অপরূপ সৌন্দর্যের মায়াবী বিছনাকান্দি 

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৩, ১৮:১৮

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মহারানি সিলেট জেলার বিছনাকান্দি ভ্রমণের বাসনায় রাত দুপুরেই ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিই। সকালের মধ্যেই পেয়ে যাই তুমুল সাড়া। হঠাত্ পরিকল্পনা তাই বাস বা রেল টিকেটের স্বল্পতা। ইচ্ছে থাকলেও বাহিনী বড় করা গেল না। অতঃপর ‘দে-ছুট’ ভ্রমণ সংঘের সুপার অ্যাক্টিভদের নিয়ে রাতের বাসে বৈশাখী মাতাল হাওয়ায় দুলে যান্ত্রিক শহর রাজধানী ছেড়ে ভেগে যাই। 

শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক মাহ্বুব খন্দকার সাহায্যের হাত প্রসারিত করে সিলেটের সাংবাদিক নোভেল সাহেবকে অনুরোধ করেছেন আমাদের স্বাচ্ছন্দ্যময় বিছনাকান্দি ভ্রমণের সকল আয়োজন করে রাখার। প্রাণবন্ত নোভেল সাহেবও আন্তরিকতার দিক থেকে কম নন, সিলেটের পথে কখন কোথায় কেমন আছি কল দিয়ে কয়েক দফা জেনে নিয়েছেন। ফোনে জানিয়ে দিয়েছেন যিনি আমাদের রিসিভ করবেন সেই ভদ্রলোকের নাম।  সকালে গিয়ে পৌঁছাই লন্ডনি শহরের হুমায়ুন চত্বর। কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসেন গোয়াইন ঘাট উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আ. মতিন সাহেব। একগাল হেসে পরিচয় পর্ব শেষে ছুটি তার সঙ্গে। সিএনজি তার ধারণ ক্ষমতার চাইতে একজন বেশি নিয়ে চলছে ভোঁ ভোঁ শব্দ তুলে। সালুটিকর বাজারে এসে নাস্তার জন্য খানিকটা বিরতি। গাড়িতে আমাদের বসার কষ্ট অনুভব করতে পেরে কৌশলে আ. মতিন ভাই সালুটিকর হতে বিদায় নিলেন। তবে সঙ্গে দিলেন একজন দক্ষ ভদ্র সিএনজি চালকের গাড়ি।

বিছনাকান্দি যেতে সরু রাস্তার দু-পাশের গগনচুম্বী বৃক্ষ, ছায়াঘেরা নিরিবিলি পরিবেশ, বিস্তৃত ফসলের মাঠ অতিক্রম করে সিএনজি ছুটে চলছে। বিছনাকান্দির পথ যেন আমাদের জাতীয় সংগীত কবি গুরু রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা/আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানের প্রতিফলন। রাত জাগা দামাল দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের বন্ধুরা যাচ্ছি আর থামছি, সাথে চলছে ক্যামেরার অসংখ্য ক্লিক। পুরোনো দিনের হারিয়ে যাওয়া অনেক গান গাইতে গাইতে হাদারপার বাজার পৌঁছাই। বাজারের টি স্টলে সিলেটি চা পান করে দ্রুত খেয়া ঘাটে যাই;  কিন্তু পিয়ান নদীতে পানি কম থাকায়, হাঁটা ছাড়া উপায় নেই। অবশ্য চালক সোহেলের বুদ্ধিমত্তায় আরও একটি সিএনজি ভাড়া নিলাম।

