রোবটিক্সের দুনিয়ায় আমাদের তরুণরা

আপডেট : ২৫ জুন ২০১৯, ১৯:৫৮

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিস্ময়। ভাবা হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট আগামীতে মানুষের জীবনযাপনকে আরো সহজতর করে তুলবে। আর তাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে নানা গবেষণা হচ্ছে। এ দেশে তরুণদের কল্যাণেই আইটি ও প্রযুক্তি সেক্টরে বিপ্লব ঘটেছে। রোবট বিষয়েও এ দেশের তরুণদের নতুন নতুন উদ্ভাবন দেশ ও বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে। আমাদের এবারের আয়োজনে বাংলাদেশি তরুণদের উদ্ভাবিত কয়েকটি ব্যতিক্রমী রোবটের খবর জানিয়েছেন সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার

রোবট ফোর্স

আগুনে দগ্ধ হয়ে প্রাণহানির বেশ ক’টি ঘটনা ঘটেছে দেশে। আটকে পড়া মানুষদের বাঁচাতে গিয়ে কিংবা খুব কাছ থেকে আগুন নেভাতে গিয়ে প্রাণ হারাতে হয়েছে ফায়ার সার্ভিস কর্মীকেও। দেশে ঘটে যাওয়া এমন ঘটনাই ভাবিয়ে তুলেছিল তিন শিক্ষার্থীকে। অবিরাম প্রচেষ্টায় তাঁরা উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ রোবট ফোর্স (বিআরএফ)। যেটি ফায়ারম্যানের পরিবর্তে আগুন নির্বাপণের কাজ করবে। এই তিন শিক্ষার্থী হলেন চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ইলেকট্রনিকস বিভাগের ৮ম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী জাহেদ হোসাইন নোবেল, একই সেমিস্টারের ফাহিম জাওয়াদ ও ৬ষ্ঠ সেমিস্টারের ইমতিয়াজ বিন সোয়াইব। তাঁদের উদ্ভাবিত রোবটটি রিমোট কন্ট্রোল সিস্টেম দ্বারা পরিচালিত। রোবটটিতে আগুন নির্বাপণে ফায়ার এক্সটিংগুইশার, কালো ধোঁয়া টেনে নিতে কুলিং ফ্যান, অন্ধকারে আলোর সুবিধার্থে দুটি হেড লাইট এবং মনিটরিংয়ের সুবিধার্থে লাইভ ক্যামেরা ও জিপিএস ট্র্যাকিং সিস্টেম সংযোজন করা আছে। আর পানি ছিটানোর জন্য লাগানো আছে নল। ফায়ার সার্ভিসের পানির ট্যাংকের পাইপটি এই নলে যুক্ত করে দিলেই হলো। নিরাপদ দূরত্বে থেকে একজন ফায়ারম্যান রিমোটের মাধ্যমে এই রোবট পরিচালনা করতে পারবেন। সর্বোচ্চ ৮শ মিটার দূরত্ব থেকে রিমোটের মাধ্যমে এটি চালানো যায়। চালানোর সুবিধার্থে ছয়টি চাকা লাগানো আছে রোবটটির নিচের অংশে। চাকা যুক্ত রোবটটি উঁচু-নিচু জায়গায় ব্যবহারের উপযোগী। আর সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে ট্যাঙ্কের আদলে রোবটটি। যেটি বহুতল ভবনের সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে আগুনের কাছে পৌঁছে যাবে। ওই সময় রোবটটি পরিচালনাকারী ফায়ারম্যান রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে পানি ছিটিয়ে কিংবা ফায়ার এক্সটিংগুইশার ব্যবহার করে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করবেন। আগুন নির্বাপণ ছাড়াও রোবটটি কক্ষে আটকে থাকা মানুষও শনাক্ত করবে বলে জানিয়েছেন উদ্ভাবক টিমের সদস্য জাহেদ হোসাইন নোবেল। তিনি জানান, রোবটে হিউম্যান ডিটেক্ট সেন্সর সংযোজন করা হয়েছে। যা কোনো কক্ষে আটকে থাকা মানুষকে শনাক্ত করে বার্তা দেবে।

রোবট লি

বাংলা স্বরবর্ণ থেকে হারিয়ে যাওয়া একটি লিপি হলো লি। যা দেখতে ৯-এর মতো ছিল। এ বর্ণটিকে স্মরণে রাখতে রোবটটির নামকরণ করা হয়েছে রোবট লি। ফ্রাইডে ল্যাবের সদস্যরা ‘আমি লি, আবার আসিয়াছি ফিরে, রোবট হয়ে এই বাংলায়’ এ স্লোগানে এ রোবটের নামকরণ করেন। দেশের প্রথম পায়ে হাঁটা রোবট লি উদ্ভাবনের দাবি করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ তরুণ শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রাইডে ল্যাবে এই রোবট তৈরি করেছেন তাঁরা। গত ২৯ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআইসিটি ভবনের নিচতলায় রোবটটি উন্মুক্ত করা হয়। ফ্রাইডে ল্যাবের টিম লিডার হিসেবে আছেন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০০৯-১০ সেশনের শিক্ষার্থী নওশাদ সজীব। তিনি এছাড়া টিমের অন্য সদস্যরা হলেন স্থাপত্য বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান রুপক, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একই বর্ষের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ সামিউল ইসলাম ও জিনিয়া সুলতানা জ্যোতি। টিমের সদস্য মেহেদী হাসান রুপক বলেন, ‘আমি রোবটের কাঠামো ডিজাইনের কাজ করেছি।’ টিমের আরেক সদস্য সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আগের যে রোবট (রিবো) তৈরি করা হয়েছিল, সেটা হাঁটাচলা করতে পারত না। আমরা চেয়েছিলাম এমন একটি রোবট তৈরি করতে যেটা হাঁটাচলা করতে পারে।’ টিমের আরেক সদস্য জিনিয়া সুলতানা জ্যোতি বলেন, ‘এ রোবটে আমরা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা সংযুক্ত করেছি। ফলে রোবটটি বাংলায় কথা বলার পাশাপাশি চলাচল করতে পারে। এছাড়া হাত-পা নাড়ানো এবং অঙ্গভঙ্গি করতে পারে।’ এদিকে আইসিটি ডিভিশনের পক্ষ থেকে ১০ লক্ষ টাকা অনুদানের কথা উল্লেখ করে নওশাদ সজীব বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছ থেকে ১০ লক্ষ টাকা অনুদান পেয়েছি। তবে আমাদের এ রোবটকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে যে ধরনের উপাদান বা যন্ত্রপাতির দরকার, তা বাইরে থেকে আনতে হবে। যার জন্য আরো অনেক টাকার প্রয়োজন।’

রোবট ব্যাংরো

ব্যাংরো। একটি রোবটের নাম। নির্দেশনা দেওয়া হলে এগিয়ে চলে সামনের দিকে। পেছনে আসতে বলা হলে চলে আসে পূর্বের স্থানেই। করতে পারে হ্যান্ডশেকও। শুধু তাই নয়, ছবি তোলার সঙ্গে সঙ্গে দিতে পারে তথ্যও। রোবটটি তৈরি করেছে বাংলাদেশেরই একদল তরুণ। ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ইলেকট্রনিক্স বিভাগের ৮ শিক্ষার্থী তৈরি করেছে রোবটটি। শিক্ষার্থী ফরিদ হোসেন বলেন, ‘বাংলা রোবট থেকে ব্যাংরো শব্দটি এসেছে। রোবটটি বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় কথা বলতে পারে। উন্নত ভয়েস ও ইমেজ রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে এর সামনে থাকা মানুষকে চিনতে পারে। বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে সামনে থাকা মানুষের সঙ্গে করতে পারে যোগাযোগও।’ ফরিদ আরো বলেন, ‘বাংলা ভাষায় ভয়েস কমান্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এখনো বাংলা ভাষার ভয়েস রিকগনিশন এপিআই নেই। ফলে রোবট সহজে বাংলা ভাষায় কমান্ড নিতে পারে না। কথা বললে অনেক সময় ইংরেজদের মতো বাংলা বলে। নির্দেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় প্রতিবন্ধকতা, যা নিয়ে দেশের রোবট বিশেষজ্ঞরাও কাজ করছেন।’ রোবটিটি তৈরিতে সার্বিক সহায়তা করেছে মাস্টার ল্যাবস নামক রোবটিক ল্যাব। আর এটিকে বর্তমানের পর্যায়ে নিয়ে আসতে খরচ হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। যার সবটাই বহন করতে হয়েছে ফরিদ ও তাঁর বন্ধুদের। রোবটটি তৈরিতে রাহাত উদ্দিন ও এহসানুল হক রানাসহ কাজ করেছেন আরো ছয় তরুণ, যাদের সবাই ইলেকট্রনিক্স বিভাগের ৮ম পর্বের শিক্ষার্থী। এ দলের নেতৃত্বে থাকা শিক্ষার্থী এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘রোবট হয়ে উঠবে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অংশ। ভবিষ্যতে দেশের কলকারখানায়ও ক্রমাগত এর ব্যবহার বাড়তে থাকবে। আমাদের তৈরি এই রোবটিক আর্ম মেডিসিন প্যাকেজিং ও বিস্কুটের কারখানাসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।’

