তিনি স্মরণীয় হইয়া থাকিবেন

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:০৮

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট সিনিয়র জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ৯৪ বত্সর বয়সে পরলোকগমন করিয়াছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরিয়া পারকিনসন্স রোগে ভুগিতেছিলেন। তিনি ১৯৮৯ হইতে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত আমেরিকার ৪১তম প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁহার শাসনামলের সবচাইতে বড় কৃতিত্ব হইল—তাঁহার সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ুযুদ্ধের অবসান হয়। বার্লিন ওয়ালের পতনের মাধ্যমে দুই জার্মানি একীভূত হয়। তাঁহার মৃত্যুতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শোক প্রকাশ করিয়া বলিয়াছেন, ‘দেশসেবার পাশাপাশি পরিবারের প্রতি তাহার ভক্তির জন্যও আমরা তাহাকে স্মরণ করিব।’ সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা অভিবাসীদের প্রতি তাঁহার অঙ্গীকার, পারমাণবিক অস্ত্র হ্রাস ও পূর্ব ইউরোপে গণতান্ত্রিক অভ্যুত্থানে তাঁহার অনন্য ভূমিকার কথা শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করেন।

সিনিয়র জর্জ বুশ ১৯২৪ সালের ১২ জুন ম্যাসাচুসেটসে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন এক ধনাঢ্য ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। তাঁহার বাবা প্রেসকট বুশ ছিলেন ওয়াল স্ট্রিটের একজন ব্যাঙ্কার ও কানেকটিকাটের সিনেটর। পার্ল হারবারে জাপানের হামলার পর সিনিয়র বুশ ১৮ বছর বয়সে নৌবাহিনীতে একজন পাইলট হিসাবে যোগদান করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তিনি বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি যখন ইয়েল ইউনির্ভাসিটিতে পড়িতেন, তখন ছিলেন একজন সফল অ্যাথলেট। এক পর্যায়ে তিনি তৈলের ব্যবসা করিয়া মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার আয় করেন। ১৯৬৬ সালে টেক্সাসের ভোটাররা তাঁহাকে হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভে সদস্য হিসাবে নির্বাচিত করেন। তাঁহার পাঁচ বত্সর পর প্রেসিডেন্ট নিক্সন তাঁহাকে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসাবে নিয়োগ দেন। ১৯৭৩ সালে যখন ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি লইয়া হইচই চলিতেছিল, তখন তিনি এক কঠিন সময়ে রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব লাভ করেন। প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড তাঁহাকে চীনে রাষ্ট্রদূত হিসাবে প্রেরণ করেন। ইহার পর ১৯৭৬ সালে তিনি সিআইএ’র ডিরেক্টর হন।

ইহার পরের কাহিনি অনেকেরই জানা। ১৯৮০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করিয়া যখন রোনাল্ড রিগ্যান প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তখন তিনি তাঁহার আমলে দুই মেয়াদে ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি জয়লাভ করিয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তাঁহার আমলে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে বুদ্ধিমত্তা ও সূক্ষ্ম বিচারশক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নেতৃত্বপ্রদানেও সফল হন। তিনি ১৯৯০ সালে কুয়েত দখলকারী ইরাককে প্রতিরোধ করিতে চার লক্ষ মার্কিন সৈন্য প্রেরণ করেন মধ্যপ্রাচ্যে। যুদ্ধে ইরাকি সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হইয়া গেলেও তিনি সাদ্দাম হোসেনের পতনের লক্ষ্যে বাগদাদ দখল করেন নাই। তাঁহার ছেলে জুনিয়র বুশ পরবর্তীকালে ইরাক আক্রমণ করিয়া সাদ্দাম হোসেনের পতন ঘটান। তাঁহার আমলে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যাপক কূটনৈতিক তত্পরতা লক্ষ করা যায়— যাহা পরে বিল ক্লিনটন আমলে ওসলো চুক্তিতে উপনীত হইতে সহায়তা করে।

আমরা জর্জ বুশের মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত। তাঁহার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা। যুদ্ধ ও শান্তিতে তাঁহার নিজ জাতির মূল্যবোধ রক্ষা ও প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি স্মরণীয় হইয়া থাকিবেন।