মাননীয় হাইকোর্টকে অভিনন্দন মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ মানেই বিষ

আপডেট : ২৪ জুন ২০১৯, ২১:৩০

মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সারা দেশ থেকে এক মাসের মধ্যে তুলে নিয়ে ধ্বংস করার আদেশ দানের জন্য মাননীয় হাইকোর্টকে অভিনন্দন জানাই। জনস্বার্থে এই আদেশটি একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। জনগণ এখন এর পুরোপুরি বাস্তবায়ন দেখার জন্য অপেক্ষায় থাকবে।

ওষুধ উত্পাদনের পর এর উত্পাদনকারী কোম্পানি এর একটি মেয়াদ লিখে দেয়। এই সময়সীমা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নির্ণয় করা হয়। এই সময়সীমার পর ওষুধটি আর ওষুধ থাকে না। তখন এটি বিষে পরিণত হয়। এ কারণেই মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখটি লিখে দিতে হয়। ওষুধ বিক্রেতাকে ওষুধ বিক্রির সময় এই তারিখের আগে বিক্রির বিষয়টি মাথায় রাখতে হয়। রোগীও যেন এই তারিখের পর কোনো অবস্থাতেই ওষুধটি ব্যবহার করে স্বাস্থ্যগত ক্ষতির শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করার জন্যই প্রতিটি ওষুধের মোড়কে মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ লিখে দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পৃথিবীর সব দেশেই এই নিয়মটি প্রচলিত।

বাংলাদেশের অনেক সাধারণ মানুষ সরল বিশ্বাসে ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কেনে। তারা ভাবতেও পারে না যে ওষুধের দোকানি তাকে ওষুধের বদলে বিষ বিক্রি করবে। কিন্তু অনেক দোকানিই মানুষকে ঠকাতে এই অপকর্মটি করে। যে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব বের করেছেন যে ঢাকার ৯৩% দোকানেই মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি হয় তাকেও অভিনন্দন জানাই এই গুরুত্বপূর্ণ ও ভয়াবহ জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর এই ঝুঁকির বিষয়টি বের করার জন্য। রাজধানী ঢাকাতেই যদি এই অবস্থা হয় তাহলে মফস্সলে কিংবা বিস্তীর্ণ গ্রাম এলাকায় কী চলছে তা সহজেই অনুমেয়। সেই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য রক্ষার স্বার্থে দেশে কী পরিমাণ নকল-ভেজাল-নিম্নমানের ওষুধ বিক্রি হচ্ছে সে বিষয়টিও সরকার-আদালত-ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবদের বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ নামের বিষটির ব্যবহারে মানুষের যে পরিমাণ ক্ষতি করে তা সংক্ষেপে বলার মতো নয়। আপাতত এখানে শুধু এতটুকু বলা যায় যে এই বিষ মানুষের কিডনি, লিভার, হূিপণ্ড, ফুসফুস, অস্থিমজ্জা, পাকস্থলী, রক্তকোষ, জননেন্দ্রিয় ও মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিক হলে তা তৈরি করতে পারে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণু, যা নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ সারা বিশ্বের বিশেষজ্ঞরা চরম আশঙ্কায় রয়েছেন। নকল-ভেজাল-নিম্নমান-মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি তাই নিছক একটি সাধারণ অপরাধ নয়। অসংখ্য মানুষের প্রাণঘাতী স্বাস্থ্য বিপর্যয় ঘটছে বলে এটি গণহত্যার সমান অপরাধ এবং অপরাধীর সেভাবেই বিচার হওয়া উচিত। কারণ এই অপরাধ শুধু একজন মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে না, কেড়ে নিচ্ছে অসংখ্য মানুষের প্রাণ। নীরব মৃত্যু বলে এই গণহত্যা চোখে দেখা যাচ্ছে না।

নিয়ম হচ্ছে, কোনো দোকানে কোনো কোম্পানির ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হলে তা কোম্পানিকে জানাতে হয় কমপক্ষে তিন মাস আগে। কোম্পানি তখন সেগুলো দোকান থেকে নিয়ে যায় এবং তার বদলে সমপরিমাণ ওষুধ দোকানিকে দিয়ে যায়। যেসব ওষুধ কোম্পানি অনিয়মের আখড়া বা মানুষ মেরে হলেও দ্রুত বড়লোক হতে চায় তারা এগুলো দোকান থেকে তুলে নিতে গড়িমসি করে। তখন নিয়ম হচ্ছে দোকানি ওষুধ প্রশাসনকে বিষয়টি জানাবে। তখন বাকি কাজগুলো ওষুধ প্রশাসন করবে। কোনো অবস্থাতেই দোকানে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রাখা যাবে না। অর্থাত্ মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি না করলে দোকানির সামন্যতম কোনো আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা নেই। কিন্তু তার পরও যদি কোনো দোকানে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ থেকে যায়, তাহলে স্বতঃসিদ্ধভাবেই বুঝতে হবে দোকানির কুমতলব রয়েছে। জনগণের স্বাস্থ্যগত বিপর্যয়ের বিনিময়ে সে অন্যায় মুনাফা করতে চায়। সে গণশত্রুতে রূপান্তরিত হয়েছে। তাকে শক্তভাবে আইনের আওতায় আনা জরুরি দরকার।

