স্কুলের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা অনেক ক্ষেত্রেই পিঁপড়ার মতো হইয়া যায়। পিঁপড়া যেমন তাহার ওজনের তুলনায় অধিক ভার বহন করে, তেমনি স্কুল শিক্ষার্থীদেরও তাহাদের শারীরিক সামর্থ্যের তুলনায় অধিক ভারী স্কুলব্যাগ বহন করিতে হয়। কিন্তু ইহা যে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে—এই সচেতনতা এখনো অনেক স্কুলের কর্তৃপক্ষের মধ্যে গড়িয়া ওঠে নাই। মহামান্য হাইকোর্ট ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে কোমলমতি শিশুদের দিয়া বেশি ওজনের স্কুলব্যাগ বহন করাইবার বিষয়ে রুল জারি করিয়াছেন। ওই রুলে শিশুদের শরীরের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি স্কুলব্যাগের ওজন নিষিদ্ধ ও প্রি-প্রাইমারি শিশুদের স্কুলব্যাগ বহন না করিবার কথা বলা আছে। কিন্তু নানা ধরনের সিলেবাসের কারণে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীকে বাধ্য হইয়া ভারী ব্যাগ বহন করিতে হইতেছে। আবার অনেক সময় শিক্ষার্থীরা স্কুলের রুটিন অনুসরণ না করিয়া বরং সকল বইপত্র ব্যাগে করিয়া লইয়া আসে। তাহা ছাড়া শিক্ষার্থীদের ব্যবহূত ব্যাগ হইতে সকল কিছু বাহির করিবার পর শুধু ব্যাগেরই ওজন দাঁড়াইয়া থাকে দুই হইতে চার কেজি।
ওজন যেইভাবেই বেশি হউক না কেন, ভারী স্কুলব্যাগ যে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের ভয়ানক ক্ষতি করিতেছে—ইহা লইয়া কাহারো দ্বিমত নাই। বিশেষজ্ঞরা বলেন যে, ভারী ব্যাগ বহনের কারণে অল্প বয়সেই তাহারা বিবিধ রোগের শিকার হইতেছে। বয়ঃসন্ধিকালে হাড়ের কাঠামো ঠিক হয়, এই সময় বেশি ওজন বহন করিলে সেই কাঠামোতে ত্রুটি দেখা দিতে পারে। ভারতে সমপ্রতি এই বিষয়ে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের হইয়াছিল। গত সপ্তাহে ভারতের মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক একটি নির্দেশনা জারি করিয়াছে যে, শিশুশ্রেণি হইতে দ্বিতীয় শ্রেণি অবধি শিশুদের পড়াশোনা স্কুলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখিতে হইবে। প্রাথমিক পর্যায়ের বিভিন্ন ধাপে শিশু ও বালক-বালিকাদের ব্যাগের সর্বাধিক ওজনও নির্দিষ্ট করিয়া দিয়াছে তাহারা। নির্দেশিকায় বলা হইয়াছে, স্কুলের ব্যাগের ওজন রাখা হইয়াছে এইরকম: প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে সর্বোচ্চ দেড় কেজি, তৃতীয় হইতে পঞ্চম শ্রেণি অবধি ২ হইতে ৩ কেজি, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির জন্য ৪ কেজির মধ্যে, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে সাড়ে ৪ কেজি এবং দশম শ্রেণির জন্য ৫ কেজির ঊর্ধ্বে রাখিতে হইবে।
রবীন্দ্রনাথ তাহার ‘তোতাকাহিনী’তে দেখাইয়াছেন একটি মূর্খ তোতাকে শিক্ষিত করিতে পণ্ডিতরা তাহার পেটের মধ্যে কীভাবে শাস্ত্রপুঁথি ভরিয়া দিল। অতঃপর অক্কা পাইল সেই নিরীহ তোতাটি। আমাদের দেশের কোমলমতি শিশুদের দশা যেন তোতার মতো না হয়, প্রকৃত শিক্ষাগ্রহণের বিপরীতে শিক্ষার আড়ম্বরে যেন আটকাইয়া যায় না তাহাদের দুরন্ত সুন্দর শৈশব—সেই দিকে নজর দিতে হইবে।
