ঈদুল আজহা থেকে কী শিক্ষা পেলাম

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৩, ০৯:০৫

বিশ্ব মুসলিমের কাছে অত্যন্ত তাত্পর্যময় ও মহা আনন্দের উত্সব হিসেবে সারা মুসলিম জাহানে সাড়ম্বরে পালিত হলো পবিত্র ঈদুল আজহা। ঈদ অর্থ খুশি। শব্দটি শুনলেই মনে হয় চারপাশে শুধু খুশি আর হাসি, শুধু আনন্দ আর উল্লাস। কিন্তু শুধু খুশিতে মেতে ওঠা আর উল্লসিত হওয়াই ঈদের প্রকৃত সার্থকতা নয়। বছর শেষে ঈদ আসে শুধু ভালো ভালো খাবার খাওয়া, দামি দামি কাপড় পরিধান করা আর বিত্তশালী আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব নিয়ে বল্গাহীন আনন্দ-উল্লাস আর যা খুশি তাই করে বেড়ানোর জন্য নয়; ঈদ আসে ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সাদা-কালো সবার মধ্যে আনন্দ-ভালোবাসা বিলানোর জন্য। নিজের খাবার থেকে ক্ষুধার্তকে ভাগ দেওয়ার জন্য। পথের ভুখা-নাঙ্গা, ফকির, ইয়াতিম-মিসকিনকে ঘরে ডেকে এনে ভাই বলে সম্বোধন করে আদর-আপ্যায়ন করানোর জন্য। মহাকবি কায়কোবাদ (কাজেম আল কুরাইশী কায়কোবাদ) তার ‘অশ্রুমালা’ কাব্যগ্রন্থে ‘ঈদ আবাহন’ কবিতায় ঈদ উপলক্ষ্যে কামনা করেছেন জাগৃতি—‘আজি এ ঈদের দিনে হয়ে সব এক মনঃপ্রাণ/ জাগায়ে মোশ্লেমে সবে গাহ আজি মিলনের গান।/ ডুবিবে না তবে আর ঈদের এ জ্যোতিষ্মান রবি/ জীবন সার্থক হবে, ধন্য হবে এ দরিদ্র কবি।’

হজরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহ তাআলার নির্দেশ পালন করতে প্রাণপ্রিয় একমাত্র পুত্র ইসমাইল (আ.)কে কুরবানি করার মতো যে ঐতিহাসিক নজির স্থাপন করে গেছেন, সেই সুন্নাত পালনার্থে মুসলিম জাতি আজো কুরবানি করে থাকে। কুরবানি প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আপনি আপনার রবের উদ্দেশে নামাজ আদায় করুন এবং কুরবানি করুন।’ (সুরা আল কাউসার:২) তিনি আরো বলেন, ‘সব সম্প্রদায়ের জন্য আমি কুরবানির বিধান দিয়েছি, তিনি তাদের জীবনোপকরণস্বরূপ যেসব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন, সেগুলোর ওপর যেন তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।’ (সুরা হাজ:৩৪)

আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের দেওয়া কুরবানি থেকেই কুরবানির ইতিহাসের গোড়াপত্তন হয়েছে এবং তখন থেকে চলে আসা কুরবানির প্রথা পরবর্তীকালের সব নবি-রসুল, তাদের উম্মত আল্লাহর নামে কেবল তারই সন্তুষ্টির জন্য কুরবানি করে গেছেন। এই কুরবানি কেবল পশু কুরবানি নয়; নিজের আমিত্ব, পশুত্ব, ক্ষুদ্রতা, হীনতা, দীনতা, নীচতা, অহংকার, স্বার্থপরতা ত্যাগের কুরবানি। নিজের জীবন-মরণ, নামাজ, রোজা, কুরবানি, সহায়সম্পদ—সবকিছুই কেবল আল্লাহর রাহে, শুধু তারই সন্তুষ্টির জন্য চূড়ান্তভাবে নিয়োগ ও ত্যাগের মানসে এবং বাস্তবে সেই সব আমল করাই হচ্ছে প্রকৃত কুরবানি।

প্রকৃতপক্ষে ত্যাগেই সুখ, ভোগে নয়; বিসর্জনেই প্রতিষ্ঠা, উত্সর্গেই সাফল্য, নিবেদনেই আনন্দ। সারা জাহানের প্রত্যেক মুসলমান যদি জীবনের পদে পদে এমন করেই কুরবানি করে; এমনি করেই আল্লাহর রাহে আপন সত্তাকে বিলিয়ে দেয়, তাহলে ত্যাগের মধ্যে আনন্দ, মৃত্যুর মধ্যে জীবন খুঁজে নেওয়া মোটেও দুঃসাধ্য নয়। এখানেই ঈদ উত্সবের প্রকৃত সার্থকতা নিহীত। এ থেকেই আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে।

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও সহকারী অধ্যাপক, শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ, শেরপুর

ইত্তেফাক/কেকে