এবড়ো থেবড়ো জমিনের উপর দিয়ে গাড়ি চলল। ধীরে ধীরে আমরা মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে বিছনাকান্দির জলপাথরের বিছানার দিকে এগিয়ে যাই। আর আফসোস করি ওই সবুজে মোড়ানো সারিবদ্ধ পাহাড়গুলো কেন এ দেশের হলো না? পাথরের ভাগার পিয়াইন নদীর তীরে সিএনজি থামে। আমরা অবাক বিস্ময়ে বিছনাকান্দির রূপ দেখি, কখনও হাঁটু কখনও কোমর পর্যন্ত পানিতে নদী পারি দিয়ে এগিয়ে যাই প্রায় নোম্যানস ল্যান্ডের দিকে। বিজিপি এসে সতর্ক করলেন। তাই থেমে যাই। এবার জলকেলিতে মেতে উঠি। চরম গরমে বিছনাকান্দির পানিতে পরম আনন্দে হৈহুল্লোড় করে আমাদের সাথে অন্যদেরও জমিয়ে ফেলি। একসময় স্থানীয়রা সীমান্তের ওপারের বাজারে চা পান করতে নিয়ে যেতে চায়, আমরা বারণ করি। ভ্রমণের ষোলোকলা পূর্ণ করি আমাদেরই ভূখণ্ডে। তবে কেন যেন সীমান্ত নিয়ে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানির উক্তি বারবার মনে পড়ছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘আসাম আমার, পশ্চিমবঙ্গ আমার ত্রিপুরাও আমার।’ তবে কেন আমাদের হলো না? কী কারণে হলো না—জানি না! তবে আমাদের বিছনাকান্দিতে রয়েছে ছোট-বড় অগণিত পাথরের সমারোহ। চার পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে লাখো-কোটি পাথর, দেখে যেন মনে হয় পুরো এলাকাটাই পাথরের বিছানা। উত্তর পাশটা আরও চমত্কার মায়াবী প্রকৃতি দিয়ে ঘেরা।

এখানটায় মেঘালয় পাহাড়, ঢলের সাথে নেমে আসা পাথর আর পিয়াইন নদীর নীলাভ জলের মিতালি—বিছনাকান্দির প্রান্তরে আসা ভ্রমণ পিপাসুদের মনে এক অন্যরকম অনুভূতি দোলা দিয়ে যাবে। স্বচ্ছ শীতল পানির তলদেশে পাথরের পাশাপাশি নিজের শরীরের লোমও দেখা যাবে স্পষ্ট। টলটলে পানিতে অর্ধ ডুবন্ত পাথরে মাথা রেখে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যেতে মন চাইবে। বিছনাকান্দির সৌন্দর্য অসাধারণ। প্রকৃতির আপন লীলাখেলায় মেতে আছে অপার সৌন্দর্যের জলপাথরের ভূমি বিছনাকান্দি! দৃষ্টির শেষ সীমানা পর্যন্ত শুধু পাথর আর পাহাড়। মন চায় না পানি থেকে উঠি তবু যেতে হবে আপন নীড়ে। যখন ফিরি তখন মনে হয় পিছন থেকে ভারত সীমান্তের দিগন্ত ছোঁয়া মেঘালয় পাহাড় ‘দে-ছুট’ বলে ডেকে উঠে। তখন আবেগে বলে উঠি এত কাছে থেকেও তুমি কেন এত দূরে?   

যোগাযোগ
দিনে রাতে ঢাকার সায়েদাবাদ ও ফকিরাপুল এবং গাবতলী থেকে বিভিন্ন পরিবহনের এসি/নন-এসি বাস সিলেটের পথে চলাচল করে। ভাড়া ইস্কানিয়া গাড়িতে ৭০০ থেকে ১,৫০০ টাকা। রাত যাপনের জন্য দরগা রোডে বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল রয়েছে। রুম ভাড়া ৬০০ থেকে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত। আম্বরখানা বা হুমায়ুন চত্বর হতে সিএনজি বা মাইক্রো ভাড়া সারা দিনের জন্য ২,৫০০ থেকে ৫,০০০ টাকা। যারা অতি ব্যস্ত তারা আগের দিন রাতে সিলেট গিয়ে সারাদিন ঘুরে আবার রাতের বাসে ফিরতে পারেন। ভ্রমণপ্রেমী বন্ধুরা আর দেরি কেন— চলে যান অপরূপ সৌন্দর্যের মায়াবী বিছনাকান্দি।

ইত্তেফাক/আরএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন