বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের বক্তব্য পাঠ করতে আমার খুব মজা লাগে। তার একটা বড় গুণ, তিনি তার মনের কথা খুব একটা লুকিয়ে রাখতে পারেন না। মুখে যতই ভাঁড়ামি ও ভণ্ডামি করুন, তার লিখিত বইতে জিয়াউর রহমান সম্পর্কে এক পর্যায়ে যেসব সত্য কথা লিখেছেন, তাতে দলের মধ্যে তাকে একবার বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছিল। গত শুক্রবার ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভায় মওদুদ আহমদ যেসব কথা বলেছেন, তাতে অতীতে নির্বাচনে ভোট ঠেকাতে তাদের অনেক কৌশলের কথা বেরিয়ে পড়েছে।
এবারের নির্বাচন সম্পর্কে মওদুদ বলেছেন, “ভোটারদের নির্বাচন কেন্দ্রে নিতে পারলেই বিএনপি-জামায়াত জোটের জয় অনিবার্য।” তার আশঙ্কা, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে নানা বাধা সৃষ্টি করবে। দলের নেতা-কর্মীদের তা ঠেকানোর প্রস্তুতি গ্রহণের তিনি আহ্বান জানিয়েছেন। তার কথার নির্গলিতার্থ হলো, দেশের ভোটদাতারা বিএনপি-জামায়াতকে তথা ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের ভোটদানের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। মওদুদের কথা, “জনগণ সরকারের উপর এতটাই বীতশ্রদ্ধ যে, ৩০ ডিসেম্বর ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলেই তারা ধানের শীষকে জয়যুক্ত করবে। এই সম্ভাবনায় আওয়ামী সরকার ভোটদাতাদের ভোটকেন্দ্রে আসা ঠেকিয়ে রাখার জন্য জোরজুলুম চালাবে।
তার এই বক্তব্য কাগজে পাঠ করে প্রথমেই আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে, আওয়ামী লীগ সরকার ভোটদাতাদের ভোটকেন্দ্রে আসা ঠেকাতে চাইবে— এই আশঙ্কাটা মওদুদ আহমদের মনে হঠাত্ কেন জাগ্রত হলো? আওয়ামী লীগ তো অতীতে কোনো নির্বাচনেই ভোটার ঠেকানোর চেষ্টা করেনি। করলে একবার চার সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনের চারটিতেই পরাজয় বরণ করত না। ভোটদাতাদের সৈন্য ও পুলিশ বাহিনীর সহায়তায় নির্মম দমননীতি চালিয়ে ভোটকেন্দ্রে আসতে না দেওয়ার নির্লজ্জ নজির রয়েছে ২০০১ সালের নির্বাচনে।
তখনকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সৈন্য ও পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার দ্বারা আওয়ামী লীগ নির্বাচন প্রার্থী, তাদের ভোটদাতা, সমর্থক—বিশেষ করে নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর যে অত্যাচার চালানো হয়েছিল, তার কোনো নজির নেই। নির্বাচনে ধানের শীষের জয়ের পর এই অত্যাচারের মাত্রা আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল। আওয়ামী লীগের বহু সমর্থক ও নেতা-কর্মীকে দেশ থেকে পালাতে হয়েছিল। পূর্ণিমা শীলদের উপর বর্বর গণধর্ষণের ইতিহাস তো তখনই রচিত হয়। নিজেদের অতীতের কর্মকাণ্ডের কথা স্মরণ করেই হয়ত মওদুদ আহমদের মনে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকার এবারের নির্বাচনে বিএনপি’র অতীতের কর্মকাণ্ড অনুসরণ করতে পারে। আওয়ামী লীগের নেতারা তাকে যদি এখন আশ্বস্তও করেন যে, আওয়ামী লীগের এই ধরনের চণ্ডনীতি অনুসরণের কোনো ইতিহাস নেই, তাহলেও মওদুদ আহমদের মন থেকে ভয় যাবে কিনা সন্দেহ। কারণ, জন্ডিস রোগী চারপাশের সব কিছু হলুদ দেখতে শুরু করে।
