সংকটে সাতক্ষীরার চিংড়িচাষিরা

আপডেট : ২৪ জুন ২০১৯, ২২:১১

বাজারে পোনা সংকট, ভাইরাসের আক্রমণ, চিংড়ির ন্যায্য দাম না পাওয়া ও চাষাবাদের খরচ বৃদ্ধিসহ নানাবিধ কারণে লোকসানের মুখে পড়েছে সাতক্ষীরার চিংড়িচাষিরা। ফলে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে সর্বশান্ত হয়ে পড়েছেন জেলার বহু চিংড়িচাষি।

সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার সরাপপুর গ্রামের চিংড়িচাষি রাজেস্বর দাশ বলেন, প্রায় তিন দশক ধরে তিনি চিংড়ি চাষ করছেন। চলতি মৌসুমে দুই হাজার ৫০০ বিঘা জমিতে চিংড়ি চাষ করেছেন। মৌসুমের শুরুতে ঘেরে ভাইরাস লেগে ব্যাপকহারে চিংড়ি মারা যায়। এতে তার প্রায় এক থেকে দেড় কোটি টাকার মতো চিংড়ি নষ্ট হয়। বর্তমান ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব কেটে গেলেও বাজারে চিংড়ির সঠিক দাম পাওয়া যাচ্ছে না। গেল বছর এই সময় যে চিংড়ি কেজি প্রতি দাম ছিল ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকা, তা বর্তমান দাম পাওয়া যাচ্ছে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা। ফলে চিংড়ি চাষে মোটা অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ এবার লোকসানের মুখে পড়েছেন তিনি। ফলে চলতি মৌসুমে তার আড়াই হাজার বিঘার ঘেরে চিংড়ি উত্পাদন করে প্রায় দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা লোকসান হওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ফিংড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও ঘের ব্যবসায়ী মো. সামছুর রহমান জানান, চলতি মৌসুমে ৩০০ বিঘা পরিমাণ জমির ঘেরে চিংড়ি চাষ করেছেন। কিন্তু বাজারে চিংড়ি দাম না থাকায় লোকসানে পড়েছেন। তিনি বলেন, মৌসুমের শুরুতে কয়েক দফায় চিংড়িতে মড়ক লেগে ২০ থেকে ২২ লাখ টাকার চিংড়ি মারা যায়। এরপর বাজারে দাম কমে যাওয়ায় আরো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন তিনি। এছাড়া আগামী দুই একদিনের মধ্যে বাজারে চিংড়ি পোনা সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে পিক মৌসুমে ঘেরে পোনা ছাড়া যাবে না। এতে করে চিংড়ি চাষে নতুন করে সংকট দেখা দিবে।

সাতক্ষীরার সুলতানপুর বড়বাজার মত্স্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আব্দুর রব বলেন, গত দুই বছর ধরে রপ্তানিজাত চিংড়ি দেশি বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এতে করে চাষিরা ন্যায্য দাম পাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে দর কমে যাওয়ায় চাষিরা বাধ্য হয়ে দেশি বাজারে এসব চিংড়ি বিক্রি করছেন। ফলে প্রকারন্তে ঘের মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে জানান তিনি। তিনি আরো বলেন, গত ২০ মে থেকে সাগরে মা বাগদা ধরা বন্ধ থাকায় হ্যাচারিগুলো পোনা উত্পাদন বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে আগামী দুই একদিনের মধ্যে সাতক্ষীরার বাজারে পোনা সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। সাগরে মা বাগদা ধরা বন্ধ থাকায় ২৫০ টাকা হাজারের বাগদা চিংড়ি পোনা এখন সাতক্ষীরায় বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৫শ টাকায়। এতে করে ঘেরে পোনা ছাড়তে না পেরে চাষিরা আরো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সৌদিয়া হ্যাচারির সাতক্ষীরা অফিসের প্রধান নির্বাহী বাদল দাশ জানান, গত ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত মাছ ধরা বিশেষ করে মা বাগদা আহরণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। মা বাগদা আহরণে নিষেধাজ্ঞা আইনটি পাস হওয়ার তিন বছর পর এ বছর কার্যকর করেছে সরকার। ফলে পূর্বের ধরা মা বাগদা থেকে উত্পাদিত চিংড়ি পোনা এতদিন বাজারে সরবরাহ ছিল। ইতোমধ্যে কক্সবাজারভিত্তিক অধিকাংশ হ্যাচারিতে পোনা উত্পাদন বন্ধ হয়ে গেছে। আগামী দুই একদিনের মধ্যে বাজারে সব ধরনের পোনা সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে।

সাতক্ষীরা জেলা মত্স্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০১৮-১৯ মৌসুমের জন্য সাতক্ষীরা জেলার ছয়টি উপজেলাতে সরকারিভাবে রপ্তানিজাত বাগদা চিংড়ি উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৭ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় এক হাজার ৫৪০ টন, তালায় এক হাজার ৩৫৫ টন, দেবহাটায় তিন হাজার ৫১৪ টন, কালিগঞ্জে ছয় হাজার ১০ টন, আশাশুনিতে আট হাজার ৪৪৫ এবং শ্যামনগর উপজেলাতে ছয় হাজার ৮৩৬ টন। এ ছয় উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ বাগদা উত্পাদন হচ্ছে আশাশুনি উপজেলাতে। গেল মৌসুমে এ ছয়টি উপজেলাতে বাগদা চিংড়ি উত্পাদন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৬ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন।

সাতক্ষীরা জেলা মত্স্য কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম সরদার বলেন, পোনা সংকটের কারণে জেলায় চলতি মৌসুমে চিংড়ি উত্পাদন হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভরা মৌসুমের দুই মাস চিংড়ি পোনা উত্পাদন বন্ধ থাকায় চাষিরা পড়েছে পোনা সংকটে।