ইউক্রেনের পরমাণু কেন্দ্র নিয়ে উদ্বেগ কি যথার্থ?

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৩, ১৮:৫৪

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদোমির জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়া তার দেশের দখল করে নেওয়া ভূখণ্ড জাপোরিজ্জিয়ার পরমাণু স্থাপনায় নাশকতা চালাতে পারে। জুন মাসের পর চলতি মাসেও তিনি একই রকম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেন। বলা নিষ্প্রয়োজন যে, কোনো পরমাণু স্থাপনায় বিস্ফোরণ বা বড় কোনো দুর্ঘটনার ফলে পরমাণু বর্জ্য চারপাশে বহুদূর ছড়িয়ে যেতে পারে। 

প্রায় চার দশক আগে ইউক্রেনের (দেশটি তখন সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র ছিল) চেরনোবিলে এ রকম একটি দুর্ঘটনায় তেজস্ক্রিয় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল বিশ্ববাসী। ২০১১ সালে জাপানের ফুকুশিমা পরমাণু স্থাপনাটি সুনামির আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেই আশঙ্কা নতুন করে জেগেছিল। তবে এখন যেহেতু যুদ্ধ চলছে, তাই পরমাণু কেন্দ্র নিয়ে উদ্বেগ হওয়া স্বাভাবিক। প্রশ্ন হলো—মস্কো কি আসলেই সে রকম কিছু করতে চায়, নাকি জেলেনস্কি শুধু শুধু ভীতি ছড়াচ্ছেন?

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাসের মধ্যেই রাশিয়া জাপোরিজ্জিয়া দখল করে নিয়েছিল। সেখানে একটি পরমাণু স্থাপনা আছে, যাতে নাশকতামূলক কাণ্ড ঘটানো হতে পারে বলে দেশ দুইটি তখন থেকেই পরস্পরের প্রতি অভিযোগের তোপ দেগে এসেছিল। রাশিয়া অবশ্য স্থাপনাটির চতুষ্পার্শ্ব সেনাছাউনি বসিয়ে এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এসেছে। কারণ মস্কোর আশঙ্কা আছে, কিয়েভ যে কোনো সময় সেখানে অতর্কিতে হামলা চালিয়ে এর দোষ রুশ বাহিনীর ওপর চাপাতে পারে। 

জেলেনস্কি সম্প্রতি যেসব অভিযোগ করছেন তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, রাশিয়া কয়েকটি পরমাণু রিঅ্যাক্টরের ছাদে বিস্ফোরক জমা করছে বলে তার কাছে খবর রয়েছে। জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষক সংস্থা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি এজেন্সি (আইএইএ) সম্প্রতি পরমাণু স্থাপনাটি পরিদর্শন করেছে। পরিদর্শন শেষে ১২ জুলাই দেওয়া তাদের প্রতিবেদনে অবশ্য নাশকতামূলক কাণ্ড ঘটানোর কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে। তবে তারা এ কথাও জানিয়েছে যে, ঐ দুটো রিঅ্যাক্টরের ছাদে তাদের যেতে দেওয়া হয়নি। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে কেউ কেউ এমন প্রচারণা চালাচ্ছে যে, মস্কোকে আলোচনার টেবিলে আনতে বাধ্য করার জন্য জেলেনস্কি এমন হুঁশিয়ারি দিয়ে বেড়াচ্ছেন।

অভিযোগ রয়েছে রাশিয়া দুই মাস আগে বোমা মেরে ইউক্রেনের একটি বাঁধ ভেঙে দিয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় নোভা খাকোখভা জলাধারের জন্য বাঁধটি প্রয়োজন ছিল। ঐ ঘটনায় একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এসবের সহায়তায় ঐ পরমাণু স্থাপনায় পানি সরবরাহ করা হতো। যেকোনো পরমাণু স্থাপনার জন্যই নিয়মিত পর্যাপ্ত পানির জোগান একটি অত্যাবশ্যকীয় শর্ত। 

আইএইএ জানিয়েছে, পরমাণু স্থাপনার পানি সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা আছে। যেমন সেখানে অনেকগুলো কূপ খনন করা হয়েছে। এ থেকে কয়েক মাসের পানির চাহিদা পূরণ করা যাবে। ইউক্রেনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলেছেন, তারা সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় রেখে কাছাকাছি অঞ্চলে হাসপাতাল প্রস্তুত রেখেছেন। যেন তেজস্ক্রিয়তার ঘটনা ঘটামাত্র সাধারণ নাগরিকদের সেখানে ভর্তি করা যায়। আমেরিকান নিউক্লিয়ার সোসাইটি (এএনএস) একটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পরমাণু গবেষণা সংস্থা। তারাও মনে করে না যে, ওই পরমাণু কেন্দ্রে নাশকতার হুমকি রয়েছে। কেন্দ্রটির বেশির ভাগ রিঅ্যাক্টরই মাসের পর মাস ধরে কোল্ড শাটডাউন অবস্থায় রাখা আছে। এই পর্যায়ে থাকলে দুর্ঘটনা ঘটলেও তেজস্ক্রিয়তার আশঙ্কা থাকে না।

তবে অন্য অনেক বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে বলেছেন, তেজস্ক্রিয়তা ঘটানোর অনেক পদ্ধতি আছে। রাশিয়া যদি চায়, তাহলে যে কোনো উপায়ে তারা সেটা করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা সংস্থা ইউনিয়ন অব কনসার্ড সায়েন্টিস্টের ডিরেক্টর এডুইন লিম্যান বলেন, ইউক্রেনের জনগণের ক্ষতি করার চেষ্টা করলে রুশরা সেটা অনেকভাবেই করতে পারে। তিনি বলেন, পরমাণু স্থাপনা একটি বিশাল বিষয়। অনেকগুলো উপাদান এর সঙ্গে জড়িত। কেবল রিঅ্যাক্টরের কুলিং সিস্টেমই নিরাপত্তার একমাত্র রক্ষাকবচ নয়।

জাপোরিজ্জিয়ার ছয়টি রিঅ্যাক্টরের মধ্যে পাঁচটি ১০ মাস ধরে কোল্ড শাটডাউন অবস্থায় আছে। এর অর্থ পরমাণু শক্তি উৎপাদনের জন্য যে চেইন রিঅ্যাকশন প্রয়োজন সেটি বন্ধ আছে। রিঅ্যাক্টরগুলোর তাপমাত্রা বয়েলিং পয়েন্টের নিচে। কেবল একটি হট শাটডাউন মোডে আছে। স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে স্টিম প্রয়োজন, তা উৎপাদনের সেটাকে ঐ মোডে রাখা হয়েছে। এ থেকে বিপদের ঝুঁকি খুবই কম। বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে কোল্ড শাটডাউনে থাকা রিঅ্যাক্টরগুলো নিয়ে সমস্যা হবে না, তবে হট শাটডাউনে থাকা রিঅ্যাক্টরটি নিয়ে অপারেটরদের কিছুটা বেগ পেতে হবে। হট শাটডাউন মানে এর তাপমাত্রা বয়েলিং পয়েন্টের ওপর রয়েছে। যে কোনো দুর্ঘটনায় তেজষ্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরমাণু কেন্দ্র নিয়ে দুশ্চিন্তার তেমন কিছু নাই বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। যদিও নাশকতা হতে পারে বলে দুই দেশ একে অন্যের দিকে অভিযোগের তির ছুড়ছে। যুদ্ধ শুরুর পর এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যে কারণে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়াও যাচ্ছে না যে দুর্ঘটনা আসলেই ঘটবে। যেমন অতি সম্প্রতি রাশিয়া কৃষ্ণসাগরের অবরোধ আরোপ করেছে। এটা শস্যবাহী জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত করবে। রাশিয়ার এমন কিছু কর্মকাণ্ড হিসাবে নিলে জেলেনস্কির অভিযোগ একেবারে ফেলে দেওয়া কঠিন।

ইত্তেফাক/এএইচপি