মওদুদ আহমদকে বনের বাঘে নয়, মনের বাঘে ধরেছে। অতীতে তারা যা করেছিল, বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকার তাই করবে আশঙ্কায় জলাতঙ্কের মতো তার মনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় প্রেসক্লাবের সভায় তিনি বলেছেন, গতকাল (বৃহস্পতিবার) আমার এলাকায় শুনলাম, ট্রাকে করে অন্য এলাকা থেকে পুলিশ বাহিনী আনা হয়েছে। তারা রাতে অভিযান চালাবে বাড়িতে বাড়িতে, যাতে আমাদের কোনো নেতাকর্মী ও সমর্থক নিজ গৃহে থাকতে না পারে। এটা মওদুদ সাহেবের শোনা কথা ও অনুমান। এখন পর্যন্ত এই ঘটনা (বিএনপি’র নেতাকর্মীদের গৃহত্যাগে বাধ্য করা) ঘটেনি। মওদুদ অনুমান করছেন ঘটবে। ২০০১ সালে এই ঘটনা তারা ঘটিয়েছিলেন।
ট্রাকে করে অন্য এলাকা থেকে পুলিশ বাহিনী আনা সম্পর্কে মওদুদ যে অভিযোগ করেছেন, তা কতটা সঠিক জানি না। যদি সঠিক হয় তাহলেও তাতে মওদুদ সাহেবদের তো আপত্তি করার কোনো কারণ নেই। নির্বাচনে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য শুধু পুলিশ নয়, ম্যাজিস্ট্রেসির ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি তো তাদের। গল্পে শুনেছি, এক ব্যক্তি সারাজীবন নানা ধরনের অপরাধ করার পর মৃত্যুশয্যায় শুয়ে অচৈতন্য অবস্থায় প্রলাপ বকতেন। এই বাড়িতে ডাকাত ঢুকছে। দ্যাখ দ্যাখ ডাকাত সব লুটে নিয়ে গেল। মেয়েটাকে বাঁচাও, ওরা তাকে ধর্ষণ করতে চায় ইত্যাদি ইত্যাদি।
লক্ষ করলে দেখা যাবে, বিএনপি-জামায়াত বা ঐক্যফ্রন্টের মঞ্চ থেকে যত কথা বলা হচ্ছে, তা নির্বাচনসংক্রান্ত কোনো সুস্থ প্রচারণা নয়। সবই প্রলাপোক্তির সমতুল্য। অতীতে ক্ষমতায় থাকাকালে বিএনপি-জামায়াত যত গুরুতর অপরাধ করেছে, কল্পনায় সেগুলোর পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করে তাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে তা প্রলাপোক্তির মতো বেরিয়ে আসছে। কোনো সুস্থ ভবিষ্যত্ গড়ার কর্মসূচি তারা দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারছেন না। কেবল ভীতি প্রচার, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অপপ্রচার তাদের একমাত্র কর্মসূচি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মওদুদ সাহেবদের জোটের নির্বাচন প্রচারণায় বারো আনা জুড়ে রয়েছে একটি কথা, এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। সম্প্রতি ব্রিটিশ হাইকমিশনার ড. কামাল হোসেনের বাসায় সৌজন্য সাক্ষাত্কারে গেলে কামাল হোসেন তাকেও কথাটা জানিয়েছেন। নির্বাচন কারচুপিতে যে বিএনপি-জামায়াতের দক্ষতা অতুলনীয়, তারাও এখন ২০১৮ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে নির্বাচন কারচুপির ধুয়া তুলেছেন।
অনেকের সঙ্গে আমারও ধারণা, এই প্রচারণা একটা ক্যামোফ্লাজ। এই প্রচারণার দ্বারা দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আওয়ামী জোটের দিকে নিবদ্ধ রেখে আসলে নির্বাচনে কারসাজির কাজটি বিএনপি-জামায়াতের ক্যাডারদের দ্বারা করানো। সাম্প্রতিক কয়েকটি সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা নির্বাচনে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডারেরা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ভোট কেন্দ্রে ঢুকে ক্ষমতাসীন জোটের প্রার্থীদের ভোটপত্রে সীল মেরে তাদের ভোটবাক্স ভর্তি করেছে বলে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়েছিল।
