চয়ন

আমার কিছু কথা

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:০৫

 

আমাদের সময় কেজি ক্লাস ছিল না। তার বদলে ইনফ্যান্ট ক্লাস ছিল। ১৯৩০ সালে মডেল স্কুলের ইনফ্যান্ট ক্লাস থেকেই আমার বিদ্যাশিক্ষার শুরু। মডেল স্কুলেরও ইতিহাস আছে, ব্রিটিশ আমলে ইংরেজি কায়দায় মডেল স্কুল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এই স্কুলে পড়াশোনার সঙ্গে ছবি আঁকা ও মডেলিং ক্লাসের সুব্যবস্থা ছিল। ড্রইং মাস্টার ছিলেন শ্রীসতীশবাবু। আমি যেন হাতে চাঁদ পেলাম। আমার চিত্রকলার প্রথম শিক্ষক ছিলেন সতীশবাবু। কলকাতায় জনতলা এলাকায় ইউরোপিয়ান এসাইলাম লেনে এক বিরাট জমিদারবাড়িতে এ স্কুলটি ছিল। পুরোনো স্থাপত্যের নিদর্শন নিয়ে সেই সাতমহলা বাড়িটি ছিল আমাদের প্রাণকেন্দ্র। অত বড় বাড়ি হওয়ার কারণে আমাদের মডেল স্কুলের সঙ্গেই ছিল নর্মাল ট্রেনিং স্কুল। গ্রামের স্কুলের শিক্ষকেরা আসতেন সেখানে বিশেষ ট্রেনিং কোর্স করতে। নর্মাল স্কুলেরও একজন ড্রইং মাস্টার ছিলেন। তাঁর নাম ছিল দ্বারিকবাবু। সতীশবাবুর অনুপস্থিতিতে দ্বারিকবাবু আমাদের ড্রইং ক্লাস নিতেন, কিন্তু তিনি ছিলেন খুব গম্ভীর প্রকৃতির রাশভারী মানুষ। সতীশবাবু ছিলেন ঠিক বিপরীত। আমাদের ড্রইং শেষ হলেই তিনি নানা রকম গল্প বলে শোনাতেন। স্বাভাবিকভাবেই আমি তাঁর অতি প্রিয় ছাত্র হিসেবে তাঁর হূদয়ের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম। নর্মাল ট্রেনিং স্কুলেও ড্রইং ও মডেলিং অবশ্য শিক্ষণীয় ছিল। নর্মাল স্কুলের স্যাররা মডেলিং করতেন মাটি দিয়ে। সেই আমলেই তাঁদের জন্য কৃষ্ণনগর থেকে মাটি নিয়ে আসা হতো গাড়িবোঝাই করে। আর আমরা মডেল স্কুলের ছাত্ররা তখনই প্লাস্টিসিন ব্যবহার করতে শিখেছিলাম। আজকের মতো ফ্যাক্টরিতে তৈরি প্লাস্টিসিন পাওয়া যেত না। সতীশবাবুই আমাদের ফর্মুলা শিখিয়ে দিয়েছিলেন। তা হলো খড়িমাটি, মৌচাকের মোম, নারিকেল তেল, ভেসলিন ও রং। কোনটার পরিমাণ কত আমাদের জানিয়ে দিয়ে বলতেন, ‘বাড়ি থেকে বানিয়ে নিয়ে আসবি।’ অকপটে স্বীকার করছি, ‘প্লাস্টিসিন’ নামটি জেনেছি ইদানীংকালে। তাই আমরা তখন সোজাসুজি মাকে বলতাম, ‘মা আমার মডেলিং বানিয়ে দিতে হবে।’ বই-খাতার সঙ্গে থাকত একটি টিনের সিগারেটের কৌটা। বই-খাতার সঙ্গে ওই সিগারেটের কৌটাগুলো কেবল আমাদের মডেলিং বহন করার কাজেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং মডেল স্কুলের ছাত্রদের প্রতীক হিসেবে কাজ করত, অর্থাত্ বই-খাতার সঙ্গে ওই কৌটা দেখলেই পাড়াপড়শি বুঝত যে আমরা মডেল স্কুলের ছাত্র।         (অংশ)

শিল্পীর ‘বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলন ও আমার কথা’ বই থেকে (সংগ্রহ ও সম্পাদনা/সৈয়দ আজিজুল হক, প্রথমা প্রকাশন, ২০১০)