কোম্পানি মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধগুলো নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস’ বা ‘জিএমপি গাইডলাইন’ অনুযায়ী মোড়কসহ সেগুলোকে ভেঙে কোম্পানির বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থায় (ইটিপি) পাঠাবে। তারপর পরিশোধিত এই বর্জ্যকে মাটিতে পুঁতে ফেলবে। কোনো অবস্থাতেই সেগুলো এক জায়গায় ডাম্প করে ফেলে রাখবে না বা খাল-বিল-নদীতে ফেলবে না। কারণ মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ শুধু জনগণের স্বাস্থ্যগত ক্ষতিই করে না, এগুলো পরিবেশের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর, বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক, হরমোন, ব্লাড প্রডাক্টস, টিকা ও অ্যান্টি ক্যানসার-জাতীয় ওষুধগুলো।

আমাদের অসাধু ওষুধ ব্যবসায়ীরা কখনো কখনো বলার চেষ্টা করে যে কোম্পানিকে বলার পরেও তারা মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ফিরিয়ে নেয় না। আমার মতে, কোনো ভালো কোম্পানিই এ কাজ করতে পারে না, করবে না। কারণ তাহলে তার ওষুধ উত্পাদনের জিএমপি নীতিমালা লঙ্ঘিত হয়, যার ফলে সে তার লাইসেন্স হারাতে পারে। কোনো দায়িত্ববান ওষুধ কোম্পানি এই ঝুঁকি নেবে না। তবে যদি দোকানদার কোম্পানি থেকে অর্থাত্ কোনো ভেলিড সোর্স থেকে ওষুধ না কিনে বেশি কমিশনের উদগ্র লোভে কোনো বেআইনি সরবরাহকারী অর্থাত্ অসাধু পাইকারি দোকান বা হকার বা ভেন্ডারের কাছ থেকে নকল-ভেজাল-নিম্নমানের ওষুধ কেনে এবং একসময় সেই ওষুধ যদি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়, তাহলে তা কোম্পানি ফিরিয়ে নেয় না। অর্থাত্ সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিই বেআইনি, অসত্ এবং অন্যায় মুনাফার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়ে দোকানদার এটি করছে। এর দায়দায়িত্ব পুরোপুরিই দোকানদারের। তার পরও পরামর্শ দিচ্ছি, যদি কোনো দোকানদারের কাছে এরকম মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ থাকে, যা উত্পাদক ওষুধ কোম্পানি ফেরত নিচ্ছে না কারণ সে এগুলোর উত্পাদক নয় তখন দোকানদারকেই সেসব ওষুধ ধ্বংস করে জলাশয় থেকে দূরে মাটিতে গভীর করে পুঁতে ফেলতে হবে। তাই ‘কোম্পানি নিচ্ছে না বলে দোকানে রেখেছি’, দোকানদারের এমন ওজর-আপত্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এটি অসত্ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, অন্যায় ও বিপুল মুনাফা করাই যার লক্ষ্য।

বাংলাদেশে আমরা এমন ম্যাজিস্ট্রেট আরো চাই। মাননীয় আদালতেরও জনস্বার্থে এমন নজরদারি আরো চাই। আদালতগুলোতে অসংখ্য মামলা থাকায় ভয়ংকর মামলাজট সেখানে বিরাজমান। কিন্তু তার পরও খাদ্য ও ওষুধে নকল-ভেজাল-নিম্নমান—মেয়াদোত্তীর্ণ ইত্যাদি জনস্বার্থের জন্য অতি প্রয়োজনীয় জরুরি মামলাগুলোর অতি দ্রুত নিষ্পত্তি হলে জনগণ অত্যন্ত কৃতজ্ঞ থাকবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি, কৃষি, যোগাযোগ, নারী অধিকার ও ক্ষমতায়ন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সম্যক অগ্রগতি হচ্ছে। কিন্তু খাদ্য ও ওষুধের মতো অতি জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে নজর না দিলে আমরা সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারব না। সরকার ও আদালত যদি একত্রে অসাধু ব্যবসায় এবং তাদেরকে সুযোগ করে দেওয়া সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে শুরু করে, তাহলে আমরা একটা সুবর্ণ ভবিষ্যতের স্বপ্ন অবশ্যই দেখতে পারব।

n লেখক : সাবেক ডিন, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়