রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮২তম প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রাচ্যনাটের ‘অচলায়তন’ নাটকের টানা তিনটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় নাট্যশালায়। বৃহস্পতিবার (১০ আগস্ট) সন্ধ্যা ৭টায় এবং শুক্রবার (১১ আগস্ট) বিকাল ৫:৩০ মিনিট ও সন্ধ্যা ৭:৩০ মিনিটে জাতীয় নাট্যশালার মূল মঞ্চে মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে প্রাচ্যনাটের নাটক ‘অচলায়তন’।
নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় ও মঙ্গলদীপ ফাউন্ডেশন প্রণোদনায় প্রাচ্যনাটের ৪২তম প্রযোজনা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর অচলায়তন। নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন আজাদ আবুল কালাম।
কাহিনী সংক্ষেপ:
বহুদিন ধরে চলে আসা প্রথাকে কঠোর নিয়মের আবদ্ধে পালন করতে গিয়ে সময়ের আবর্তনে অচলায়তন বিদ্যায়তনের কোনো পরিবর্তন হয়না। এখানকার বিদ্যার্থীরাও কোনো প্রশ্ন ছাড়াই তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া যাবতীয় নিয়ম ও অনুশাসন মেনে চলে। অচলায়তনের বাইরের জগতের সাথে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই, এমনকি যোগাযোগ করার বিন্দুমাত্র আগ্রহ প্রকাশ পাওয়াটাও তাদের জন্য ‘মহাপাপ’-এর নামান্তর!
এই বিদ্যায়তনের দুই শিক্ষার্থী - পঞ্চক ও মহাপঞ্চক – তারা আপন ভাই হলেও তাদের জীবন দর্শন বিপরীত। পঞ্চক বিদ্রোহী মনোভাবসম্পন্ন, যে সকল গতানুগতিকতাকে প্রশ্ন করে এবং অচলায়তনের নিয়মতান্ত্রিকতার ত্রুটিসমূহকে চিহ্নিত করে। অপরদিকে মহাপঞ্চক গতানুগতিক চিন্তাপ্রবাহে অন্ধভাবে বিশ্বাস করে এবং বিদ্যায়তনের সকল নিয়মকেই বিনাপ্রশ্নে অনুসরণ করে।
এই দুই ব্যক্তির মধ্যকার যে ইচ্ছার দ্বন্দ্ব তা আরও দৃঢ়ভাবে প্রকাশিত হয় যখন অচলায়তনে একটি ছোট্ট ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুধুমাত্র নিয়মতান্ত্রিকতাকে অটুট রাখার স্বার্থে অনেক বড় বড় সিদ্ধান্ত নেয়া হতে থাকে। এরই মধ্যে প্রেক্ষাপটে উপস্থিত হন গুরু বা দাদাঠাকুর এবং বাইরের বাস্তব জগত ও সেই জগতের মানুষদের সাথে অচলায়তনের বিদ্যার্থীদের পরিচয় ঘটে প্রায় যুদ্ধের ডামাডোলের ভিতর। পুরনো চিন্তার প্রাচীন দেয়াল ভেঙ্গে পড়ে আর শুরু হয় নতুনের স্পন্দন।
নির্দেশনা ভাবনা:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তত্ত্বনাটক, প্রতীকী নাটক নিয়ে বড় বড় সমালোচকদের যে অষ্পটতার অভিযোগ তাকে খন্ডন করে আমাদের অচলায়তন মঞ্চায়নের প্রয়াস স্পষ্ট এবং প্রতীকের ব্যবহার যথার্থ রূপে প্রকাশের ইচ্ছা কেবল।
অচলায়তন বিদ্যাপীঠকে আমরা কল্পনা করেছি একটি বালিকা বা নারী শিক্ষাগৃহ হিসেবে। আমাদের মত পশ্চাৎপদ এবং ধর্মীয়-সামাজিক চিন্তায় অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী নারী। নারীকে কুসংস্কার আর নানা বিধি নিষেধের মধ্যে আটকে রাখার নানান ষড়যন্ত্র বিদ্যমান এবং কখনো কখনো সেই ষড়যন্ত্রে নারী নিজেও যেনো প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।
এই বিদ্যায়তনের সকল নিয়মকানুন এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে বাইরের পৃথিবীর আলো-বাতাস বা মুক্তি চিন্তা কোনোভাবেই কোনো বিদ্যার্থীর ভাবনায় মননে স্থান না পায়। এখানে কাজের গতি মন্থর এবং যন্ত্রবৎ, যেন দম দেয়া পুতুল সবাই। ঠিক উল্টোচিত্র অচলায়তনের বাইরের জগত – সেখানে কর্মমুখর সাধারণ মানুষ শোণপাংশু। তারা গতিশীল। কখনো জীবন গতির চেয়ে এক ধাপ আগানো তাদের চলন। আর দর্ভক যারা – তারা কর্মে এবং ধর্মে নিবেদিত।দৃশ্যমান দুই বিপরীত গতির সম্মিলন ঘটানোর চেষ্টা আছে প্রযোজনায়। চরিত্ররা গতকালের বা আজকের, হতে পারে আগামীর।
মূল অচলায়তনের উগ্রবাদী দুষ্ট চরিত্র মহাপঞ্চকই যেমন দায়িত্ব পায় পুরনো ভাঙ্গা ভীতের উপর নতুন যাত্রা শুরু করার। সে যেনো ভিলেন থেকে নায়ক হয়ে ওঠে রবীন্দ্রনাথের কলমে। আমরা তার বিপ্রতীপ অবস্থানে গিয়েছি।
আদৌ এই বিদ্যায়তনের বা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বাস্তব নিরীখে কতটুকু? আবার নিয়মনীতি মন্ত্র বা প্রায়শ্চিত্তে মানবের মুক্তি আছে কি? নাকি এই শিক্ষার আমূল উৎপাটনেই একদিন তৈরি হবে সত্যিকারের শিক্ষা যা মানুষে মানুষে একাত্ম হওয়া, মুক্ত দুনিয়ার স্বপ্নে বিভোর করবে সবাইকে।
আমাদের গুরু বা দাদাঠাকুর না নারী না পুরুষ এবং মুক্তিদাতা, যে আমাদের সাথে মিলতে চায়, সবার সাথে যুক্ত থেকে খেলায় অংশগ্রহণ করতে চায়। আমরাও দেখতে চাই খেলতে খেলতে শিখতে পারি কিনা সত্যিকারের শিক্ষা।
নাটকটির বিভিন্ন চরিত্র রূপায়ন করছেন- শতাব্দী ওয়াদুদ, সানজিদা প্রীতি, শাহানা রহমান সুমি, শাহেদ আলী, ফরহাদ হামিদ, জাহাঙ্গীর আলম, চেতনা রহমান ভাষা, প্রমুখ। মঞ্চ ও আলো: মোঃ সাইফুল ইসলাম, সঙ্গীত ভাবনা ও প্রয়োগ: নীল কামরুল, কোরিওগ্রাফি: স্নাতা শাহরিন, পোশাক: আফসান আনোয়ার।
