দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মহামারির দিকে যাচ্ছে। ৬৪ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু। গত ২৪ ঘণ্টায় ৮৮৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন হাসপাতালে। এই সময়ে মৃত্যু হয়েছে তিনজনের। এডিস মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে রবিবার ৮৩৬ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, যা ছিল দিনের হিসাবে বছরের সর্বোচ্চ সংখ্যা। সেই রেকর্ড একদিন বাদেই ভাঙার খবর এল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে। তাতে বলা হয়, সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৮৮৯ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন। পার্বত্যাঞ্চলে ডেঙ্গুর পাশাপাশি ম্যালেরিয়া দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জেল-জরিমানা বাদ দিয়ে সময় থাকতে মশা নিধন করতে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দিয়ে বলেন, মশার উৎসস্থল ধ্বংস ছাড়া নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না। এ ব্যাপারে জনগণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। জেল-জরিমানা করে কোন লাভ হবে না। যদি সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে মশা মারার কার্যক্রম গ্রহণ করা না হয়। বছরব্যাপী মশা মারার ক্রাশ প্রোগ্রাম চালিয়ে সফলতা পেয়েছে কলকাতা। তাহলে আমরা কেন পারবো না? সবকিছু জানা-বোঝার পরও পদ্ধতিগত কার্যক্রম পরিচালনা না করায় মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশন। সেই ব্যর্থতায় ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক এডিস মশার বিস্তার এখন দেশজুড়ে। রাজধানীর ১২৯ জন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের বেশিরভাগেরই মশা মারার কোন উদ্যোগ চোখে পড়ে না। তাদের কার্যক্রম নিয়ে জনমণে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। স্ব স্ব ওয়ার্ড এলাকায় পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি মশা নিধন কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এলাকাবাসী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য যে পরিকল্পনা নিতে হয়, তা নিতে রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশন ব্যর্থ হয়েছে।
চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৩ হাজার ৮৪৩ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকায় ৯ হাজার ৬৬৪ জন এবং ঢাকার বাইরে চিকিৎসা নিয়েছেন ৪ হাজার ১৭৯ জন। চলতি বছর ডেঙ্গুতে একজন চিকিৎসক, দুই জন পুলিশসহ ৭৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। বেশ কয়েকজন চিকিৎসক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। চট্টগ্রামে দ্বিগুণ হারে বেড়েছে ডেঙ্গু রোগী। গতকাল সেখানে ৮১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। অথচ আগের দিন সেখানে আক্রান্ত হয়েছিল ১১ জন। বরিশাল, সিলেট, রাজশাহীসহ দেশের অধিকাংশ জায়গায় ডেঙ্গু রোগী দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। তবে ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের হার বেশি। মুগদা হাসপাতালে গতকাল ১৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, ঢাকা শিশু হাসপাতালসহ সকাল সরকারি হাসপাতালে দ্বিগুণ ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে। তাদের চিকিৎসা সেবা দিতে চিকিৎসকরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন। করোনার সময়ও চিকিৎসকরা রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে পিছপা হননি। ডেঙ্গুর সময়ও পিছপা হবেন না। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ আনুষঙ্গিক অন্যান্য সাপোর্ট দিতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ জানান চিকিৎসকরা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছেন, ডেঙ্গু সামাল দিতে গিয়ে অপারেশন, আইসিইউসহ অন্যান্য রোগীদের চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। সরকারি- বেসরকারি অনেক হাসপাতাল ও আশাপাশের এলাকা ডেঙ্গু ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ সেখানেও এডিস মশার উৎসস্থল রয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটিতে ৫৪ জন ও দক্ষিণ সিটিতে ৭৫ জন ওয়ার্ড কাউন্সিলর রয়েছেন। কিন্তু এলাকার মানুষ তাদের সার্ভিস দেখতে পান না। অভিযোগ রয়েছে, জনগণের কোন সেবা তারা দেন না। শুধুমাত্র ভোটের সময় জনগণের কাছে যান। ভোট শেষ হলেই তাদের অধিকাংশই চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, বাড়ি-দখলসহ বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার বিস্তার ঘটে। এ সময় প্রতিদিন মশার কামড়ে শত শত মানুষ অসুস্থ হয়। অকালে ঝরে যায় অনেকের প্রাণ। বছরের শুরুতে এডিস প্রজননের পূর্বাভাস দিলেও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয় না দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়লে তখন কার্যক্রম জোরদার করে; শুরু হয় দৌড়ঝাঁপ। যদিও এতে তেমন সুফল মিলে না। প্রতি বছর মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম দেখে এটাকে অনেকটা লোক দেখানো বলে মনে হয়। কেননা, ওই সময়ের কার্যক্রমে মশা মারার চেয়ে প্রচারণা বেশি করা হয়। মেয়র, কাউন্সিলর ও কর্মকর্তারা এসব করে নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে বছরজুড়ে মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে হয়। ঢাকার মশা নিয়ন্ত্রণ কাজে তার উল্টো চিত্র। এ কাজের জন্য যোগ্য পেশাজীবীরা হলেন কীটতত্ত্ববিদ। কিন্তু তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে না।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ৭৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বলেন, ডেঙ্গু বিষয়ে সচেতনতা বেশি দরকার। যার যার ঘরবাড়িতে মশা যেন না থাকে, সেদিকে বেশি দৃষ্টি দিতে হবে। মশার প্রজননের হার অনেক বেশি। সেই প্রজনন যাতে না হয় সেজন্য নিজের বাড়িঘর পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। নিজের ঘর পরিস্কার রাখার দায়িত্ব যারা বসবাস করছেন তাদের। আর বাইরে পরিস্কার রাখার দায়িত্ব সরকারের।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. জাহিদ মালেক বলেন, সবাই সচেতন না হলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য চিকিৎসকরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে যা যা করার দরকার তাই করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এমিরেটস অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, জেল-জরিমানা দিয়ে লাভ হবে না। মশা মারার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের সক্রিয় করতে হবে। প্রতিটি এলাকার ড্রেনসহ আশাপাশের এলাকা বছর ধরে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। মশার জন্মস্থল আমাদের সকলেরই জানা আছে। এটা ধ্বংস করলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আসবে। স্কুল-কলেজের ভিতরে ও এর আশপাশ এলাকায় পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, সামনে ডেঙ্গু আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এখনো সময় আছে। সময় থাকতে মশা মারার কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। জনগণকেও সচেতন করতে হবে। কলকাতা মশা মারার কার্যক্রম চালিয়ে সফল হলে আমরা কেন হবো না? মুখে বেশি কথা না বলে এডিস মশার উৎসস্থল ধ্বংসের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. নামজুল হক বলেন, ডেঙ্গু রোগী যাতে আর না বাড়ে, সেই উদ্যোগ নিতে হবে। অর্থাত্ ব্যাপক ভিত্তিতে মশা মারতে হবে। মশার উত্পত্তিস্থল ধ্বংস করতে হবে। নইলে হাসপাতালগুলোতে রোগীদের চিকিৎসা সেবা ভেঙে পড়ার উপক্রম হবে। তিনি বলেন, মশা মারার কাজ চিকিৎসকদের নয়। চিকিৎসকদের কাজ হলো চিকিৎসা সেবা দেওয়া। দায়িত্বপ্রাপ্তদের মশা মারার কাজ করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, আগামী নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু ঝুঁকিতে থাকবে দেশ।
