সেতু ভেঙে ছিটকে পড়ল উপবনের পাঁচ বগি

আপডেট : ২৫ জুন ২০১৯, ০০:৩১

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার বরমচালে সেতু ভেঙে আন্তঃনগর ‘উপবন এক্সপ্রেসের’ ৫টি বগি লাইনচ্যুত হয়ে চারজন নিহত ও দুই শতাধিক যাত্রী আহত হয়েছেন। সিলেট থেকে ঢাকাগামী উপবন এক্সপ্রেস গত রবিবার রাত ১১টা ৫০ মিনিটের দিকে বড়ছড়া সেতুতে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। ৩টি বগি বড়ছড়া খালে উলটে পড়ে। এতে সেতুটিরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, রেললাইনটি দুমড়ে মুচড়ে গেছে।

দুর্ঘটনার পর সিলেটের সঙ্গে সারাদেশের ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। রাত ৯টার দিকে সিলেট থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামমুখী উদয়ন এক্সপ্রেস রাত ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে দুর্ঘটনাস্থল অতিক্রম করে। এরপরই ঢাকাগামী সুরমা মেইল দুর্ঘটনাস্থল অতিক্রম করে। আখাউড়া থেকে ছেড়ে আসা কুশিয়ারা ট্রেন রাত সোয়া ১১টার দিকে সিলেটের উদ্দেশে কুলাউড়া স্টেশন অতিক্রম করে। ট্রেনগুলোকে ৫ কিলোমিটার বেগে দুর্ঘটনাস্থল অতিক্রম করতে সতর্ক করা হয়েছে। সিলেট থেকে ঢাকাগামী আন্তঃনগর উপবন ট্রেন বাতিল করা হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সরাইলের শাহবাজপুরে বেইলি ব্রিজ ভেঙে যাওয়ায় ঢাকা-সিলেট সরাসরি সড়ক যোগাযোগ প্রায় বন্ধ রয়েছে। এ কারণে ট্রেনের যাত্রীসংখ্যা অন্য সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ছিল। অন্য সময় ট্রেনটি ১৫টি বগি নিয়ে যাতায়াত করলেও রবিবার ট্রেনটিতে ১৭টি বগি ছিল। এদিকে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন মন্ত্রিপরিষদকে জানিয়েছেন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে অব্যবস্থাপনার কারণে রেলের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ায় কুলাউড়ায় ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে, দুর্ঘটনার ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। উভয় কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের আঞ্চলিক প্রধান ও বিভাগীয় প্রধান পর্যায়ে এ দুটি কমিটি গঠন করা হয়। আঞ্চলিক প্রধান পর্যায়ের কমিটিতে চিফ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার (পূর্ব) মো. মিজানুর রহমানকে আহ্বায়ক করা হয়েছে। আর বিভাগীয় কর্মকর্তা পর্যায়ের কমিটিতে আহ্বায়ক করা হয়েছে কমলাপুর স্টেশনের ডিটিও মো. ময়নুল ইসলামকে।

আহতদের অনেকের অবস্থা গুরুতর। এদের মধ্যে কুলাউড়া হাসপাতালে ৬৮ জন, মৌলভীবাজার হাসপাতালে ৭ জন, সিলেট ওসমানী হাসপাতালে ২৪ জনসহ বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে আহতরা চিকিত্সা নিচ্ছেন। ঘটনার পরপর এলাকাবাসী, ফায়ার সার্ভিসের ২৭টি ইউনিট ও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে যাত্রীদের উদ্ধারে কাজ চালায়। জেলা প্রশাসন ও পুলিশের সহায়তায় বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল থেকে বেশ কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্স ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যায়।

নিহতরা হলেন: কুলাউড়ার কাদিপুর গ্রামের আব্দুল বারির স্ত্রী মনোয়ারা পারভিন (৪৮), সিলেট নার্সিং কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী ফাহমিদা ইয়াসমিন ইভা (২০) ও বাগেরহাটের মোল্লারহাটের আক্রাম মোল্লার মেয়ে সানজিদা আক্তার (২০) এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাধবপুরের কুরাইতলার নূর হোসেনের ছেলে কাউছার আহমদ (২৫)।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন, রেলওয়ের ডিজি কাজি রফিকুল ইসলাম ঢাকা থেকে বিশেষ ট্রেনে ভোরে ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছেন। সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন গতকাল দুপুরে জানান, রবিবার রাতেই স্থানীয়দের নিয়ে প্রশাসন ও রেলের লোকজন উদ্ধার কাজ সম্পন্ন করেন। তিনি বলেন, আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে, লাইন ঠিক করে রেল যোগাযোগ পুনঃস্থাপন এবং বগিগুলো উদ্ধার করা। সচিব বলেন, আল্লার রহমতে খালে পানি কম থাকায় অনেকেই রক্ষা পান।

দুপুর ১টার দিকে ঘটনাস্থলে দেখা যায় বড়ছড়া ব্রিজের ওপর রেললাইন বাঁকা হয়ে আছে। সিগন্যাল লাইট দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। লাইনচ্যুত একটি বগি উঠানো হচ্ছে। অপর বগিগুলোরও উদ্ধারে চেষ্টা চলছে। এর আগে আখাউড়া থেকে রিলিফ ট্রেন আনা হয়। প্রায় ১ হাজার মিটার ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইন ও কাঠের স্লিপার মেরামতের কাজ চলছিল।

ট্রেনের যাত্রী জৈন্তাপুর ইমরান আহমদ ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শাহেদ আহমদ জানান, বড়ছড়া সেতুতে হঠাত্ ট্রেনের ৫টি বগি লাইনচ্যুত হয় এবং কয়েকটি বগি ঝপাং করে পানিতে পড়ে।

সিলেটের ব্লু বার্ড স্কুল এন্ড কলেজের ছাত্র ইমরান আহমদ, রবিরবাজারের বাসিন্দা এআইইউ এর ছাত্র আহমদ তোফায়েল, কাদিপুরের পলাশ ও নোয়াখালির ফাতেমা আক্তার আনু জানান, বরমচাল স্টেশনে প্রবেশের সময় ট্রেনটি কখনো দ্রুতগতিতে, কখনো মন্থর গতিতে চলছিল।

স্থানীয়রা জানান, অস্বাভাবিক গতিসম্পন্ন ছিল উপবন। বরমচাল স্টেশনের চা দোকানি ফারুক আহমদ জানান, তারা রাতে স্টেশনে বসে গল্প করছিলেন। উপবন ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর বিকট শব্দ শুনে দৌঁড়ে যান ঘটনাস্থলে। সেখানে গিয়ে দেখেন ট্রেনের বগি খালে পড়ে আছে। নারী-পুরুষের চিত্কারে এলাকা একাকার। তখন আমরা দ্রুত উদ্ধার কাজ শুরু করি। এসময় অনেক সিএনজি অটোরিকশা আহতদের বিনাভাড়ায় হাসপাতালে পৌঁছে দেয়। রাতের বেলায় আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তারা অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। নিজেদের বাড়ি থেকে লাইট এনে অনেককে উদ্ধারকাজে তত্পর হতে দেখা যায়। 

স্থানীয়রাই পুলিশ, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে খবর দেন। স্থানীয়রা মনে করছেন, এমনিতেই সেতুটি অনেক আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, তার ওপরে ট্রেনটির গতিও ছিল বেশি।

এদিকে দুপুর ১২টায় সিলেট রেলস্টেশনে গিয়ে দেখা যায় অনেক যাত্রী ট্রেনের অগ্রিম টিকিট ফেরত দিচ্ছেন।