শিশু সহায়তায় হটলাইন

বছরে আড়াই লাখ ফোনকলে ২০০ রকম সহায়তার আকুতি

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২৩, ২৩:৫৩

৯ বছরের ফাহিম নেত্রকোনা থেকে শিশু সহায়তা হটলাইনের ১০৯৮ নম্বরে ফোন করে জানায় যে, তার মন ভালো নেই। বাবা-মা তাকে কেবলই পড়ার কথা বলেন, কিন্তু তার পড়তে নয়, সারাক্ষণ খেলতে মন চায়। যাত্রাবাড়ীর ১৫ বছরের এক কিশোর তার ১৪ বছরের প্রেমিকাকে বিয়ে করতে বাবা-মাকে চাপ দিচ্ছে। বাবা ছেলেকে এই বয়সে বিয়ে করাতে চান না। ছেলে গিয়ে উঠেছে তার প্রেমিকার বাড়িতে, উপায় না দেখে বাবা ফোন দিয়েছেন। এমন ১৯৮টি কারণে শিশুর জন্য সহায়তা চেয়ে প্রতিদিন ৯০০ থেকে ১২০০ ফোন কল আসে ঐ টোল ফ্রি নম্বরে। গত এক বছরে  মোট ২ লাখ ৫২ হাজার ৮২১টি সহায়তা চেয়ে কল আসে।

কর্তৃপক্ষ জানায়, এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হওয়ার পর বেশকিছু আত্মহত্যা সম্পর্কিত ফোন আসে। প্রেমের সম্পর্কে ঘনিষ্ঠ হওয়ার ছবি ফেসবুকে প্রকাশ, বাল্যবিবাহ, বাবা-মা ও শিক্ষকের নির্যাতনসহ নানা বিষয়ে ফোনকলের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। শিশুদের এমন সব পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করে মূলধারায় ফিরিয়ে আনার কাজ করছে ১০৯৮। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মনে করছে, পারিবারিক আদর্শ ও প্রাতিষ্ঠানিক সঠিক শিক্ষার অভাবে কোমলমতি শিশুরা নানাভাবে বিপদগ্রস্ত হচ্ছে।

কী কারণে ফোন :এসএসসি পরীক্ষার পর বাবা-মা তার মেয়েকে বিয়ে দিতে চায়। কিন্তু মেয়ে চায় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে। এ পরিস্থিতিতে মিরপুর থেকে বিয়ে বন্ধের জন্য ফোন করে নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক মা কাজ করেন ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায়। মেয়ের এসএসসির ফল ভালো হয়নি বলে সে আত্মহত্যা করতে চায়—এ অবস্থায় চাঁপাইনবাবগঞ্জে মেয়েকে বাঁচাতে ঢাকা থেকে ফোন দেন মা। মা-বাবার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে। তিন সন্তান থাকে বাবার কাছে। মা চিন্তিত বাবা তার সন্তানদের নিরাপদে রাখতে পারছেন না। বনশ্রী থেকে তিনি ফোন দেন শিশু সহায়তা হটলাইনে। নিজে দুষ্টুচক্রের ফাঁদে পড়ে এখন অন্যদের অনলাইনে ফাঁদে ফেলছে চকরিয়ার ১৭ বছরের যুবক। তার হাত থেকে রক্ষা পেতে ১৬ বছরের এক কিশোরী ফোন করেছে। স্কুলের ফি না দিতে পেরে, দুধ কেনার সহায়তার জন্য মিরপুর বেড়িবাঁধ থেকে ফোন দেন এক বাবা। ফোনকল গ্রহণ করেন কল এজেন্ট নাজনিন আফরোজ। গত ১ আগস্ট সমাজসেবা অধিদপ্তরে গিয়ে জানা যায়, ঐ দিন তিনি বিকাল ৫টা পর্যন্ত ৩০টি কল গ্রহণ করেন। প্রতিদিনই আট থেকে ১০টি ফোন আসে শিশুদের মন ভালো নেই বলে। মেয়েদের ঋতুস্রাব চলাকালে সমস্যা এবং ছেলেদের বয়ঃসন্ধিকালীন টানাপড়েন নিয়ে ফোন পান তারা। এখানে তারা একসঙ্গে ১৫ জন ফোনকল গ্রহণ করেন। তিন শিফটে কাজ করছেন ২৭ জন। তাদের মধ্যে আছেন পেশাগত কাউন্সিলরও। তারা প্রয়োজন অনুযায়ী শিশুদের কাউন্সেলিং করেন। কে ফোন করছে তার পরিচয় কারো কাছে প্রকাশ না করার ভিত্তিতে তারা কাজ করেন এবং সে (কলকারী) যা চায়, তাই ঠিক এই ভিত্তিতে তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে তাকে বিপদ থেকে ফিরিয়ে আনা হয়।

কীভাবে কাজ করছে ১০৯৮ :ইউনিসেফের সহায়তায় সমাজসেবা অধিদপ্তর বাস্তবায়ন করছে ‘চাইল্ড সেনসিটিভ সোশ্যাল প্রটেকশন ইন বাংলাদেশ (সিএসপিবি) প্রকল্প। বর্তমানে এর দ্বিতীয় ফেজ চলছে। ২০২২ সালের জুলাই মাস থেকে ২০২৩ সালের জুন মাস পর্যন্ত ১০৯৮-এ মোট ২ লাখ ৫২ হাজার ৮২১টি সহায়তা চেয়ে কল আসে। তার মধ্যে বাল্যবিয়ে সংক্রান্ত ৬৯৮টি। ১০৯৮-এর কাউন্সিলর মো. তবিউর রহমান বলেন, বর্তমানে গ্রামের দরিদ্র বাবা-মা যেমন সন্তানের বাল্যবিয়ে দেন, তেমনি শহর ও গ্রামের ১৪ থেকে ১৬/১৭ বছরের ছেলেমেয়েরা নিজেরাই বিয়ে করতে বাবা-মাকে চাপ দেন। অনেক সময় তারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়, বিপদে পড়ে। আমরা তাদের কাউন্সেলিং করে ফিরিয়ে আনি। ১০৯৮-এর ব্যবস্থাপক চৌধুরী মো. মোহাইমেন বলেন, ‘আমাদের চারপাশের পরিবেশটা অনেক কারণে বদলে গেছে। এই পরিবেশের মধ্যে শিশুরা পরিবারে আদর্শ খুঁজে পায় না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই সঠিক শিক্ষার পরিবেশ। শিশুরা শৈশবটা সঠিকভাবে পাচ্ছে না। বাড়িতে বাবা-মা ছাড়া দাদা-দাদি, মামা-ফুপুর মতো আত্মীয়দের পায় না। ফলে কোনো অপরাধ করলে, বাবা-মা বকা দিলে সে কারো আশ্রয়ও পায় না, বড় নিঃসঙ্গ বোধ করে, আত্মহত্যা করে। তাই শিশুদের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি না করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

ইত্তেফাক/এএইচপি