ার্ড ম্যানেজারের জন্য একটি অসম্ভব শক্তিশালী পাসওয়ার্ড তৈরি করে দিতে হবে। ওয়ানপাস, কিপাস, লস্টপাস প্রভৃতি পাসওয়ার্ড ম্যানেজারগুলোকে বিশেষজ্ঞরা নির্ভরযোগ্য মনে করে থাকেন।

 

প্রি-ইনস্টলড সফটওয়্যার ও বোল্টওয়্যার দূর করুন

কিছুদিন আগেই লেনোভোর পিসি ও ল্যাপটপে সুপারফিশ সফটওয়্যার ব্যবহারের ঘটনা সাড়া ফেলেছে প্রযুক্তিবিশ্বে। এই সফটওয়্যারটি গ্রাহক অভিজ্ঞতা সুখকর করার নামে পিসির অনেক তথ্যই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পাচর করত। বিভিন্ন পিসি বা ল্যাপটপে হয়তো এমন অনেক প্রি-ইনস্টলড সফটওয়্যার থাকতে পারে, যা আপনার তেমন একটা কাজে লাগবে না কিন্তু তা আপনার তথ্য হাতিয়ে নিতে সহায়তা করবে কোম্পানি বা হ্যাকারদের। স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট পিসির মতো ডিভাইসেও দেখা মিলবে এমন নানা ধরনের প্রি-ইনস্টলড অ্যাপসের, যেগুলোকে বলা হয়ে থাকে বোল্টওয়্যার। এগুলো যেসব কাজ করবে সেসব কাজ সম্পন্ন করার জন্য প্রচুর বিশ্বস্ত অ্যাপস পাবেন অ্যাপ স্টোরগুলোতে। তাই প্রি-ইনস্টলড এসব বোল্টওয়্যারের হাত থেকে মুক্ত থাকুন। তাতে নিরাপত্তায় খানিকটা হলেও এগিয়ে থাকতে পারবেন।

 

অনলাইন অ্যাকাউন্টে দ্বি-স্তর নিরাপত্তা যুক্ত করুন

সব ধরনের অনলাইন অ্যাকাউন্টেই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে আমরা প্রবেশ করে থাকি। তবে এখন বেশিরভাগ অনলাইন অ্যাকাউন্টেই দ্বি-স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা যুক্ত করার সুবিধা রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় কোনো অ্যাকাউন্টে প্রবেশের সময় পাসওয়ার্ড চাপার পরেও ওই অ্যাকাউন্টের সাথে সংশ্লিষ্ট মোবাইল নম্বরে বা কোনো ইমেইল অ্যাকাউন্টে আরও একটি কোড পাঠানো হয়ে থাকে। ফলে আপনার পাসওয়ার্ডটি কেউ জেনে গেলেও দ্বি-স্তর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কেউ আপনার অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে পারবে না যতক্ষণ না পর্যন্ত আপনার মোবাইল বা অন্য কোনো ইমেইল অ্যাকাউন্ট তার হস্তগত হবে। অনেক অনলাইন অ্যাকাউন্টে এখন প্রতিবার প্রবেশের জন্য একটি করে ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড প্রদানের প্রবণতা চালু হয়েছে। এসব অ্যকাউন্টের ক্ষেত্রে ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড হতে পারে আপনার সুরক্ষার হাতিয়ার।

 

ফুল ডিস্ক এনক্রিপশন সক্রিয় রাখুন

আপনার স্টোরেজ ডিভাইসের রক্ষিত ডাটার সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য ব্যবহার করতে পারেন ফুল ডিস্ক এনক্রিপশন পদ্ধতি। এটি চালু করলে আপনার হার্ডডিস্ক বা স্টোরেজ ডিভাইস থেকে যে তথ্যই নেওয়া হোক না কেন, আপনার ব্যবহূত পাসওয়ার্ড ছাড়া তা অর্থহীন আঁকিবুকি হিসেবেই থেকে যাবে; ওই তথ্য কেউ উদ্ধার করতে পারবে না। এনক্রিপশনের জন্য বিভিন্ন ধরনের ওপেন সোর্স এবং ফ্রি সফটওয়্যারগুলোকেই মূলত নির্ভরযোগ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে থাকে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। সেক্ষেত্রে ট্রুক্রিপ্ট বা ভেরাক্রিপ্টের মতো এনক্রিপশন সফটওয়্যার হতে পারে আপনার সহায়। মাইক্রোসফটের বিটলকার বা অ্যাপলের ফাইল ভল্ট এক্ষেত্রে হ্যাকারদের হাত থেকে আপনার তথ্য অনেকটাই সুরক্ষিত রাখতে পারলেও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের হাত থেকে আপনার তথ্য সুরক্ষিত রাখতে পারবে না।

 

