দেশে দেশে দুর্যোগ ও আগামীর পৃথিবী

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:১১

আবহাওয়ার চরিত্র বদলে যাওয়ার কারণে দেশে দেশে একটার পর একটা বড় বড় দুর্যোগ আঘাত হানছে। এর প্রধান কারণ ক্রমবর্ধমান কার্বন নিঃসরণের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি। মোটা দাগে যদি চিন্তা করি, বিষয়টা হলো যত বেশি শিল্পায়ন ও উন্নয়ন তত বেশি কার্বন নিঃসরণ! শিল্পায়ন-উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে বা কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রযুক্তি ব্যয়বহুল হবে বলে অনেক দেশ এটাকে গুরুত্ব না দিয়ে তথা না ভেবে পুরো পৃথিবীর মানুষের ক্ষতি ডেকে বাছবিচারহীনভাবে শুধু নিজেদের স্বার্থের কথা ভাবছেন। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, রাশিয়া, জার্মানি, যুক্তরাজ্য মোট কার্বন নিঃসরণের প্রায় ৫১ ভাগ এর জন্য দায়ী। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঠেকাতে এ দেশগুলোর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এ দেশগুলোই এযাবত্ যত চুক্তি বা অঙ্গীকার করেছে তা ঠিকঠাক মেনে চলতে পারেনি বা মানতে অস্বীকার করেছেন! ২০১৫ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত ‘জলবায়ু সম্মেলনের’ চুক্তি অনুযায়ী তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার শিল্পযুগের আগের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস নিচে রাখার সিদ্ধান্ত হয়। এ জন্য লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু সেই চুক্তি অনুযায়ী কি অতিমাত্রায় কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলো উষ্ণায়ন ঠেকাতে কাজ করছে? এক দেশ অন্য দেশের ওপর দায় চাপাচ্ছে। আবার কোনো কোনো দেশ চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে। বাস্তবতা হলো, উন্নত দেশসমূহ মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ করেই যাচ্ছে, আর তার ফল ভোগ করতে হচ্ছে ন্যূনতম কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোকে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় তথা উষ্ণায়ন রোধে উন্নত দেশসমূহ ক্ষতিগ্রস্ত গরিব দেশসমূহকে বিভিন্ন সাহায্য-সহযোগিতার অঙ্গীকার করলেও তারা তা পালন করছে না। এর দায় কোনোভাবে উন্নত দেশসমূহ এড়াতে পারে না।

সম্প্রতি ‘আইপিসিসির’ এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০৩০ সালের মধ্যেই বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির পরিমাণ ১.৫ সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাবে। জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাবজনিত দুর্যোগ আজ দেশে দেশে দৃশ্যমান। গত ২৮ অক্টোবর হারিকেন ‘উইলা’ মেক্সিকোর পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানে। গত ১১ অক্টোবরে ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় ‘তিতলি’। ঐ সময়ই ভারতের ঠিক অন্য পাশের উপকূলে, আরব সাগরের তীরে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় ‘লুবান’। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য ফ্লোরিডায় ঘূর্ণিঝড় ‘মাইকেলের’ আঘাতে এবং ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে প্রবল বর্ষণের ফলে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এ ছাড়া অতিসম্প্রতি ভারতের তামিলনাড়ু উপকূলে ঘূর্ণিঝড় ‘গাজা’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় দাবানলে ব্যাপক ক্ষতি হয়।

 সম্প্রতি প্রকাশিত ‘অর্থনৈতিক ক্ষতি, দারিদ্র্য এবং দুর্যোগ ১৯৯৮-২০১৭’ শীর্ষক বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চরম আবহাওয়ার প্রভাব নিয়ে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২০ বছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিশ্বের সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ২ হাজার ৯০৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের কারণে ক্ষতি হয়েছে ২ হাজার ২৪৫ বিলিয়ন ডলার। যা মোট ক্ষতির ৭৭ শতাংশ। গত ২০ বছরে জলবায়ু সম্পর্কিত এবং জিওফিজিক্যাল বিপর্যয়ে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১৩ লাখ মানুষের। সহজ কথায়, পরিবেশ রক্ষার বিভিন্ন বৈশ্বিক উদ্যোগ যে কাজে আসছে তা হলফ করে বলা যাবে না। এন্টার্কটিকা ও গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। দক্ষিণ গোলার্ধে উষ্ণতা বাড়লে তার প্রভাব পড়বে গোটা পৃথিবীতে। হিমশৈল গলে জলভাগের আয়তন বাড়িয়ে দিবে। ধীরে ধীরে বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হয়ে দেখা দিবে মহাবিপর্যয়। তাই এখনই পদক্ষেপ না নিলে অচিরেই বসবাস অযোগ্য হয়ে উঠতে পারে পৃথিবী নামক এই ছোট্ট গ্রহটি! নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। যে করেই হোক সমগ্র প্রাণীকুলের স্বার্থে কার্বন-ডাই-অক্সাইড তথা গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে হবে। পৃথিবীব্যাপী দুর্যোগ কমাতে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে সংশ্লিষ্ট সব ক্ষেত্রে দ্রুত, ব্যাপক এবং অভূতপূর্ব পরিবর্তন আনতে হবে।

n লেখক:শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়