হাজারো শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখরিত ঢাকা শহরে নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হয়। এ যুদ্ধ সংকট নিরসনের, এ যুদ্ধ সামনে এগিয়ে যাওয়ার, এ যুদ্ধ স্বপ্নের বীজ বপন করে সাফল্যের চারাগাছ রোপণ করার। এরকমই এক যুদ্ধের নাম ছাত্রজীবনে টিউশনি করানো। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থীই টিউশনির সঙ্গে পরিচিত। টিউশনি করানো হাজারো মেধাবী রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দুপুরে টিউশন করিয়ে রাতে স্বপ্ন দেখে সুন্দর আগামীর। টিউশনি যেন ছাত্রজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। পড়াতে গিয়ে ক্রমেই সমৃদ্ধ হতে থাকে অভিজ্ঞতার ঝুলি। বিচিত্র অভিজ্ঞতাগুলো সবসময় একইরকম হয় না। যা কখনো তিক্ত, কখনো বা মজার। রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর টিউশনি নিয়ে অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছেন -মো. আবু হানিফ
মো. মমিন সরকার
লেভেল-৩, সেমিস্টার-২, কৃষি অনুষদ
মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের চালিকাশক্তি হলো টিউশনি। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে টিউশনিই শেষ ভরসা। এসময় পরিবার থেকে টাকা নেওয়া যেমন বিবেকে বাধে, তেমনি অনেকের টাকা চাওয়ার অবস্থাও থাকে না। লেখাপড়ার পাশাপাশি টিউশনির মাধ্যমেই জীবন চালাতে হয়। আমিও এর ব্যতিক্রম নই। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে আমি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই টিউশন শুরু করেছি। ইতিমধ্যে তিন বছর পার হয়ে গেছে। সৃষ্টিকর্তার অশেষ মেহেরবানীতে কোনো সময় টিউশন ছাড়া থাকতে হয়নি। সাধারণত অভিভাবকদের ধরাবাধা নিয়মে পড়াই না। নিজের মতো করে বেশি সময় নিয়ে পড়াই। ২০০০ থেকে শুরু করে ৭০০০ টাকা পর্যন্ত টিউশনি করিয়েছি। নিজের খরচ মেটানোর তাগিদেই ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে টিউশনি করাই। কখনো ছাত্রের বাসায় যেতে তিনবার গাড়ি পাল্টাতে হয়। কখনো বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে ফিরতে হয়। রাত ১১টার দিকে হলে এসে নিজের পড়াশোনা করি। অনেক সময় খুব কষ্ট হয়, রুটিনমাফিক এ জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ঐ যে মধ্যবিত্ত বলে কথা, সংগ্রামই যাদের শেষ ঠিকানা। তবে বিশ্বাস করি পরিশ্রম কোনোদিন বিফলে যায় না। একসময় একসাথে পাঁচটা টিউশনি করাতাম। বিশেষ অভিজ্ঞতা বলতে এক ছাত্রকে একদিনে পাঁচ ঘন্টা ২০ মিনিট পড়িয়েছি একটানা। ভালো লাগার বিষয় হলো ছাত্রের বাসা থেকে ঈদ গিফট পাওয়া। মাস শেষে হাতে কষ্টের টাকা পেলে খুশির অন্ত থাকে না। ডাক বিভাগের লোক না হয়েও টিউটরদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বস্তু সাদা বা নীল রঙের খাম। ভালো থাকুক সকল টিউটররা।
সানাল খারাজ
লেভেল-৩, সেমিস্টার-১, কৃষি অর্থনীতি বিভাগ
প্রতিদিন একই জায়গায়, একই উদ্দেশ্যে, একই সময়, বারবার যাওয়াই মনে হয় টিউশনির সংজ্ঞা। এটি কারো টিকে থাকার উত্স, কারো শখ! আবার কেউ কেউ অভিজ্ঞতার জন্য করে থাকে। টিউশনি কারো কাছে অতি দুর্লভ বস্তু আবার কারো কাছে সহজলভ্য! আমার কাছে টিউশনি হচ্ছে ভাগ্যের খেলা। অনেক খুঁজেও টিউশনি পাচ্ছিলাম না। প্রথম টিউশনি পেয়েছিলাম এক বন্ধুর মাধ্যমে। অনুভূতি প্রকাশ করার মতো ভাষা নেই, আমার কাছে প্রথম চাকরি পাওয়ার মতোনই ছিল ব্যাপারটা। বুকের মধ্যে একটা ভয় কাজ করছিল! পড়াতে পারবো কি? কিন্তু পেরেছি অবশেষে। টিউশনি করানোর প্রথম উদ্দেশ্য হচ্ছে স্বাবলম্বী হওয়া। আমি ছোটবেলা থেকেই চেয়েছি নিজেকে স্বাবলম্বী করতে। সেই ইচ্ছে থেকেই আসলে টিউশনি করি। এ যাদুর শহরে ভালো একটি টিউশনি খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন ব্যাপার। কিন্তু সেটি সহজ করে দিবে আপনার বন্ধুসুলভ আচরণ। সবার সাথে ভালো সম্পর্ক রাখতে হবে। দুঃখের বিষয়, কিছু মিডিয়া আছে যারা টিউশনি দেয়ার নামে প্রতারণা করে, হাতিয়ে নেয় টাকা যা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা দেয়ার সামিল। বিশেষ করে নতুনদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। টিউশনি চাকরির প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রকৃতপক্ষে হাত খরচের জন্য টিউশনি করা। টিউশনি করানোর ফলে পরিশ্রম করতে শিখেছি, শিখেছি সময়ের সঠিক ব্যবহার করতে। যা আমাকে আত্মবিশ্বাসী ও আত্মনির্ভরশীল হতে শিখিয়েছে। বেঁচে থাকার লড়াইয়ে, টিকে থাকার লড়াইয়ে টিউশনিই হাজারো শিক্ষার্থীর কাছে ঢাল স্বরূপ। দিনশেষে আমরা স্বপ্ন দেখি, স্বপ্ন দেখাই। এভাবেই কেটে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন।