পরে দেখা গেছে এই কাজটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে করেছে, বিএনপি-জামায়াতের— বিশেষ করে জামায়াতের ক্যাডারেরা। তারা নেতাদের নির্দেশ মোতাবেক জিনসের প্যান্টশার্ট পরিধান করে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীদের মতো সাজসজ্জাসহ জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু শ্লোগান দিয়ে সকলকে বিভ্রান্ত করে, ভয় দেখিয়ে ভোট কেন্দ্রে ঢুকেছে এবং জাল ভোটপত্রে ভোট বাক্স ভরেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভোটপত্র ও ভোটবাক্স চুরি করেছে। সকল দোষ পড়েছে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের উপর।
এবার বিএনপি-জামায়াতের জোট থেকে নির্বাচনে নানা ধরনের কারচুপি হবে। নির্বাচন কমিশনকে সে সম্পর্কে কঠোরভাবে সতর্ক থাকতে হবে। ছাত্রলীগ ও যুবলীগকে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে তাদের নাম ও পরিচয় ভাঙিয়ে কোনো মহলই এমন কর্মকাণ্ড ঘটাতে না পারে, যা আখেরে তাদের জন্য দুর্নাম বয়ে আনবে। শৃগালে দই খেয়ে যাতে ছাগলের দাঁড়িতে হাত মুছতে না পারে, সেদিকে নির্বাচন কমিশনকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
জাতীয় প্রেসক্লাবের আলোচনা সভায় মওদুদ আহমদ ভালো মানুষ সেজেছেন, “নির্বাচনে সরকারের হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করতে হবে। এছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই আমাদের।” গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনের যে কোনো বিকল্প নেই একথা সত্য। কিন্তু মওদুদ সাহেবের দল বা জোট তো কখনো এই গণতান্ত্রিক পন্থাকে আমল দেয়নি। নির্বাচনের বিকল্প পন্থা হিসেবে হত্যা, সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্রকে গ্রহণ করেছে। তাতে ব্যর্থ হয়ে বৃদ্ধ নখদন্তবিহীন সিংহের মতো অহিংসাই পরম ধর্ম বলে প্রচার করতে চাইছে। জীব-জন্তুদের তার কাছে নির্ভয়ে আসতে বলছে। কিন্তু চতুর শৃগাল বলছে, মামা, তোমার গুহায় যেসব পশুপাখি অহিংস ধর্ম গ্রহণ করতে এসেছে, তাদের পায়ের চিহ্ন তো কেবল গুহার ভেতরে গেছে দেখতে পাচ্ছি। কেউ বাইরে বেরিয়ে আসেনি। বলেই সে পালিয়েছে। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে বলি, তারা অতীতের সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্রের পথ ত্যাগ করে গণতন্ত্রে যে দীক্ষা নিয়েছেন এবং অন্যকে দীক্ষা দিতে চান এটা প্রমাণ করার জন্য এবারের নির্বাচন তাদের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ। তারা নির্বাচনে যোগ দিয়ে সঠিক কাজ করেছেন। ক্ষমতায় যেতে চাইলে এই নির্বাচনের মাধ্যমেই তাদের যেতে হবে। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার ও ফাউল গেম খেলার নীতি ত্যাগ করে শান্তিপূর্ণ ও স্বাভাবিকভাবে যাতে এবারের নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয় তাতে সম্পূর্ণ সহযোগিতা দিতে হবে। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে তাদের দলকে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পথে পরিচালনার যে সুযোগ মওদুদ আহমদ ও তার সমমনা বন্ধুদের জন্য দেখা দিয়েছে, তার সদ্ব্যবহার যেন তারা করেন। তাতে দেশের মঙ্গল, তাদেরও মঙ্গল। [ লন্ডন, ১ ডিসেম্বর, শনিবার, ২০১৮ ]
