আজকের দিনে আবহাওয়ার ছন্দ বদল যতটা না অনভিপ্রেত, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সংঘাত তার থেকেও বেশি অনিশ্চিত। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লর্ড পাল্মারস্টোন তার দেশের পররাষ্ট্রনীতির কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন যে, ‘আমাদের কোনো চিরস্থায়ী বন্ধু নেই, এমনকি স্থায়ী কোনো শত্রুও নেই। স্বার্থ রক্ষাই আমাদের মূল এবং চিরস্থায়ী বিবেচ্য বিষয় যা আমাদের পরিচালিত করে।’ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণে জাতি রাষ্ট্রের স্বার্থই একমাত্র নিয়ামক যার মাধ্যমে কিছুটা হলেও আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক অনুধাবন করা যায়। বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বন্দ্ব্ব বুঝতে গেলে তাই এই স্বার্থ রাজনীতি ধরেই আগাতে হবে। তবে এটুকু মনে রাখতে হবে যে বিশ্ব রাজনীতিতে কোনো পরহিতৈষী ধর্মযাজকের অস্তিত্ব নেই।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি বিশ্বের ইতিহাসে এক অনবদ্য ঘটনা। স্পষ্টতই গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের উত্থান ইউরোপীয় সাম্রাজ্যগুলোতে এক স্বাধীনতার নবদিগন্ত উন্মোচিত হয়। স্বভাবতই ইরানের মানুষও এর প্রভাব বলয়ের বাইরে ছিল না। পাহলবী রাজ শাসন থেকে গণতন্ত্র বাস্তবায়নের জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষা ইরানে প্রবল হয়ে ওঠে বিশ্বযুদ্ধের পর পরই। ১৯৫০ সালে অভূতপূর্বভাবে জেনারেল আলি রাজমারা শাহ কর্তৃক প্রথম প্রধানমন্ত্রী মনোনীত হন। আলি রাজমারা গুপ্তহত্যায় নিহত হলেও আরেক জাতীয়তাবাদী নেতা মুহাম্মদ মোসাদ্দেগ ক্ষমতায় আসেন ১৯৫১ সালের এপ্রিলে। তিনি ইরানের তেল জাতীয়করণ করে সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধাসমূহ বিস্তৃত করেন। বলে রাখা ভালো যে, অ্যাংলো-ইরান তেল কোম্পানি মূলত ইরানের তেল সরবরাহ করতো যার ৮৫ শতাংশ মালিকানাই ছিল ব্রিটিশদের হাতে। মোসাদ্দেগের তেল জাতীয়করণের ফলে ব্রিটিশ ও যুক্তরাষ্ট্র স্বভাবতই চটে যায় এবং মোসাদ্দেগ সরকারের পতন ঘটিয়ে শাহকে শক্তিশালী করতে সিআইএ ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা ঘৃণ্য এক চক্রান্তে লিপ্ত হয়। কয়েকটি ব্যর্থ ক্যুর পর অবশেষে ১৯৫৩ সালের আগস্টে বিদেশি সহায়তায় সেনাবাহিনী ও শাহের অনুগতরা একটি গণতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটাতে সক্ষম হয়। ১৯৭৯ সালের ইরানি ধর্মীয় বিপ্লবে শাহের পতনের আগ পর্যন্ত দীর্ঘ এই সময়ের ইরানের সঙ্গে পশ্চিমা, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেশ উষ্ণ সম্পর্কই বজায় ছিল। এরমধ্যে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু এক বিপ্লবই থামিয়ে দেয় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের মধুচন্দ্রিমা।
বিল ক্লিনটনের সময়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে কিছুটা আশার আলো পরস্ফুিটিত হলেও আশির দশক থেকে আজ অবধি অবিশ্বাসের চাদরে ঢাকা পড়ে। ২০১৫ সালে বারাক ওবামার সময়ে ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি এ দুদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের আশা জাগিয়েও ডোনাল্ড ট্রাম্পের হঠকারিতার কাছে হার মানতে বাধ্য হয়। ট্রাম্প ইরান পারমাণবিক চুক্তির অন্যান্য দেশের মতামতের তোয়াক্কা না করেই তা বাতিল করে দিলে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী ক্ষোভের সঞ্চার হয়। ইউরোপ ইরানকে নানাদিক থেকে সহায়তার আশ্বাস দিয়ে গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধ ইরানের পরিস্থিতি ভঙ্গুর করে দিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল ঘিরে উত্তেজনা চরমে। ইরান বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুতার উত্তরে হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি দিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র গতমাসেই যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে ইরানকে যেন আর এক ধাপ উসকে দিয়েছে। ইরানও সমুদ্রে তার পদচারণা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এরপরই শুরু হয় একের পর এক নাটকের অবতারণা। কয়েকদিন আগে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিঞ্জো আবে তেহরান সফরে আসেন। ঠিক এই সময়েই ওমান সাগরে জাপানের একটিসহ দুটি তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে। যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যেকবারই এই ঘটনার দায় ইরানের উপর চাপিয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্ববাসী সামনে ইরানকে দোষী প্রমাণ করতে চাইলেও সবাই গিলছে না। যুক্তরাষ্ট্র পূর্বেও ইরাকের পারমাণবিক অস্ত্র থাকার অভিযোগ তুলে ইরাক আক্রমণ করে। আদতে ইরাকে কিছু ছিল না। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নামক প্রপঞ্চগুলো মানুষকে আর আগের মতো টানে না।
