নিবন্ধন পেয়ে শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের তোড়জোর

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৩, ১১:৩৩

রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিবন্ধন পেয়েই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের (বিএনএম) শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। বিএনপিতে নিষ্ক্রিয় জাতীয় পর্যায়ের বেশ কয়েক জন নেতাকে বিএনএমের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি না এলে বিএনএমের ব্যানারে দলটির কিছু নেতাকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধ্য করা হতে পারে—এমন খবরও আলোচনায় রয়েছে। যদিও বিএনএম গঠনের শুরু থেকে সরকারের সমর্থন ছিল বলে বরাবরই অভিযোগ আসতে থাকে। এমনকি নিবন্ধন প্রক্রিয়ার সময় ইসি সচিবালয় থেকে দলটির তৃণমূলের কার্যক্রমে সহায়তার জন্য জেলা-উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয় বলে ইত্তেফাককে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছিলেন। বিভিন্ন মহল থেকে আপত্তি থাকলেও তা আমলে না নিয়ে বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (বিএসপি) নিবন্ধন দিয়েছে ইসি।

শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনএমের মুখপাত্র ও যুগ্ম-আহ্বায়ক ব্যারিস্টার এম সারোয়ার হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ‘পরিস্থিতি ডিমান্ড করলে শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে জাতীয় পর্যায়ের কোনো নেতা যদি দলের নেতৃত্বে আসতে চান, তাহলে আমরা সাদরে গ্রহণ করব।’

২০২১ সালে বিএনএম গঠন করা হয়। বিএনপির সাবেক দুই নেতা অধ্যাপক ড. আব্দুর রহমানকে (বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য) আহ্বায়ক এবং মেজর মু. হানিফকে (অব.) (বিএনপির নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য) সদস্যসচিব করে বর্তমানে ৪৯ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি আছে। তবে নিবন্ধনের সময় ৩১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটির তালিকা জমা দেওয়া হয়েছিল। ঐ ৩১ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটিতে আট জন সাবেক সেনা কর্মকর্তা রয়েছেন। আহ্বায়ক কমিটির বেশির ভাগ সদস্য একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বিএনএমের আহ্বায়ক ড. আব্দুর রহমান প্রাইম ইউনিভার্সিটির ব্যাবসায় প্রশাসন বিভাগের প্রধান ও ডিন। তিনি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরগুনা-১ আসনে বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। সপ্তম সংসদ নির্বাচনে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও তিনি পরাজিত হয়েছিলেন। তিনি বরগুনা জেলা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম-আহ্বায়ক এবং বেতাগী থানা ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বরগুনা জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বেতাগী থানা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। ২০০৬ সালে তিনি বিএনপির রাজনীতি ছেড়ে দেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক দর্শন হলো জাতীয়তাবাদ।’

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বিএনএমের নেতৃত্বে পরিবর্তনের জোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বর্তমান আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবকে দলের শীর্ষ নেতৃত্বে রাখা হচ্ছে না। দ্রুত সময়ের মধ্যে ৪৯ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ভেঙে ১০১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হচ্ছে। বিএনএমের চেয়ারম্যান ও মহাসচিব হিসেবে বিএনপির সাবেক দুই মন্ত্রীকে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যে বিএনএমের নেতৃত্বে আসতে পারেন বিএনপির এমন পাঁচ জন নেতার নাম জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে। এর মধ্যে বরিশাল অঞ্চল থেকে বিএনপির সাবেক তিন মন্ত্রীর নাম আলোচনায় রয়েছে, যারা ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সংসদ সদস্যও ছিলেন। এছাড়া চাঁদপুর ও কিশোরগঞ্জ অঞ্চল থেকে বিএনপির দুই নেতাকে টার্গেট করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা কমিটিতে বিএনপির কোণঠাসা ও দলছুটদের রাখা হবে। কোনো কারণে বিএনপি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বয়কট করলে বিএনপির বড় একটি অংশকে বিএনএমের ব্যানারে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করানো হবে। এজন্য সম্ভাব্য যারা নির্বাচন করবেন, তাদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে সবকিছুই পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। বিএনপির রাজনৈতিক দর্শন অনুকরণ দলটির আদর্শ।

সাধারণত জাতীয় নির্বাচনের আগমুহূর্তে রাজনীতি নিয়ে নানান ধরনের তত্পরতা দেখা যায়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় নির্বাচনের আগেও বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) নামের নিবন্ধিত একটি দল নিয়ে তত্পরতা চলে। একপর্যায়ে দলটির প্রধানকে ঢাকা-১৭ আসন থেকে সংসদ সদস্য বানানো হয়। বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের পরিবর্তে গমের শীষ প্রতীক দাবি করেছিল দলটি। পরে টেলিভিশন প্রতীক দেওয়া হয় তাদের।

বিএনএমের শীর্ষ নেতৃত্ব পরিবর্তনের বিষয়ে জানতে চাইলে দলটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আব্দুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, ‘মাত্র আমরা নিবন্ধন পেয়েছি। এখনো কেন্দ্রীয় কমিটির সভাও করতে পারিনি। কমিটি পরিবর্তন হলে সেটি পরবর্তী কাউন্সিলের মাধ্যমে করা হবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী ইত্তেফাককে বলেন, যেকোনো মুহূর্তে সরকারের পতন ঘটবে। এই মুহূর্তে সরকার নানামুখী ষড়যন্ত্র করছে। এর আগেও বিএনপি থেকে লোক নিয়ে দল গঠনের চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু লাভ হয়নি। এবারও লাভ হবে না। যারা দলের সঙ্গে মীরজাফরি করবে, তাদের নিষ্ঠুর পরিণতি ভোগ করতে হবে।

আপত্তির পরও নিবন্ধন পেল বিএনএম-বিএসপি
আপত্তি থাকার পরও বিএনএম ‘নোঙর’ প্রতীকে ও বিএসপি ‘একতারা’ প্রতীকে নিবন্ধন পেয়েছে। দল দুটির প্রার্থীরা দলীয় প্রতীক নিয়ে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকারের ভোটে অংশ নিতে পারবে। কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন কমিশন ?বৃহস্পতিবার সর্বসম্মতিক্রমে এ দুটি দলকে নিবন্ধন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বলে জানিয়েছেন ইসি সচিব মো. জাহাংগীর আলম। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে এ দুটি দলকে নিবন্ধনযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। এরপর তাদের বিষয়ে দাবি-আপত্তির শুনানি করেছে ইসি। সবকিছু পর্যালোচনা করে চূড়ান্তভাবে নিবন্ধন দেওয়া হলো। ইসি সচিবালয় এসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করার পর সংশ্লিষ্ট দল দুটিকে নিবন্ধন সনদ তুলে দেওয়া হবে। সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী বিএনএমের শর্ত পূরণ না করার অভিযোগ জমা দেন ইসিতে। অন্যদিকে বিএসপিপ্রধানের বিরুদ্ধে পৈতৃক সম্পত্তি দখল করে কেন্দ্রীয় কার্যালয় বানানোর অভিযোগ দেন ভাইবোনেরা।

উল্লেখ্য, নবম সংসদ নির্বাচনের আগে ২০০৮ সালে দল নিবন্ধনের এই নিয়ম চালু করে ইসি। প্রায় দেড় দশকে ৪৯টি দল কমিশনের নিবন্ধন পেয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি দলের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে। এই দল দুটি নিয়ে ইসির নিবন্ধিত দলের সংখ্যা দাঁড়াল ৪৪।

ইত্তেফাক/কেকে