সর্বত্র এইচটিটিপিএস ব্যবহার করুন

অনলাইন ব্রাউজিংয়ের সুরক্ষার কথা মাথায় রাখলে সব ধরনের ওয়েবে প্রবেশের জন্য ব্যবহার করতে পারেন এইচটিটিপিএস প্রটোকল। প্রচলিত এইচটিটিপির তুলনায় এইচটিটিপিএসকে বিশেষজ্ঞরা অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য হিসেবে মনে করে থাকেন। তাই সব ধরনের ওয়েবসাইটে প্রবেশের ক্ষেত্রেই এইচটিটিপিএস ব্যবহার করুন। আলাদা করে প্রতিটি ওয়েবসাইটে এইচটিটিপিএস ব্যবহার করার কাজটি বিরক্তি উত্পাদন করলে গুগল ক্রোম বা মজিলা ফায়ারফক্স ওয়েব ব্রাউজারের জন্য এইচটিটিপিএস এক্সটেনশন ব্যবহার করুন। সেক্ষেত্রে এই এক্সটেনশনটি আপনার ব্রাউজার থেকে প্রবেশ করা সব ওয়েবসাইটেই এইচটিটিপিএস প্রটোকল স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত করে দেবে।

জাভা ও অ্যাডোবি প্লাগ-ইন নিষ্ক্রিয় রাখুন

বিভিন্ন ধরনের ওয়েবসাইটের কনটেন্ট চালানোর জন্য অনেক সময় জাভা বা অ্যাডোবির বিভিন্ন প্লাগ-ইনসের চাহিদার কথা বলা হয়ে থাকে। বিভিন্ন মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট চালানোর জন্য এই ধরনের প্লাগ-ইন দরকার হলেও তা শেষ পর্যন্ত আপনার ভালোর চাইতে খারাপটাই বেশি করে থাকে। ওয়েব ব্রাউজিংয়ের সময় জাভা এবং অ্যাডোবি প্লাগ-ইনসের নানা ধরনের তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার রেকর্ড রয়েছে। তাই এসব প্লাগ-ইন যথাসম্ভব নিষ্ক্রিয় রাখুন বা আন-ইনস্টল করে রাখুন।

 

ব্রাউজারের তথ্য গোপন রাখুন

আপনার ওয়েব ব্রাউজিংয়ের তথ্য যদি কাউকে জানাতে না চান, তাহলে টর ব্রাউজার ব্যবহার করতে পারেন। নানা ধরনের অনলাইন টুলসের মাধ্যমে এখন ওয়েব ব্রাউজিংয়ের তথ্য হাতিয়ে নিয়ে থাকে হ্যাকাররা। ব্যবসায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোরও আগ্রহ থাকে এসব তথ্যে। তাই আপনার ওয়েব ব্রাউজিংয়ের তথ্যকে কারও সাথে শেয়ার করতে না চাইলে টর নামের ব্রাউজারটি ব্যবহার করতে পারেন। এটি মূলত একটি প্রক্সি ব্রাউজার যা ওয়েব ব্রাউজিংয়ের সময় আপনার ব্যবহূত সব ধরনের অ্যাকাউন্টের তথ্যকে গোপন রাখতে পারে।

 

হালনাগাদ থাকুন সবসময়

অপারেটিং সিস্টেম থেকে শুরু করে সব ধরনের সফটওয়্যারের আপডেটের মাধ্যমেই মূলত সেগুলোকে আগের সংস্করণের তুলনায় আরও সুরক্ষিত করা হয়ে থাকে। তাই অপারেটিং সিস্টেম থেকে শুরু করে সব ধরনের সফটওয়্যারের প্যাচ এবং আপডেট নিয়মিত ইনস্টল করুন পিসি বা অন্য যেকোনো ডিভাইসে। এতে করে সাধারণ ম্যালওয়্যার বা স্পাইওয়্যার থেকে পিসিকে মুক্ত রাখতে আর বাড়তি কিছু করার প্রয়োজন হবে না।

 

অ্যাড-ব্লকার ব্যবহার করুন

ট্র্যাকিং কুকির উপস্থিতি এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইনস্টল হয়ে যাওয়া রোধ করতে ভালো মানের অ্যাড-ব্লকার ব্যবহার করুন আপনার ব্রাউজারে। অ্যাপলের সাফারি, গুগলের ক্রোম, মজিলার ফায়ারফক্স—সব ব্রাউজারের জন্যই এমন অ্যাড-ব্লকার পাওয়া যায় প্লাগ-ইনস বা অ্যাড-অনস হিসেবে। এক্ষেত্রেও চেষ্টা করুন যথাসম্ভব ওপেন সোর্স বা ফ্রি সলিউশন ব্যবহার করতে। এক্ষেত্রে ইউব্লক নামের অ্যাড-ব্লকারের ওপর নির্ভর করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন অনেকেই।

 

ওয়াই-ফাইয়ের জন্য ভিপিএন ব্যবহার করুন

পাবলিক ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক ব্যবহারকে নিরুত্সাহিত করে থাকেন বেশিরভাগ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ। তারপরেও পাবলিক ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে চাইলে ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক ব্যবহারের পরামর্শই প্রদান করে থাকেন তারা। হটস্পটশিল্ড বা ওপেনডিএনএসের মতো সব সেবা এক্ষেত্রে পাবলিক ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কেও আপনার সব ধরনের কার্যক্রম ও পরিচিতি গোপন রাখবে।