পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া পৌরসভার জাতীয় পার্ট-জেপি মনোনীত বাইকেল প্রতীকের প্রার্থী মো. মহিবুল হোসেনকে (মাহিম) আচরণবিধিমালা মেনে চলার নির্দেশনা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বৃহস্পতিবার বিকালে নির্বাচন ভবনে অনুষ্ঠিত বিধিভঙ্গ সংক্রান্ত ব্যাখ্যা তলবের পর এই নির্দেশনা দেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল।
তিনি বলেন, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও রিটার্নিং অফিসারের তদন্ত প্রতিবেদনে যেহেতু আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ এসেছে সেহেতু আগামীতে যাতে বিধিভঙ্গ না হয় সেদিকে দৃষ্টি রাখবেন। সিইসির বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে জেপির প্রার্থী বলেন, আমার কর্তৃক কোন আচরণবিধি ভঙ্গ হয়নি এবং আগামীতেও হবে না। আচরণবিধি ভঙ্গ করবেন না মর্মে ইসিকে আশ্বস্ত করেন বাইসাইকেলের প্রার্থী।
আগামী ১৭ জুলাই ভান্ডারিয়া পৌরসভার নির্বাচন। এর আগে গত ৮ জুলাই জাতীয় পার্টি-জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি ঢাকা থেকে ভান্ডারিয়ায় যান। গাবখান সেতু এলাকা থেকে তার ভান্ডারিয়াস্থ বাসভবন পর্যন্ত নেতা-কর্মীরা গাড়ী এবং মোটরসাইকেল বহর নিয়ে আসেন। ওই মিছিল-শোডাইনের খবর প্রকাশ করে আচরণবিধি লঙ্ঘন হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক্স এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়। ওইদিনেই ভান্ডারিয়া পৌর এলাকায় জাতীয় পার্টি-জেপি এর কর্মী সমর্থকগণ নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গ করে বাই-সাইকেল প্রতীকের পক্ষে যান্ত্রিক যানবাহন, মোটরসাইকেল শোডাউন ও মিছিল করেছেন মর্মে নৌকা প্রতীকের প্রতিন্দ্বন্দ্বী প্রার্থী লিখিত অভিযোগ করেন। ওই ঘটনায় প্রার্থীকে শোকজ করে ঘটনাটি তদন্তের জন্য জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, রিটার্নিং অফিসারকে নির্দেশ দেয় ইসি। পৌরসভা (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা ২০১৫ এর বিধি ১৩ এর বিধান ভঙ্গ হয়েছে উল্লেখ করে পিরোজপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং অফিসার দুই কর্মদিবসের মধ্যে জেপি প্রার্থীকে ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেন। গত ১০ জুলাই শোকজের জবাবের পর রিটার্নিং অফিসার প্রার্থীকে সতর্ক করে আচরণ বিধি মেনে চলার জন্য নির্দেশ দেন।
স্থানীয় পর্যায়ে বিষয়টি নিষ্পত্তির পরও নির্বাচনী প্রচারণার মাঝপথে নির্বাচন কমিশন জেপি প্রার্থীকে ঢাকায় তলব করেন। বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৩টায় সিইসির সভাপতিত্বে জেপি প্রার্থী নিজে উপস্থিত থেকে ঘটনার ব্যাখ্যা দেন। এসময়ে নির্বাচন সিইসি ছাড়াও নির্বাচন কমিশনার মো. আনিসুর রহমান, ইসি সচিব মো. জাহাংগীর আলমসহ ইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ব্যাখ্যা শুনানির শুরুতেই ইসি সচিব বিভিন্ন পত্রিকার কাটিং এবং টিভির ভিডিও ফুটেজ আচরণবিধি ভঙ্গের চিত্র তুলে ধরেন। পরবর্তীতে কমিশন থেকে প্রার্থীর কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। ঘটনার বিষয়ে প্রার্থী লিখিত বক্তব্যে বলেন, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্টিং অফিসারের কাছ থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রাপ্তির পর আমি আমি যথাসময়ের মধ্যেই অর্থাৎ আমার ব্যাখ্যা প্রদান করে আমার জবাব দাখিল করি। আমার জবাবে আমি স্পষ্ট করে আমার ব্যাখ্যা প্রদান করেছি এবং বলেছি যে তর্কিত