রাজধানীর আগারগাঁওয়ের একটি ঝুপড়ি হোটেলে কাজ করে ১০ বছরের সুজন মিয়া। সে গত বছর ঢাকা শহরে এসেছে। সুজন মিয়া বলে, তার বাড়ি ছিল গাইবান্ধা জেলার মোল্লার চরে, ব্রহ্মপুত্র নদের ওপারে। নদীতে তাদের বাড়ি তলিয়ে গেছে। এখন তার বাবা রিকশা চালায়, মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে, আর সে হোটেলে কাজ শেখে। সারা দিনে দু-বেলা খাওয়া আর মজুরি ১০০ টাকা পায় বলে জানায় সুজন মিয়া। গ্রামে এনজিওর স্কুলে পড়ত কিন্তু এখন নদীভাঙনের ফলে তার স্কুলে পড়া বন্ধ হয়ে গেছে।
সাতক্ষীরার কলারোয়ার চন্দনপুরের বাসিন্দা জামিলা বেগম। তিনি রাজধানীর একটি ফ্ল্যাট বাড়িতে কাজ করেন। তার দুই মেয়ে, এক ছেলে। মেয়েটি গ্রামের স্কুলে লেখাপড়া করলেও এখন বিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। আর ছেলেটিকে বিনা মূল্যে একটি হাফেজিয়া মাদ্রাসায় পড়তে দিয়েছেন। জীবনের তাগিদে নিজেও ঢাকা শহরে এসে এক ভিক্ষুককে বিয়ে করেছেন। জামিলা জানান, ভিক্ষুকের আয় ভালো, সে কারণে তাকে বিয়ে করা। সারা দিন পাঁচ বছরের মেয়েটি সেই সত্-বাবার সঙ্গেই থাকেন। জামিলা বলেন, ছোট মেয়েটিকে আর এক বছর পরে বাসাবাড়িতে কাজে দিব, এতে তাদের পরিবারে খাবারের মুখ কমে যাবে বলে জানান।
সুজন মিয়া আর জামিলা বেগম কেবল নয়; এমন অসংখ্য মানুষ জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে উদ্বাস্তু হয়ে শহরে পাড়ি জমাচ্ছেন। এতে বাড়ছে বাস্তুচ্যুত শিশু শ্রমিকের সংখ্যা। এর নেতিবাচক প্রভাবে হারিয়ে যাচ্ছে শিশুর কৈশোরকাল। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাজ করা বিজ্ঞজনেরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আয় কমে যাচ্ছে গ্রামের পরিবারগুলোর, খেটে খাওয়া মানুষ জমি হারিয়ে, কেউ বা বাড়িঘর হারিয়ে দারিদ্র্যের কবলে পড়ছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নিম্নবিত্ত পরিবারের খরচ বেড়ে গেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পরিবারের শিশুদের ওপর। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের বাধ্য হয়ে কাজে নামতে হচ্ছে। নিজের বেঁচে থাকার কিংবা পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে তারা স্কুল ছেড়ে কাজে নামতে বাধ্য হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মতে, বিশ্বে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৬ সালের এক জরিপ বলছে, দেশে বিভিন্ন খাতে শিশুশ্রমে নিযুক্ত প্রায় ৩৪ লাখ শিশু। করোনাকালীন বাস্তবতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবজনিত সমস্যায় বর্তমানে এ সংখ্যা ৪০ লাখের ওপরে। শিশুশ্রমের সঙ্গে যুক্ত অর্ধেক শিশুই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যার শিকার। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) জাতীয় প্রকল্প সমন্বয়ক সৈয়দা মুনিরা সুলতানা বলেন, আমি অনেক মেয়েশিশুকে দেখেছি, যারা বৈরী আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিদ্যালয় ছেড়ে কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হয়েছে। কেরানীগঞ্জে মেয়েদের পোশাক তৈরির একটা কারখানায় ১০ বছরের কম বয়সি শিশুদের কাজ করতে দেখে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। সৈয়দা মুনিরা সুলতানা বলেন, তাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, বেশির ভাগই দুর্যোগপ্রবণ খুলনা, বরিশাল ও সাতক্ষীরা থেকে আসা। আগে সেখানে বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত। এখন ঝরে পড়েছে। সংসারে অর্থ জোগান দিতে কাজ করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু। তাই জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ মোকাবিলায় এসব শিশুকে খেসারত দিতে হয়। খরা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততার প্রভাব কোনো না কোনোভাবে শিশুর কৈশোরকাল ঝরে যাচ্ছে। আর বাল্যকাল যার নষ্ট হয়ে যায় সন্দেহ নেই পুরো জীবনটাই তার এলোমেলো। যে সময়ে শিশুর হাতে বই থাকার কথা, যে সময়ে বিদ্যালয়ের বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করার কথা সেই সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দারিদ্র্যের কবলে পড়ে হাজার হাজার শিশু শিশুশ্রমে নিযুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছে।
ইউনিসেফের তথ্যমতে, শহরের বস্তিতে থাকা বেশির ভাগ শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যায় না। আর দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ আরো কম। সংস্থাটির গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রায় ১৭ লাখ শিশু নিষিদ্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত। তাদের প্রতি চার জনের মধ্যে এক জনের বয়স ১১ বছর কিংবা তারও কম। অনেক মেয়েশিশু গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে। তাদের সঠিক তথ্য ও গল্প গবেষণায় যুক্ত করা কঠিন। তা করা হলে সংখ্যাটি আরো বাড়বে। ঢাকা ও আশপাশের বস্তিতে বসবাস করা বেশির ভাগ শিশু ট্যানারি, লঞ্চ ইয়ার্ড, দরজির দোকান, অটোমোবাইল কারখানায় কাজ করে। অনেকে ফল ও সবজির বাজারে মাল টানা এবং বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট কিংবা রেল স্টেশনে কুলির কাজ করে। তাদের বেশির ভাগ দুর্যোগপ্রবণ বিভিন্ন জেলা থেকে উদ্বাস্তু হয়ে ঢাকায় এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শিশুশ্রম বৃদ্ধি ও শিশুদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার বিষয়ে বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি শেলডন ইয়েট বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের শিশুদের উচ্চ মূল্য দিতে হচ্ছে। লাখ লাখ শিশু স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে। আবার কঠিন কঠিন কাজে যুক্ত হচ্ছে। এতে একটি অদক্ষ শ্রমবাজার গড়ে উঠছে। এই শিশুরা যদি ঠিকমতো পড়াশোনার সুযোগ এবং উন্নত জীবন পেত, তাহলে তাদের বিকাশ আরো ভালো হতো। শিশুশ্রম কমানো এবং শিশুদের স্কুলে যাওয়া নিশ্চিত করতে ইউনিসেফ কাজ করছে। তিনি বলেন, আমরা সরকারের সঙ্গে শিশুদের নানা বিষয় নিয়ে কাজ করছি। তবে এ জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কোনো শিশুর জীবনে যাতে জলবায়ু পরিবর্তনের দুর্ভাগ্য নেমে না আসে, সে জন্য আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।