কিছুদিন ধরেই পত্র-পত্রিকায় ইরান যুদ্ধের গুঞ্জন চলছে। স্বভাবতই ইরানের আধিপত্য মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এখন তুঙ্গে। সিরিয়া ও ইরাকে ইরান শক্তভাবেই নিজের স্থান দখল করে আছে। রাশিয়া ও তুরস্কের সাহায্যে গোটা মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির স্থানীয় নায়ক এখন ইরান। কাতার ইস্যুতেও ইরান নিজেকে কাতারের একজন শক্ত সমর্থক হিসেবে ধরা দেয়। এটা বলা অত্যুক্তি হবে না যে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলকে যদি কেউ চ্যালেঞ্জ করার সামর্থ্য রাখে তাহলে এটা একমাত্র ইরান। সৌদি ও ইসরাইলের চক্রান্ত বরাবরই ইরানের বিরুদ্ধে প্রবল ছিল। বর্তমান ইরান সংকটেও তারা বেশ সক্রিয়। যুক্তরাষ্ট্রের নিজেরও কিছু হিসাব নিকাশ আছে মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে সাম্প্রতিক সময়ে আইএস দমনে রাশিয়া প্রধান সেনানায়কের ভূমিকা পালন করেছে। পুতিনের ভূ-রাজনৈতিক অর্জন নিশ্চিতরূপেই ওয়াশিংটনকে ঈর্ষান্বিত করে থাকবে। ট্রাম্পের যুদ্ধ করার ইচ্ছে না থাকলেও মধ্যপ্রাচ্য গরম করে ফায়দা লোটার বাসনা থাকতেই পারে। উদাহরণ হিসেবে সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র মধ্যকার ১১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। আর যুদ্ধ যুদ্ধ আবহাওয়াই যদি না থাকে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র বিক্রি করবে কার কাছে! তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর টাকা অপচয় করার জন্য হলেও তো কোনো একটা ব্যয়বহুল খাত দরকার। আজকাল যুদ্ধের থেকে আর ব্যয়সাধ্য কি আছে?
অনেক বিশ্লেষকই ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের ধোঁয়া বুদবুদ করতে দেখছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্র হিসেবে এটি আমার কাছে দূর ভবিষ্যত্। এমন মনে করার প্রধান কারণ হচ্ছে যে, বিশ্ব ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র এখন আর একক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয় না। একাধিক রাষ্ট্রের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে তুলনামূলকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার দুটোই কমেছে। নিঃসন্দেহে যুদ্ধ ব্যয়বহুল একটি প্রকল্প যাতে অর্থের পাশাপাশি জনবলেরও প্রয়োজন হয়। আর্থিকভাবে এখন যুক্তরাষ্ট্র দিশেহারা। ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে অভ্যন্তরীণভাবে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার চাপে রয়েছে যেমনটি হয়েছিল ভিয়েতনাম পরবর্তী সময়ে। ইরানকে মোকাবেলায় গেরিলা কিংবা প্রক্সি যুদ্ধ করেও সফলতা সম্ভব নয় কেননা গেরিলা কিংবা প্রক্সি যুদ্ধই ইরানের মূল শক্তি। যুক্তরাষ্ট্র যতই হামতাম করুক না কেন, সে আরেকটি যুদ্ধ বাধানোর জন্য কোনোক্রমেই এই মুহূর্তে প্রস্তুত নয়।
প্রশ্ন থেকেই যায় যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতই না থাকে তাহলে মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে কেন এই উন্মাদনা? গত সপ্তাহেই ওয়াশিংটন অতিরিক্ত এক হাজার সৈন্য মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে। এগুলো দেখে অনেকে যুদ্ধের যোগসাজশ খোঁজার চেষ্টা করলেও বাস্তবিক পরিস্থিতি ভিন্ন কথা বলে। প্রথমত যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি এখন তলানিতে নেমেছে। বিশ্ব ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক ইস্যুর কথাই তুলে ধরা যেতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্প দুইবার কিম জন উমের সঙ্গে সাক্ষাত্ করে বিশ্বব্যাপী প্রশংসা কুড়ালেও কাজের কাজ কিছুই করতে পারেননি। সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ তো দূরে থাক, কোনো চুক্তিতেও পৌঁছাতে পারেনি তারা। চালাক নেতানিয়াহু কয়েকদিন আগেই গোলান হাইটসে ট্রাম্প হাইটস নামে বসতি স্থাপনা উদ্বোধন করেন। এদিকে প্রথাগত ইউরোপীয় বন্ধুরাও বিরক্ত ও বিভক্ত। ভারত, তুরস্কের কিংবা জার্মানির মতো দেশগুলোর রাশিয়া প্রীতি এখন স্পষ্ট। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু ইরানকে আক্রমণ করে এমন লক্ষ্য বাস্তবায়ন নিতান্তই নির্বুদ্ধিতা ও অবাস্তবায়নযোগ্য। ইরানের মতো বাঁকা ষাঁড়কে বশে আনতে ট্রাম্প যা করতে চাইছেন তা হলো পরিকল্পিত কিছু নাটকীয় কর্মকাণ্ড যা যুদ্ধভীতি প্রদর্শনের সামিল। বাস্তবিক রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা নেহাত্ই কম।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্য রাষ্ট্রগুলো একে একে বিদেশি শক্তির হাতে কব্জা হলেও ইরান টিকে রয়েছে শত বাধার মুখে। ইরানি জনগণ বরাবরই ধর্মীয় নেতাদের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছে। অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ইরানে নেই বলব না, কিন্তু পাশ্চাত্যের প্রতি ইরানিদের প্রবল অবিশ্বাস ও ঘৃণা খুবই প্রবল। ইরানিদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রতি যে অগাধ বিশ্বাস তা নিঃসন্দেহে তাদেরকে আরো বেশি উজ্জীবিত করছে। এটুকু বলতে পারি যে, ইরানের উপর যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি কোনো আক্রমণ হবে আগ্নেয়গিরির মধ্যে হাত দেওয়ার সামিল।
n লেখক : শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
