অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে আগ্রহী ইইউ প্রতিনিধিরা

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৩, ২২:০০

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব কিনা তা বোঝার চেষ্টা করছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রাক-নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল।

তার ভিত্তিতেই তারা সিদ্ধান্ত নেবেন ১৫ বছর পর আবারও বাংলাদেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল পাঠানো হবে কিনা। অবশ্য নিজেদের অবস্থান এখনও পরিষ্কার করে তুলে ধরেনি পর্যবেক্ষক দলটি। কিন্তু যেসব রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তারা আলোচনায় বসেছেন, সেসব দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

এবি পার্টির সদস্য সচিব মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘নির্বাচনে অন্য সব দল অংশ নেবে কিনা, সরকার ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশন করার যে কথা বলছে, সেটা তারা করবে কিনা, সম্ভব কিনা—এই দুইটি বিষয়ে প্রধানত আমাদের সঙ্গে আলোচনার সময় জানতে চেয়েছেন এবং বুঝতে চেয়েছেন।’

নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না বলে ইউরোপীয় প্রতিনিধি দলকে জানিয়েছে এবি পার্টি। মজিবুর রহমান বলেন, ‘আর সেটা হলে সব দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। তারা তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। সেটা কিভাবে সম্ভব, আমরা তার ব্যাখ্যা দিয়েছি। তবে তারা কোনো নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে মন্তব্য করেননি। দেশের প্রচলিত নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে জানতে চেয়েছেন।’

আওয়ামী লীগের সঙ্গে বৈঠকে ইইউ প্রতিনিধি দল।

রাজনৈতিক দলগুলো যে সভা-সমাবেশ করছে, সেখান থেকে সংঘাত তৈরি হওয়া কিংবা সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার কোনও আশঙ্কা আছে কিনা, সেই বিষয়টিও জানতে চেয়েছেন প্রতিনিধি দলটি।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে তারা কি নিয়ে আলোচনা করেছেন তা আমাদের জানিয়েছেন। তারা আমাদের কাছে জানতে চেয়েছেন, নির্বাচন কীভাবে ফেয়ার করা সম্ভব? সবাই অংশগ্রহণ করবে কি না? কীভাবে নিরপেক্ষ হবে? নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে তারা আলাদাভাবে আমাদের কাছে কিছু জানতে চাননি।’

সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির এই নেতা বলেন, ‘আমরা বলেছি নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে হলে সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। সব রাজনৈতিক দলের ঐক্যমত এবং সদিচ্ছার ওপর এটা নির্ভর করে। নির্বাচন পদ্ধতি নয়, আমরা আলোচনা এবং ঐক্যমতে জোর দিয়েছি।’

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিদেশ বিষয়ক কমিটির সদস্য শামা ওবায়েদ বলেন,‘বাংলাদেশে অবাধ, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্ভব কিনা, এটাই ছিল ওনাদের জিজ্ঞাসা। আর সেটা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশের সংবিধান, নির্বাচন পদ্ধতি, আরপিও, বিচার বিভাগ, প্রশাসন—সব নিয়েই কথা হয়েছে।’

শামা ওবায়েদ বলেন, ‘আমরা আমাদের মতামত তুলে ধরে জানিয়েছি, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। শেখ হাসিনার অধীনে আমরা নির্বাচনে যাব না।’

বিএনপির সঙ্গে বৈঠকে ইইউ প্রতিনিধি দল।

ইউরোপীয় প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের বৈঠকের সময় আরও অনেকের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘ওরা বাংলাদেশে কিভাবে নির্বাচন হয়, তা বিস্তারিত জানতে চেয়েছেন। জানতে চেয়েছেন, শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে। আমরা বিস্তারিত বলেছি। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য, সরকার যা যা করেছে তা আমরা জানিয়েছি।’

সব দল নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা—এমন কোনো প্রশ্ন আওয়ামী লীগের কাছে রাখা হয়নি বলে দাবি করেন সেলিম মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে তারা সব দল নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা, তা জানতে চায়নি। তারা ঢাকায় একই দিনে দুই বড় দলের শান্তিপূর্ণ সমাবেশের প্রশংসা করেছেন।’

এই সরকারের অধীনে সংবিধান মেনে নির্বাচন হবে বলেও জানিয়েছে আওয়ামী লীগ।

সেলেরি রিকার্ডোর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের এই প্রাক নির্বাচনী দলটি ঢাকায় আসে ৯ জুলাই। এরমধ্যে রাজনৈতিক দল ছাড়াও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তারা।

বৈঠক করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি দেশের কূটনীতিক এবং জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীর সঙ্গে। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের মানবাধিকারের বিষয়টিও সামনে এসেছে।

জাতীয় পার্টির সঙ্গে বৈঠকে ইইউ প্রতিনিধি দল।

তারা মানবাধিকার কামিশনের কাছে জানতে চেয়েছে, নির্বাচনের সময় বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা এবং সহিংসতার আশঙ্কা আছে কিনা।রোববার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, মানবাধিকার কর্মী এবং দেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের সঙ্গেও বৈঠক করেন তারা।

সবশেষ, ২০০৮ সালে বাংলাদেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে আসেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দল। ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে আসেননি তারা। প্রাক-নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলটি আগামী ২৩ জুলাই পর্যন্ত ঢাকায় আছেন।

এরপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ জোসেপ বোরেলের কাছে মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দেবেন তারা। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হবে বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দল আসবে কিনা।

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের বাংলা সংস্করণের হয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন হারুন উর রশীদ স্বপন। এই প্রতিবেদনের সব ধরনের দায়ভার ডয়চে ভেলের।

ইত্তেফাক/এএএম