জি-টোয়েন্টি মূলত ‘গ্রুপ অব টোয়েন্টি ফিনান্স মিনিস্টারস অ্যান্ড সেন্ট্রাল ব্যাংক গভর্নরস’দের বৈশ্বিক ফোরাম। অগ্রসর অর্থনীতির ১৯টি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে নিয়ে গঠিত ২০ সদস্যবিশিষ্ট এই জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৯৯ সালে। অন্যদিকে ২০০৮ সাল থেকে এই জোটের কাজের ক্ষেত্র আরো চারটি শাখায় সম্প্রসারিত হয়। এর মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে নিয়মিত শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শিল্পোন্নত ও উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে নীতিসংক্রান্ত সমন্বয় সাধন করা এই জোটের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। এক্ষেত্রে বিশ্ব অর্থনীতির মূল বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে জোটের অর্থমন্ত্রীরা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে মনোনিবেশ করেন। এছাড়া পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরো অনেক বৈশ্বিক ইস্যু আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। যদিও সমালোচকদের দাবি জি-টোয়েন্টি অতি মুনাফালোভী একটি জোট। শিল্পোন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক নীতির নির্যাস বাস্তবায়নেই এই জোটের আগ্রহ বেশি। বিশ্বব্যাপী সামাজিক অসমতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে জি-টোয়েন্টি কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে নাই। আমরা যদি লক্ষ করি, তাহলে দেখব যে, জি-টোয়েন্টি জোটের শীর্ষ সম্মেলন চলাকালে একদল বিক্ষোভকারী বরাবর ব্যাপক বিক্ষোভ করে থাকেন। একটি উত্কৃষ্ট পুঁজিবাদী বিশ্বের বর্তমান বাস্তবতা আমলে নিলে এই বিক্ষোভ একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। যা বিশ্ব পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সারা বিশ্বের তরুণ-তরুণী আবালবৃদ্ধবনিতার এক ধরনের অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ বলে ধরে নেওয়া হয়। এতদসত্ত্বেও ২০০৯ সাল থেকে শুরু হওয়া জি-টোয়েন্টি ‘হেড অব গভর্নমেন্ট’ অথবা ‘হেড অব স্টেট’ বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনটি আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আলোচনায় গুরুত্ব পেয়ে থাকে। এই ধারাবাহিকতায় আগামী ২৮-২৯ জুন জাপানের ওসাকায় অনুষ্ঠেয় সম্মেলন ঘিরে জমজমাট আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। যদিও বিরূপ বিশ্ব প্রেক্ষাপটে জাপানের জি-টোয়েন্টি সম্মেলনের বাড়তি গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশ্ব নেতাদের উপস্থিতিতে জাপান সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে অনেক ইস্যু অগ্রাধিকার পাবে বলেই প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে চীনের বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল হংকংয়ের চলমান বিক্ষোভ নিয়ে আলোচনার আভাস দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। যদিও ট্রাম্পের এই অভিপ্রায়কে তাত্ক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে গণচীন। তবে সব ছাপিয়ে চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধ, ইরান-মার্কিন উত্তেজনা, জলবায়ু পরিবর্তন, কোরীয় নিরস্ত্রীকরণ এবং অভিবাসী ইস্যু নিয়ে সাধারণ আলোচনা সম্মেলনে উত্তাপ ছড়াবে বলেই অনুমান করা হচ্ছে। এ ছাড়াও মূল আলোচনার বাইরে বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ব নেতারা নিজেদের মতো করে উন্মুক্ত মতামত দেবেন। মূলত বিশ্ব রাজনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্ব নেতাদের অভিমত থেকে পরিস্থিতি অনুধাবন করা যেতে পারে। যে কারণে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বিশেষজ্ঞরা এ ব্যাপারে নিজেদের নীতির পর্যালোচনা করে করণীয় নির্ধারণে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। মাত্র দুদিন আগে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয় দেশটির বিশেজ্ঞরা জাপান জি-টোয়েন্টি সম্মেলন সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশ নেন। ভলদাই গ্রুপ আয়োজিত ঐ আলোচনায় রুশ বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সংস্কারের মাধ্যমে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে WTO যুগোপযোগী করার আহ্বান জানাবে রাশিয়া ও জাপান। তাই জাপান জি-টোয়েন্টি সম্মেলন নানা বৈশ্বিক ইস্যুতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে আশির দশক থেকে চীনের বৈশ্বিক উত্থান এবং তত্পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত রাষ্ট্রব্যবস্থার ভাঙনের মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদী বিশ্ব এক নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছিল। এক্ষেত্রে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ‘কাউন্সিল ফর মিউচ্যুয়াল ইকোনমিক অ্যাসিসট্যান্স’ বা কমিউকন-এর বিলুপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ব অর্থনীতি এক নতুন সংকটে পরে। এই সংকট উত্তরণ প্রক্রিয়াটি সংঘটিত হওয়ার প্রাক্কালে বৈশ্বিক মন্দাভাব প্রকট হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতা নিশ্চিত করে যে ৯৯ সালে ফরাসি অর্থমন্ত্রীর পরিকল্পনায় গড়ে ওঠা জি-টোয়েন্টি