রাজধানীর খাল ও জলাশয়ের বদ্ধ পানিতে এডিস মশার বিস্তার হচ্ছে

  • সামনে আরো ভয়াবহ হবে ডেঙ্গু পরিস্থিতি
  • স্বচ্ছ পানি ছাড়াও এডিস মশা জন্মাচ্ছে: বিশেষজ্ঞ
আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৩, ০৭:১৫

প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা। কিন্তু ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কোনো পদক্ষেপই কাজে আসছে না। একটা সময় কীটতত্ত্ববিদরা বলেছেন, পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা জন্ম নেয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এডিস মশার আচরণে ব্যাপক পরিবর্তনের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, স্বচ্ছ পানির পাশাপাশি বদ্ধ ও নোংরা পানিতেও এডিস মশার বিস্তার ঘটতে দেখা যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণ ও দুই সিটি করপোরেশনের ভুল পদ্ধতির মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের কারণে এডিস মশার আচরণও বদলে গেছে। অন্যদিকে দুই সিটির বিভিন্ন নোংরা খাল ও জলাশয়ে পরিষ্কার-পরিছন্নতা কার্যক্রম ঢিলেভাবে চলার কারণে এডিস মশার প্রভাবও বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন শুধু ওষুধ ছিটিয়ে কিংবা একটি-দুটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ঢাকার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। খাল-ডোবা রয়েছে এমন এলাকা এডিস মশা বিস্তারের জন্য উপযোগী। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনকে অবশ্যই মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে খাল ও জলাশয় ব্যবস্থাপনায় কার্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে।

রাজধানীর খালের টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য দুই সিটি করপোরেশনকে দায়িত্ব দেওয়া হয় বছর আড়াই আগে। ঢাকা ওয়াসা আগে সেই দায়িত্ব সামলেছে। কিন্তু খাল ও জলাশয়গুলোর উন্নয়ন ও সংরক্ষণে কোনো সিটি করপোরেশনই এখনো তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। জোড়াতালি দিয়ে চলছে দখল উচ্ছেদ, খনন, পরিষ্কার ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম। এভাবে খালগুলোর টেকসই উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সে কারণেই ঢাকায় দিন দিন বাড়ছে মশাবাহিত রোগ।

ঢাকা ওয়াসা থেকে দুই সিটি করপোরেশন ২৬টি খাল বুঝে পায় ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর। দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই দুই সিটি করপোরেশনে খাল পরিষ্কারে বেশ কর্মযজ্ঞ চালায়। এর প্রভাবে ঐ সময় রাজধানীর জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে যায়। তবে এরপর খাল পরিষ্কারের কর্মকাণ্ড নিয়মিত না হওয়ায় কয়েক মাসের ব্যবধানে আগের অবস্থায় ফিরে যায় খালগুলো।

ঢাকার খাল ও জলাশয় নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার। সংস্থাটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ‘ওয়াসা থেকে দায়িত্ব পাওয়ার পর সাড়ে তিন বছর পেরিয়ে গেলেও খালগুলো উদ্ধার ও ব্যবস্থাপনায় কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। যে আশা নিয়ে সিটি করপোরেশনের কাছে খাল হস্তান্তর করা হয়েছিল, তার কোনো প্রতিফল আমরা দেখিনি।’

ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধির সঙ্গে ঢাকার খাল-জলাশয়ের সম্পৃক্ততা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এডিস মশা জন্ম নেয় আবদ্ধ পানিতে। ঢাকার খাল ও জলাশয়ের বেশির ভাগ পানিই আবদ্ধ ও মারাত্মক রকম নোংরা। এগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। ফলে ঢাকার ডেঙ্গু মহামারি রূপ নেওয়ার পেছনে এসব খাল-জলাশয়ের অব্যবস্থাপনার সম্পর্ক রয়েছে।

বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অধীনে ১১টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অধীনে ২৯টি খাল রয়েছে। ২০২১ ও ২০২২ সালে বর্ষা মৌসুমের আগে আগে খালগুলো পরিষ্কারের জন্য ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করে দুই সিটি। এর পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমও পরিচালনা করা হয়েছিল। যদিও চলতি বছরের শুরুতে দুই সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে খাল ও জলাশয় পরিষ্কার নিয়ে তেমন কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। ফলে এবারের বৃষ্টিতে তীব্র জলাবদ্ধতা যেমন ভুগিয়েছে, পাশাপাশি ডেঙ্গুর ভয়াবহতার মুখোমুখি হচ্ছে নগরবাসী। এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজননস্থল হিসেবে আমরা পরিষ্কার পানির কথা জানি। আমি নিজেও এটি সব সময় বলে এসেছি। কিন্তু আমাদের গবেষণায় আমরা পেয়েছি, এডিস মশা ড্রেনের ময়লা পানি এমনকি সমুদ্রের নোনা পানিতেও ডিম পাড়ে এবং জীবনচক্র সম্পন্ন করতে পারে। তিনি বলেন, এক সেন্টিমিটার পরিমাণ জমে থাকা পানিতেও আমরা এডিস মশার বংশবৃদ্ধির প্রমাণ পেয়েছি। ইতিপূর্বে আমরা জানতাম এডিস মশা শুধু দিনের বেলায়, বিশেষ করে সকালে এবং বিকালে কামড়ায়। কিন্তু আমাদের গবেষণায় সেটি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কবিরুল বাশার বলেন, আমাদের ল্যাবরেটরি এবং মাঠ পর্যায়ের গবেষণায় আমরা পেয়েছি, এডিস মশা রাতেও কামড়ায়। তবে রাতের বেলায় কামড়ানোর হার কম। পৃথিবীব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং মানুষের আচরণের কারণ এই মশা নিজেকে পরিবর্তিত করে নিয়েছে।

সম্প্রতি খাল, লেক ও নালাসহ বিভিন্ন জলাশয়ে মশা দমনে বিটিআই নামে ওষুধ এনেছে উত্তর সিটি করপোরেশন। এ বিষয়ে ডিএনসিসির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন,  পাঁচ টন বিটিআই আনা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সড়কের পাশের নালা, লেক, খাল, বাসাবাড়ির বেজমেন্টে বিটিআই ছিটানো হবে। এখন যে পরিমাণ বিটিআই আনা হয়েছে তা দিয়ে আগামী তিন মাস পর্যন্ত এই কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে। তবে এর মধ্যে দ্বিতীয় চালানের জন্য দরপত্র আহ্বান করব।

তিনি বলেন, বিটিআইয়ের একটি প্যাকেটে ২৫ গ্রাম কীটনাশক থাকে। ১০ লিটার পানিতে এ রকম তিন প্যাকেটের ৭৫ গ্রাম কীটনাশক মিশিয়ে ২৫-৫০ বর্গমিটার এলাকায় ছিটিয়ে দিতে হয়। কোনো স্থানে প্রথমবার দেওয়ার ১৫ দিন পর আবার বিটিআই প্রয়োগ করতে হয়। তিনি আরো বলেন, আমাদের যে জনবল আছে, আমি আরো অনেক বেশি এরিয়া কাভার করতে পারব। আগে সপ্তাহে দুই বার টেমিফস্ট ব্যবহার করা হতো। তবে বৃষ্টি হলে আবার সাত দিন পরপর বিটিআই প্রয়োগ করতে হবে।’

ইত্তেফাক/এসটিএম