রাতভর টানা ভারী বৃষ্টিপাতে গতকাল শুক্রবার চট্টগ্রাম মহানগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। ঘরবাড়ি, দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ে। শুক্রবার সকাল ১০টা অবধি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় নগরীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকার মানুষ অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর বহদ্দারহাটস্থ বাসভবনও হাঁটুসমান পানির নিচে তলিয়ে যায়। পানিবন্দি হওয়ায় মেয়র সকালে বাসা থেকে বের হতে পারেননি বলে জানিয়েছেন চসিক কর্মকর্তারা। সকাল ১০টার পর থেকে পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করে।
বৃষ্টির কারণে সকাল পৌনে ৯টার দিকে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ লালখান বাজার ও টাইগারপাস সড়কের মধ্যবর্তী অংশে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কেউ হতাহত না হলেও মাটি চাপায় আটকে পড়ে চালকসহ একটি প্রাইভেট জিপ। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা চালকসহ গাড়িটি উদ্ধার করে মাটি অপসারণ করলে যানবাহন চলাচল দুপুর নাগাদ শুরু হয়ে যায়। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস থেকে আবহাওয়া কর্মকর্তা সুমন সাহা ইত্তেফাককে বলেন, গতকাল বিকাল ৩টা পর্যন্ত পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসে সাগরপাড়ের বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৪২ দশমিক ৮ মিলিমিটার। নগরীর আমবাগান আবহাওয়া অফিসে একই সময়ে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ১২৫ মিলিমিটার। ফলে নগরীতে প্লাবন ও জলাবদ্ধতা হয়েছে। মৌসুমি বায়ু খুবই সক্রিয়। কাজেই মাঝারি ধরনের ভারী বৃষ্টিপাত এ মাসের সামনের দিনগুলোতে আরো হবে। এতে পাহাড়ধসেরও আশঙ্কা রয়েছে।
এই জলাবদ্ধতার জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন আবারও দায়ী করেছে নগরীতে জলাবদ্ধতা নিরসন ও খাল-নালা প্রকল্পের দায়িত্ব পালনকারী চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এবং তাদের কাছ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে।
চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা আবুল হাশেম সকালে জানান, সিটি মেয়রের বাসায় পানি উঠে গেছে। পানি নামার পর সেখানে কাদামাটি, আবর্জনা অপসারণের কাজ চলছিল। চসিক কর্মকর্তারা জানান, রাতের টানা বৃষ্টিতে নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকায় অস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়, প্লাবিত হয় রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, দোকানপাট। তারা বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় চাক্তাই খালের মাটি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) পুরোপুরি অপসারণ না করায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নগরীর এক-তৃতীয়াংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, টানা বৃষ্টিতে চকবাজার ও রিয়াজউদ্দিন বাজারের দোকানপাট পানিতে তলিয়ে যায়। এছাড়া চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারের ভোগ্যপণ্যের দোকান-আড়তেও পানি ঢুকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ।
স্থানীয় জনসাধারণ ও ওয়ার্ড কাউন্সিলররা জানান, বৃষ্টিতে নগরীর, কাপাসগোলা, চকবাজার, বাকলিয়ার বগারবিলসহ বিভিন্ন এলাকা, বহদ্দারহাট, বাদুরতলা, শুলকবহর, মোহাম্মদপুর, ফিরিঙ্গিবাজারের একাংশ, কাতালগঞ্জ, শান্তিবাগ আবাসিক এলাকা, কে বি আমান আলী রোড, চান্দগাঁওয়ের শমসের পাড়া, ফরিদার পাড়া, হামিদচর, পাঠাইন্যাগোদা, মুন্সীপুকুর পাড়, আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা, মিস্ত্রিপাড়া, রাঙ্গিপাড়া, তিন পুলের মাথা, রিয়াজউদ্দিন বাজার, মুরাদপুর, হালিশহর, নাসিরাবাদসহ আরো অনেক এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়।
২০১৭ সালের আগস্টে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা আর্থিক বরাদ্দে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেয় একনেক। ২০২২ সালে এর ব্যয় বাড়িয়ে ৯ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা করা হয়। সম্প্রতি প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা জানিয়েছিল, তাদের প্রকল্পের প্রায় ৭৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সিডিএর কর্মকর্তারা এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা গতকাল পরিস্থিতি সম্পর্কে কথা বলতে টেলিফোনে সাড়া দেননি। ইতিপূর্বে অবশ্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, নগরীর খাল, নালা-নর্দমাতে বিরামহীন দৈনন্দিন বর্জ্য আবর্জনা ফেলা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চসিকের ব্যর্থতার কারণেই বৃষ্টির পানি নালা-খাল দিয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে সরতে পারছে না।
বান্দরবানে পাহাড়ধসে রাস্তা বন্ধ
বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, সেখানে গত দুই দিন ধরে টানা বৃষ্টির কারণে গতকাল সকালে বান্দরবান-থানচি সড়কে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। সড়কে বিশাল আকৃতির পাথর পড়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয়দের বরাত দিয়ে থানচি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ আবুল মনসুর জানান, নীলগিরি-জীবননগরের মাঝামাঝি এলাকায় পাহাড়ধসে রাস্তার ওপর অনেক বড় বড় পাথর এসে পড়ে । এতে সকাল থেকেই থানচির সঙ্গে বান্দরবানের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তবে সকাল থেকে থানচি থেকে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল সড়ক থেকে পাথর অপসারণের কাজ শুরু করে। কিন্তু এত বড় পাথর সরানোর যন্ত্রপাতি না থাকায় থানচি ফায়ার সার্ভিস ব্যর্থ হলে দুপুরের দিকে সেনাবাহিনীর ১৬ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ঘটনাস্থলে গিয়ে পাথর সরানোর কাজ শুরু করে।