নুসরাত জাহান মিতুল
লেভেল-৩, সেমিস্টার-২, কৃষি অনুষদ
টিউশনি! ব্যাচেলর জীবনে নিজের উপার্জনের একটি মাধ্যম। বিশেষ করে আমরা যারা পরিবার ছেড়ে পড়াশুনার জন্য হলে থাকি তাদের জন্য টিউশনি অনেকটা মুশকিল আসানের মতো। নিজের ছোট ছোট শখ মেটাতে টিউশনি অনেকটা সহায়ক ভূমিকা পালন করে। অনেকে টিউশনি করে শুধু স্বাবলম্বীই হচ্ছে না, পরিবারকে সাহায্যও করছে। টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ার কারণে প্রচুর ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে কাটে সারা সপ্তাহ। তারপরও সময় বের করে টিউশনি করাতে হয়। বিশেষ করে যদি আমার পরীক্ষা আর ছাত্রের পরীক্ষা একই দিনে হয়, তখন পরীক্ষার আগেরদিন সময় বের করতে হয়। আর টিউশনি যদি হয় ক্যাম্পাস থেকে দূরে, তাহলে তো আর কথাই নেই! তবে এত কষ্টের পরেও মাসের শুরুতে যখন সম্মানী পাই, তখন সত্যিই সব কষ্ট ভুলে যাই। মাসের প্রথম কয়েকদিন ছাত্রছাত্রীর বাসায় যাওয়া বেশ রোমাঞ্চকর। প্রতিদিনই মনে হয়, আজই বুঝি সম্মানীটা পাব। মনে আছে, প্রথম সম্মানীটা যেদিন পেয়েছিলাম, অন্যরকম অনুভূতি ছিল। নিজের প্রথম উপার্জন বলে কথা!! যখন ওরা পরীক্ষায় ভালো করতে থাকে, অনেক ভালো লাগে। তখন মনে হয় এগুলো বুঝি সার্থকতার স্বীকৃতি। বিশেষ করে বাচ্চাদের পড়াতে খুব ভালো লাগে। ওদের অদ্ভুত সব প্রশ্ন শুনে অবাক হই। টিউশনি করানোর ফলে প্রতিনিয়ত নতুন কিছু শিখছি। আরেকটা বিষয় যেটা আমাদের জন্য রীতিমতো অপমানজনক তা হলো, আমাদের পরিশ্রমের সঠিক মূল্যায়ন না করা। কিছু অভিভাবক আছেন যারা নামমাত্র সম্মানীটুকু দিতেও অপারগতা প্রকাশ করেন। এতে যে তার নিজেরও সম্মানহানি হচ্ছে তা বুঝতে পারেন না।
সুব্রত বিশ্বাস
লেভেল-২, সেমিস্টার-১, এনিমেল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদ
জন্মসূত্রে একটি কোটা পেয়েছি দরিদ্র-মেধাবী। আমার মতো এরকম অসংখ্য কোটাধারীর স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছে টিউশনি নামক শব্দটি। ছোটবেলায় সংসারের খরচ মিটিয়ে বই,খাতা,কলম কিনতে বাবাকে হিমশিম খেতে হতো। খুব ইচ্ছে হতো যদি নিজের খরচটা চালাতে পারতাম। অস্টম শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়ে টিউশনির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিকালীন সময়েও থেমে ছিলাম না। আমার কাছে টিউশনি স্বপ্নপূরণের হাতিয়ার। ২০১৮ সালের শেকৃবির ক্যাম্পাসে পা রাখি। হলে সিট পাওয়া নিয়ে যতটা সংশয় ছিল তার চেয়ে বেশি ছিল একটি টিউশনি পাওয়া নিয়ে। এক বন্ধুর মাধ্যমে পাওয়া আমার ক্যাম্পাস জীবনের প্রথম টিউশনির মেয়াদ ছিল মাত্র পাঁচ দিন। খুব খারাপ সময় কাটছিল। অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছিলাম। অনেক চেষ্টার পরে একটি টিউশনি পাই। এমন চড়াই-উত্রাই পার করে ছুটে চলছে টিউশনির চাকা। টিউশনির বদৌলতে বিভিন্ন কোম্পানির বিস্কুটের স্বাদ পেয়েছি, লেগুনায় ঝুলতে শিখেছি। একজন শিক্ষার্থীর মনে স্বপ্নের বীজ বপন করতে শিখেছি। এজন্য নিজের উপর গর্ব অনুভব করি। তবে মুদ্রার যে দুপিঠ, উল্টো পিঠ একটু ভিন্ন। গত রমজান মাসে ক্যাম্পাস বন্ধ হলো, চাতক পাখির মতো দিন গুনছিলাম আর ভাবছিলাম টিউশনির টাকা দিয়ে কত কিছুই না কিনে বাড়িতে ফিরব। অতঃপর টিউশনির শেষের দিনে আন্টি (ছাত্রের মা) অতি বিষণ্ন স্বরে বললেন, ‘এবার ঈদে আমাদের খুব একটা সংকট যাচ্ছে বেতন ঈদের পরে দিব’। রাগ, দুঃখ বা কষ্ট যা অনুভব করি না কেন দিনশেষে আমার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছে এই টিউশনি।
