দেশের প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে যুগ যুগ ধরে বাল্যবিবাহের প্রচলন চলে আসছে, জলবায়ু পরিবর্তন এই ধারাকে আরো বেগবান করেছে। শুধু তিন বেলা পেটভরে খাবার পেতে বা মাথা গোঁজার একটি নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যরা সদ্য কৈশোরে পা রাখা মেয়েদের তড়িঘড়ি করে বিয়ে দিয়ে দিতে চাইছেন।
খুলনার কয়রা উপজেলার মদিনাবাদ গ্রামের বাসিন্দা ময়না খাতুন, তার এখনো ২১ পেরোয়নি। ময়নার মা করিমুন্নেসার সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘১৪ বছর বয়সে আমরা ময়নাকে বিয়ে দিয়েছিলাম মোটামুটি অবস্থাসম্পন্ন স্থানীয় একটি পরিবারে। ময়না তার সাত-আট বছর বয়স থেকেই চোখে একটু কম দেখত। বিয়ের আগে ময়নার শ্বশুরবাড়িতে এ কথা আমরা জানাই। তারা কোনো আপত্তি করেনি। মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছিলাম একটু ভালো থাকবে, তিন বেলা খেতে পারবে—এই আশায়, কিন্তু বিয়েটা টিকল না।’
কথা বলতে বলতে তার চোখ ভিজে উঠছিল। তিনি হাতের উলটো পিঠ দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘বিয়ের দেড় বছরের মাথায় ময়না একটি মেয়েশিশুর জন্ম দেয়। কিন্তু ময়নার শ্বশুরবাড়ির লোকজনের মেয়েশিশু পছন্দ নয়। তার ওপর আবার ময়নার দৃষ্টিশক্তি আরো কমে যাচ্ছিল। ওরা নাতনিসহ ময়নাকে আমার কাছে দিয়ে যায়। তারা ওদের রাখল না। এখন আমি কেমন করে এই পেটগুলো পালব! শুরু না হতেই শেষ হয়ে গেল আমার মেয়ের সংসার।’
বারবার ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা ময়নাদের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমির অনেক ক্ষতি করেছে। এ ছাড়া ময়নার বাবার বয়স হয়েছে, তিনি এখন কোনো কাজ করতে পারেন না। ফলে ছোটবেলা থেকেই দারিদ্র্যের কশাঘাতে তাদের জীবন জর্জরিত। পেট চালানোই যেখানে কষ্টের, সেখানে ময়নার কখনো স্কুলেই যাওয়া হয়ে ওঠেনি। উলটো ছোটবেলা থেকেই পরিবারের প্রয়োজনে উপার্জন বাড়াতে কাজ করতে হয়েছে ময়নাকে।
দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত এই এলাকার প্রান্তিক মানুষ। ময়নার মা বলেন, ‘মেয়েটার চোখের চিকিত্সার জন্য তেমন কিছু করতে পারিনি, আমাদের তিন বেলা খাবারই জোটে না, চিকিত্সা করাব কীভাবে? তাই সবকিছু ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়েছি।’
ময়না খুব ভোরে উঠেই মাছ ধরতে চলে যান বাড়ির পাশের কপোতাক্ষ নদে। ময়না জাল টানতে পারলেও পোনা মাছ তিনি দেখতে পান না, তাই তার মাকে সঙ্গে যেতে হয়। মা-মেয়ে মিলে প্রতিদিন এভাবে মাছ ধরে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত আয় করেন, এত অল্প টাকা দিয়ে সংসার চালানো বেশ কঠিন।
ময়না তার এই চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও সারাক্ষণ ভাবেন তার ছোট্ট মেয়ে মীম আক্তারের ভবিষ্যত্ নিয়ে। তিনি চান তার মেয়ে লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে।
তার জীবনে যে ভুল হয়েছে, বাল্যবিবাহের মতো অভিশাপ যেন আর কোনো মেয়ের জীবনে না নেমে আসে। ময়না বলেন, ‘যে ভুল আমার সঙ্গে হয়েছে, তা যেন আর কারো সঙ্গে না হয়। আমি মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে নিজের পায়ে দাঁড় করাব, সে নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেই যেন নিতে পারে। মেয়েটা হবে আমার চোখের আলো।’
ময়না যখন নদীতে জাল টানেন, ছোট্ট মীম প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়ায় নদীর পাড় ঘেঁষে মায়ের সঙ্গে সঙ্গে। ময়না সব সময়ই উদ্বিগ্ন থাকেন মীমের অনিশ্চিত ভবিষ্যত্ নিয়ে।
বাল্যবিবাহ ও শারীরিক অসুস্থতা এই এলাকার কিশোরী মায়েদের জীবনে অভিশাপের মতো।
উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন এবং সর্বস্তরে সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে পারলে হয়তো আর কোনো মেয়ের জীবনে ময়নার মতো অন্ধকার নেমে আসবে না।
