মশা নিধনেই গলদ

আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৩, ০০:৫০

ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ ধারণ করার নেপথ্যের কারণ হলো মশা নিধন কার্যক্রমের প্রক্রিয়ার মধ্যেই গলদ রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী মশা নিধন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে না। কীটতত্ত্ববিদরা দুই সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম মনিটরিং করে এ তথ্য জানান। তাদের মতে, প্রতি বছর এডিস মশা দ্বিগুণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে বংশ বিস্তার করছে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী মশা নিধনের ওষুধের সঠিক ডোজ প্রয়োগ করতে হয়। কিন্তু দুই সিটি করপোরেশনের মশা নিধনে দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এ বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। মাঠ পর্যায়ে এ গাইডলাইন মানা হচ্ছে কি না—সেটাও মনিটরিং করেন না তারা। 

কীটতত্ত্ববিদরা বলেন, শস্যের পোকামাকড় নিধনের প্রক্রিয়া আর মশা নিধনের ওষুধ প্রয়োগের প্রক্রিয়া এক নয়। এর মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। মহাখালী জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিত্সা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) কীটতত্ত্ব বিভাগের এক বিশেষজ্ঞ বলেন, দুই সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল বিভাগীয় প্রধানদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কীভাবে এডিস মশার বিস্তার রোধ করা হয়, জানতে চাওয়া হলে তার কোনো সদুত্তর তারা দিতে পারেননি। 

এডিস মশা নিধনে ওষুধের সঠিক মাত্রা নির্ধারণ ও তার প্রয়োগ সঠিকভাবে না করা এবং মনিটরিংয়ের দুর্বলতার কারণে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আজ ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। কীটতত্ত্ববিদদের মতে, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও কলকাতা সিটিতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী ওষুধ প্রয়োগ করে তারা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। কিন্তু বাংলাদেশে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে উলটো চিত্র দেখা যায়। দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা কাজ না করে মশা মারতে কামান দাগার মতো কথা শুনিয়ে যান। অথচ কাজের কাজ কিছুই করেন না।

বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ও কীটতত্ত্ববিদরা বলেন, রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে ১২৯ জন ওয়ার্ড কমিশনার যদি নিয়মিত প্রতিদিন নিজ নিজ এলাকা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করাসহ এডিস মশার উত্সস্থল ধ্বংসে কার্যক্রম পরিচালনা করতেন তাহলে পরিস্থিতি আজকের মতো ভয়াবহ আকার ধারণ করত না। তাদের দায়িত্ব পালনে অবহেলার কারণে রাজধানীসহ দেশব্যাপী ডেঙ্গু ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গুতে ৯ জন মারা গেছেন। আর আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৭৫৫ জন। এবছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ১৫৫ জন আর আক্রান্তের সংখ্যা ২০ হাজার ৭০৫ জন। গত ২৩ বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ও আক্রান্তের হার এটাই সর্বোচ্চ। বিশেষজ্ঞ ও কীটতত্ত্ববিদদের মতে, রাজধানী ঢাকা হচ্ছে ডেঙ্গুর রেড জোন। 

চিকিত্সকরা বলছেন, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত এত রোগীর চাপ এর আগে হাসপাতালগুলোতে তারা আর কখনোই দেখেননি। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতাল, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও মহাখালী ডেঙ্গু ডেডিকেটেড হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ডেঙ্গু রোগীর মাত্রাতিরিক্ত চাপে হাসপাতালগুলোতে ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই’ অবস্থা। কর্তব্যরত ডাক্তার ও নার্সরা পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমিশিম খাচ্ছেন। কাকে রেখে কাকে চিকিত্সা দেবেন এটাই তারা ঠিক করতে পারছেন না। 

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছেন, এখনই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। সামনে ডেঙ্গুর মৌসুম অর্থাত্, আগস্ট সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরেকটু ভয়াবহ হলে চিকিত্সাব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে অন্য রোগীদের চিকিত্সাসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাই সময় থাকতে মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এটা করতে পারলেই আমরা ভারতের কলকাতা সিটির মতোই রাজধানী ঢাকাতেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হব। 

বিশেষজ্ঞ ও কীটতত্ত্ববিদরা কলকাতার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে ইত্তেফাককে বলেন, সেখানে এডিস মশার উত্সস্থল ধ্বংসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ প্রয়োগ এবং প্রশাসনসহ সব পেশার নাগরিকদের সমন্বয়ে সকল স্তরে সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়েছে। তারা বলছেন, মাঠে ময়দানে লম্বা লম্বা বক্তৃতা না দিয়ে যাদের ভোটে ক্ষমতায় যেতে হয় তাদের রক্ষায় মশা নিধন কার্যক্রমে নিজেদের সর্বাত্মকভাবে নিয়োজিত হতে হবে। সব রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠনসহ সব পেশার মানুষকে মশা নিধনে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার বিকল্প নেই। তারা বলেন, শত্রু যেহেতু চিহ্নিত তাই সদিচ্ছা থাকলে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ।

ইত্তেফাক/এএইচপি