স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় পশ্চিমা আধিপত্যকে সংগতিপূর্ণ করতেই পরিপুষ্ট হয়েছে। এর ফলে সম্প্রসারিত হয় মূলধারার পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিসর। তাই এর অন্তর্নিহিত কারণ হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হয় কমিউকনের ব্যর্থতা থেকে সোভিয়েত উত্তরসূরি রাষ্ট্র রাশিয়ান ফেডারেশনের অবধারিত সম্ভাব্য পালটা প্রতিক্রিয়া দিকে সূক্ষ্ম পশ্চিমা পর্যবেক্ষণ। নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকে রাশিয়া তার সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলোকে নিয়ে বিভিন্ন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়াস নেয়। প্রথমে দেশটির নেতৃত্বে গড়ে ওঠে সিআইএস বা কমনওয়েলথ অব ইনডিপেনডেন্ট স্টেটস। পরবর্তী ঐ আদলেই সিআইএসভুক্ত দেশগুলো ‘কাস্টমস ইউনিয়ন’ নামক একটি বাণিজ্য চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। এর ফলে আঞ্চলিক বাণিজ্যে পশ্চিমা হস্তক্ষেপ সীমিত হয়। এ সংক্রান্ত সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ‘ইউরেশিয়ান ইকোনমিক কাউন্সিল’ গঠিত হলে মূলধারার বিশ্ব অর্থনীতি গুরুতর প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হয়। এর ফলে সেন্ট্রাল এশিয়ার জ্বালানি ও অন্যান্য বাণিজ্যে রুশ নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী হয়। এখানে জি-সেভেনের বাইরে থাকা অবশিষ্ট বিশ্ব অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর সংগঠন ব্রিকসের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য। এই সম্ভাবনার মাত্রায় মাত্র কয়েক বছর আগে যুক্ত হয় ‘ব্রিকস অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক’। বলা চলে এই সকল বিকল্প অর্থনৈতিক প্রক্রিয়াসমূহের ওপর একধরনের আন-অফিশিয়াল পর্যবেক্ষণের পশ্চিমা ইচ্ছাকে সহজতর করে জি-টোয়েন্টি প্রক্রিয়া। আমরা জানি যে জি-টোয়েন্টির গুরুত্বপূর্ণ সদস্যগুলোর মধ্যে স্বীকৃত শিল্পোন্নত সাত সদস্যই জি-সেভেনের সদস্য। এদিকে বিশ্ব অর্থনীতিতে এখনো জি-সেভেনের নীতির স্পষ্ট প্রভাব বিদ্যমান। সংগত কারণেই জি-সেভেন নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে জি-টোয়েন্টির এজেন্ডা মূল্যায়নের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিকে অনুকূল রাখার প্রয়াস পায়। এমন পরিপ্রেক্ষিতে জাপান সম্মেলন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য কী বার্তা দেবে সেদিকেই সবার নজর থাকবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের অভিমত বরাবরের মতো বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় পরিকল্পনামাফিক বক্তব্য দিয়ে উত্তাপ ছড়াবেন শীর্ষ নেতারা। এর বাইরে সন্ত্রাসবাদ দমন ও জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত আন্তঃসদস্য বিরোধ প্রত্যক্ষ করবে বিশ্ববাসী। অথচ বৈশ্বিক সম্পদের সুষম ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ন্যূনতম নীতি প্রণয়ণের সুযোগ এই জোটের আছে। চাইলে এই জোটের আওতায় বিশ্ব অর্থনীতিকে আরো গতিশীল করা সম্ভব। কিন্তু আদৌ এমনটি হবে সেই প্রত্যাশা কেউ করছেন বলে মনে হচ্ছে না। গত শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মূল সমস্যা চিহ্নিত করে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এতে করে বিশ্বব্যাপী জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হতে পারত। তৃতীয় বিশ্বের মানুষের দুর্দশা লাঘব হতো। কিন্তু এরকম কোনো জুতসই কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে নাই জি-টোয়েন্টি। অন্যদিকে জাতীয় এজেন্ডার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণ অগ্রাধিকার দিয়ে শিল্পোন্নত দেশগুলো স্বল্পন্নোত ও উন্নয়নশীল বিশ্বে বৈদেশিক সাহায্য প্রদান করে। কিন্তু সেগুলো বহুভাবে বিতর্কিত। যে কারণে জি-টোয়েন্টির নীতি প্রণয়নে এ ব্যপারটি অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। রেনেসাঁ-উত্তর ইউরোপীয় অর্থনৈতিক উত্থানের মধ্য দিয়ে বিশ্বে উদ্ভব হয়েছে একটি টেকনোক্রেটিক সোসাইটি Technocrati society। যেখানে উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তিবর্গ কাজে নিয়োজিত। এর ফলে তারা ভোগ করছেন একচেটিয়া সাফল্য ও উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি। বিপরীতে ক্রমশ পেছনে পড়ছে উন্নয়নশীল ও স্বল্পন্নোত দেশগুলো। আমরা মনে করি এই বাস্তবতা থেকে ৩য় বিশ্বের জনগণকে মুক্ত করতে পারে জি-টোয়েন্টির সদিচ্ছা। সর্বশেষ বলতে হয় যে, স্নায়ুযুদ্ধ-উত্তর বিশ্ব-অর্থনীতিতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষের নেতৃত্ব ইতিমধ্যে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকা, ইউরো-আফ্রিকান ব্লকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জাপান আক্রান্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে আফ্রিকায় জেঁকে বসেছে চীন। একই সঙ্গে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্যযুদ্ধে চীনের কাছে ধরাশায়ী হয়েছে জাপান। এই পরিপ্রেক্ষিতে জি-টোয়েন্টির জাপান সম্মেলনে অংশ নেওয়া সব পক্ষের নজর থাকবে নিজের বাণিজ্য স্বার্থ উদ্ধার করা। এর বাইরে বাড়তি কিছু ঘটলে সেটি হবে অপ্রত্যাশিত সাফল্য।
n লেখক : বিশ্লেষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা
