নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেড মঙ্গা জয় করে বদলে দিয়েছে জনপদ। নীলফামারী শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে সংগলশী ইউনিয়নে দেড় দশক আগে যখন উত্তরা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ চালু হয়, তখন এটি ছিল মঙ্গাপীড়িত জনপদ। এখন ১২টি দেশি-বিদেশি কোম্পানি ১৪০টি প্লটে কারখানা স্থাপন করেছে। উত্তরা ইপিজেডে এখন কাজ করছেন ২২ হাজার শ্রমিক।
জেলা সদরের সংগলশী ইউনিয়নে উত্তরা ইপিজেড এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, শ্রমিকেরা সকাল সাড়ে ৬টা থেকে দলে দলে প্রবেশ করছেন কারখানায়। ব্যস্ত শ্রমিকদের পেছনে ফিরে তাকানোর সময় নেই। জেলা সদরের ইটাখোলা ইউনিয়নের হরিবল্লব গ্রামের বেশ কয়েকজন নারী ও পুরুষ ইপিজেডে কাজ করছেন। কারখানা ছুটির দিন ওই গ্রামে গিয়ে কথা হয় বাবুল চন্দ্র রায়ের সঙ্গে। তিনি জানান, আগে তিনি কৃষি শ্রমিক ছিলেন। ইপিজেড হওয়ার আগে ৬০ থেকে ৭০ টাকায় দৈনিক হাজিরা পেতেন। বছরে তিন থেকে চার মাস কাজ জুটতো। বাকি সময় রিকশা চালাতে হতো। নিজের ভিটাটুকুও ছিল না। ইপিজেড হওয়ার পর তার তিন মেয়ে সেখানে কাজ পায়। তারা প্রতিমাসে প্রায় ৩০ হাজার টাকা রোজগার করছে। এখন নিজের একটা ভিটা হয়েছে। তিনটি টিনের চালাঘর দিয়েছেন।
ওই গ্রামের আনোয়ারুল ইসলাম ও তার স্ত্রী পারভীন আকতার এভারগ্রিনে কাজ করেন। দুজনে মিলে আয় করেন মাসে ১৫ হাজার টাকা। আনোয়ারুল বলেন, প্রায় পাঁচ বছর ধরে কারখানায় কাজ করছেন। মোটরসাইকেল কিনেছেন, বাড়ি পাকা করার কাজ শুরু করেছেন।
বিকাল ৪টার দিকে একটি বাইসাইকেলে চেপে ইপিজেডের গেট দিয়ে বের হচ্ছিলেন পরিমল রায় ও তার স্ত্রী লক্ষ্মী রানী রায়। গন্তব্য ১০ কিলোমিটার দূরে কুন্দুপুকুর ইউনিয়নের পূর্ব শালহাটি গ্রাম। পরিমল জানান, স্বামী-স্ত্রী দুজনই এভারগ্রিন কোম্পানিতে কাজ করেন। তিনি প্যাকিংয়ের কাজ করেন। আর স্ত্রী তৈরি করেন পরচুলা। পরিমল আগে বর্গাচাষি ছিলেন। এখন নিজের দুই বিঘা জমি অন্যদের বর্গা দিয়েছেন।
পরচুলা তৈরির কারখানা এভারগ্রিনের উপমহাব্যবস্থাপক জানান, তাদের কারখানার ১৫ হাজার শ্রমিকের ৬৫ শতাংশ নারী। গত বছর পরচুলা রপ্তানি করে কোম্পানি দেড় কোটি মার্কিন ডলার আয় করেছে।
নীলফামারী শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি এস এম সফিকুল আলম বলেন, এক সময় এটি কৃষিনির্ভর এলাকা ছিল। ধানকল ছাড়া কেউ শিল্প-কারখানা দেখেনি। বছরের বেশিরভাগ সময় কৃষি শ্রমিকদের কাজ থাকতো না। আর নারীরা ঘরে বসে দিন কাটাতেন। এখন নারী-পুরুষ সমানভাবে শিল্প-কারখানায় কাজ করছেন। ঐ ইপিজেডকে ঘিরে জেলার আনাচেকানাচেও গড়ে উঠছে রপ্তানিমুখী আরও বহু কারখানা।
উত্তরা ইপিজেডের মহাব্যবস্থাপক মো. জোনাব আলী বলেন, ২০০১ সালে যখন উত্তরা ইপিজেড চালু হয়, তখন এটাকে ঘিরে খুব বেশি আশাবাদ ছিল না। উত্তরা সোয়েটার নামে একটিমাত্র কোম্পানি এখানে কারখানা স্থাপন করেছিল। এখন ১৪০টি প্লটে ১২টি কোম্পানি কারখানা স্থাপন করে রপ্তানিযোগ্য পণ্য উত্পাদন করছে। ১২টি কোম্পানির মধ্যে নয়টি বিদেশি। আরো ৪০টি প্লট প্রস্তুত আছে, যার বেশিরভাগ ইতোমধ্যে বরাদ্দ হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে চালু কোম্পানিগুলোই নতুন প্লটগুলোতে কারখানা সমপ্রসারিত করেছে।