ঘটনায় আমার সম্পৃক্ততা নেই এবং সেই ঘটনাটি একজন সাবেক মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যের তার নিজের সংসদীয় এলাকায় ব্যক্তিগত সফরমাত্র এবং এখানে আমার কোনোপ্রকার সম্পৃক্ততা নেই এবং আমি নিজে উপস্থিতও ছিলাম না। যে ভিডিও ফুটেজের কথা উল্লেখ্য ছিল অভিযোগে, সেটিও ভান্ডারিয়া পৌরসভার অন্তর্গত কোন স্থানে ধারণ করা নয়। অতএব আমাকে অভিযোগের দায় থেকে নিস্তার দিতে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং অফিসারের নিকট আমি সবিনয় আবেদন করেছিলাম। জেলা কর্মকর্তা বিষয়টি নিষ্পত্তিও করেছেন। আমাকে সতর্ককরণপূর্বক আচরণ বিধি মেনে প্রচার প্রচারণার জন্যে অনুরোধ করেন, যা আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন পালন করছি এবং ভবিষ্যতেও পালন করে যেতে বদ্ধ পরিকর।
ব্যাখ্যার জবাবে তিনি আরও বলেন, যেদিন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং অফিসার আমাকে সতর্ক করে আদেশ প্রদান করলেন, ঐ দিন, অর্থাৎ, ১২ জুলাই আমি নির্বাচন কমিশন সচিবালয় একটি পত্র প্রাপ্ত হই যেখানে ঐ একই ঘটনা এবং এর প্রেক্ষিতে রিটার্নিং অফিসার, জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপারের তদন্তের ভিত্তিতে শোডাউনের সত্যতা পাওয়া গিয়েছে উল্লেখ করে আমাকে কমিশনে সশরীরে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা প্রদান করতে বলা হয়। অর্থাৎ কথিত অভিযোগের ব্যাপারে একবার সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া তথা অভিযোগকারীর অভিযোগ পত্র এবং ততপরিপ্রেক্ষিতে আমার জবাব এবং উভয় বিবেচনান্তে জেলা নির্বাচন অফিসার ও রিটার্নিং অফিসার, তার সুচিন্তিত বিচারিক বিবেচনায় নির্বাচনের কমিশনের পক্ষে আমাকে ‘নির্বাচন চলাকালীন সময়ের (নির্বাচন পূর্ব সময়) জন্যে সতর্ককরণ পূর্বক আচরণ বিধি মেনে প্রচার প্রচারণার জন্যে অনুরোধ’ করেছেন। অতএব যে অভিযোগে একবার সম্পূর্ণ পদক্ষেপ অনুসরণ করে আধাবিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, সেই একই ঘটনার জন্যে কথিত তদন্ত রিপোর্টের (যার কোন কপি আমাকে সরবরাহ করা হয় নি) ভিত্তিতে পুনরায় বিচার প্রক্রিয়ায় হতাশ হয়েছি। কথিত অভিযোগ প্রত্যাহার করে উক্ত অভিযোগ হতে নিস্তার দেওয়ার জন্যে আবেদন করেন তিনি।
প্রার্থী আরও বলেন, জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু প্রতিমাসেই একবার করে তার নির্বাচনী এলাকায় যান। গাবখান সেতু এলাকা থেকে তার বাসভবন থেকে বাসা পর্যন্ত বরাবরই নেতা-কর্মীরা শোডাউন করে নিয়ে আসেন। তবে এবার নির্বাচন থাকায় উনি গাবখান থেকে রাজাপুর পর্যন্ত আসার পর তার গাড়ি থামিয়ে দেন। বহর থেকে নেতা-কর্মীদের আলাদা হওয়ার নির্দেশ দেন। যে শোডাউনের কথা বলা হচ্ছে-সেটি নির্বাচনী এলাকায় নয়। এটি নির্বাচনী এলাকার বাইরে।
প্রার্থী আরও বলেন, আমার কর্তৃক কোন আচরণবিধি ভঙ্গ হয়নি। আগামীতেও করবো না। বরং প্রতিপক্ষ প্রার্থী প্রতিনিয়ত বিধিভঙ্গ করে চলেছেন। এ বিষয়ে আমরা একাধিক অভিযোগ দিয়েছি।
ব্যাখ্যার জবাবে নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমান বলেন, আপনি নিজে উপস্থিত না থাকলেও আপনার পক্ষে কেউ মিছিল বা শোডাউন করলে তার দায়দায়িত্ব আপনার ওপরই বর্তায়। এমপি মহোদয় ভান্ডারিয়ার ভোটার সেহেতু উনাকে এলাকার বাইরে আমরা থাকতে বলতে পারি না। উনি যাতে কোনভাবেই আচরণ বিধিভঙ্গ না করেন-সেই বিষয়টি খেয়াল রাখবেন। ব্যাখ্যা শুনানির শেষে ইসির পক্ষ থেকে আচরণবিধি মেনে চলার বিষয়ে লিখিত দেওয়ার জন্য বলা হয়। জেপি প্রার্থী আচরণবিধি মেনে চলবেন-মর্মে লিখিত দেন।