রোবট মারস রোবার

রোবটিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চার বছরের চেষ্টায় একটি রোবট বানিয়েছেন সিলেটের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী। সেই তরুণ উদ্ভাবকদের দাবি, রোবটটি বিজ্ঞানীদের অপার আগ্রহের কেন্দ্রে থাকা গ্রহসহ বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করতে সক্ষম। এরইমধ্যে দেশ-বিদেশের কয়েকটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে এসেছে সফলতাও। মারস রোবার রোবটটি নিজের নিয়ন্ত্রণে সব কাজ করতে পারে। সমতল কিংবা অসতমল ভূমিতে চলাফেরায়ও নেই কোনো বাধা।

মানুষ যে কাজ করতে পারে তারচেয়ে কোনো অংশে কম নয় এই রোবটটি। এই রোবটের সাহায্যে মাটি, পাথর ইত্যাদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ভিন্নগ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব অনুসন্ধান, আশপাশের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করা যাবে। এজন্য এতে যুক্ত রয়েছে গ্যাস, তাপমাত্রা, সোনার, ম্যাজারিং, ওয়েট সেন্সরসহ নানা প্রযুক্তি। সিলেট নগরীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা দুই শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ, আবির ও বর্তমান শিক্ষার্থী ফাহিম ছয় মাসের চেষ্টায় মারস রোবার নামের রোবটটি তৈরি করেন।

এরইমধ্যে দেশ-বিদেশে নিজেদের বানানো রোবটি নিয়ে প্রতিযোগিয়ায় অংশ নিয়ে নানা সফলতা অর্জন করেছেন তাঁরা। তবে কানাডা ও পোল্যান্ডের মতো দেশ থেকে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ পেলেও ফান্ডের সমস্যায় যোগ দিতে না পারায় রয়েছে কিছুটা আক্ষেপ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ফান্ডিং বড় সমস্যা বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য। মারস রোবার কোনো ধরনের ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়াই ২ কিলোমিটার দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে জানান উদ্ভাবকরা।

 

রোবট পাইপ ইন্সপেকশন

গত বছর জুলাইয়ে দেশের দুই তরুণ নিজেদের তৈরি রোবট নিয়ে রাশিয়ায় শুরু হতে যাওয়া স্টার্ট আপ ভিলেজে অংশ নিয়েছেন। রাশিয়া ও সিআইএস অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে আয়োজিত সবচেয়ে বড় মেলা এটি, যা প্রতিবছর রাশিয়ার স্কলকোভো শহরে আয়োজিত হয়। এ মেলায় অংশ নিতে সারা বিশ্ব থেকে আসে নামীদামি সব স্টার্টআপ, আন্তর্জাতিক আইটি ও ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান। দুই দিনব্যাপী চলা এ মেলা আয়োজন করে থাকে রাশিয়ার স্কলকোভো ফাউন্ডেশন।

গত বছর প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ রোবটিক্স ফাউন্ডেশন থেকে পাইপ ইন্সপেকশন রোবট নিয়ে হাজির ছিল দুই তরুণ। পাইপ ইন্সপেকশন রোবটের কাজ হলো গ্যাস অথবা পানির পাইপের ব্লক বা ফাটল নির্ণয় করা ও পাইপলাইন সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সকল তথ্য

 

সংগ্রহ করা।

রোবটিক্স ফাউন্ডেশনের টিম লিডার তানভির তাবাসসুম অভি বলেন, ‘পাইপ ইন্সপেকশন রোবট ব্যবহারের মাধ্যমে যেমন কমবে জীবনের ঝুঁকি, তেমনি প্রতি বছর ঢাকা শহরের বন্যা ও অধিক বৃষ্টিপাতের ফলে জনজীবনে যে দুর্বিষহ প্রভাব পড়ে, তা থেকেও পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। এমন রোবট ব্যবহারের ফলে সময় ও অর্থ সাশ্রয় হবে বলেও জানান তিনি।

রোবটটির ডিজাইনার ও বাংলাদেশ রোবটিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা হাফিজুল ইমরান। তিনি জানান, শুধু একের পর এক প্রোডাক্ট ডেভেলপ করে গেলেই হবে না। সেটি বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকার পাইলট প্রোজেক্ট হিসেবে যদি প্রোডাক্টটি ব্যবহারের অনুমতি দেন, তাহলে তাঁরা এটি নিয়ে বড় পদক্ষেপ নিতে পারবেন।