বর্তমান যুগে সত্য কথা বলা সকলে পছন্দ করে না। আর এই সত্যটা যদি তার বা সমগোত্রীয়দের বিরুদ্ধে যায়, তা হলে তো কথাই নেই। শুরুতেই ১৯৭৫ সালে জাতীয় সংসদে বাকশাল গঠনের পর বঙ্গবন্ধুর একটি ভাষণ থেকে সামান্য কিছু উদ্ধৃতি দিতে চাই। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে দেশটা রাতারাতি একশ্রেণির টাউট, বাটপার, ধান্ধাবাজ, টেন্ডারবাজ, চোরাকারবারি, মজুতদার আর চশমখোরদের দখলে চলে যায়। এরা তখন হয় মুক্তিযোদ্ধা অথবা আওয়ামী লীগের সাইনবোর্ড গলায় ঝুলিয়েছে। দেশে এই সব দুর্বৃত্তের কারণে একধরনের অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হয়। এদের অনেকে মুদি দোকানদার থেকে ব্রিফকেস-নির্ভর ব্যবসায়ী বনে যায় রাতারাতি। কী করেন তা জানতে চাইলে সোজাসাপটা উত্তর ‘ফ্লাইং বিজনেসম্যান’, মানে যখন যে ব্যবসা সুবিধার তখন সেই ব্যবসা। তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে সবচেয়ে লাভবান ব্যবসা হচ্ছে চোরাকারবারি অথবা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুতদারি। এমন অরাজক অবস্থার পরিসমাপ্তি ঘটানোর জন্য বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠন করলেন। আসলে এটি কোন রাজনৈতিক দল ছিল না। ছিল একটা প্ল্যাটফরম। যারা দেশের স্বাধীনতা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে তাদের সকলকে তিনি এক পতাকা তলে আনার জন্য এই ব্যবস্থা করেছিলেন। সেখানে আওয়ামী লীগ ছাড়াও গণতন্ত্রী পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি, বিভিন্ন পেশাজীবী ব্যক্তিবর্গ, সিভিল সোসাইটির সদস্যরা স্বেচ্ছায় যোগ দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন, চারদিকে যেভাবে দেশের শত্রুরা কিলবিল করছে তাদের সবাইকে এক প্ল্যাটফরমে আনতে হলে এমন একটি সহায়ক ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য এই ব্যবস্থার সঠিকভাবে প্রণয়ন হওয়ার আগেই বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলেন। ১৯৭৫ সালে সংসদে দেওয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি মাল্টি-ক্লাস পার্টি। আমি তার নামের আগে কৃষক শ্রমিক লাগিয়েছি বৈকি, কিন্তু দলটির চরিত্র এখনো বদলাতে পারিনি, রাতারাতি সব সম্ভবও নয়। আমার দলে নব্য-ধনীরাও আছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ায় তাদের লুটপাটের সুযোগ বহুগুণ বেড়ে গেছে। আমি তাদের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যই বাকশাল করেছি। যদি এই ব্যবস্থা সফল করতে ব্যর্থ হই এবং আমার মৃত্যু ঘটে তাহলে দলকে কবজা করে ওরা আরো লুটপাটে উন্মত্ত হয়ে হয়ে উঠতে পারে। এমনকি শত্রুপক্ষের নীতি ও চরিত্র অনুসরণ করে স্বাধীন বাংলাদেশের মূলমন্ত্র, এমনকি আওয়ামী লীগের চরিত্র ও নীতি পালটে ফেলতে পারে। যদি তা হয়, সেটাই হবে আমার দ্বিতীয় মৃত্যু। সেজন্য আগেই বলেছি, আমার দল, আমার অনুসারীদের হাতেই যদি আমার এই দ্বিতীয় মৃত্যু ঘটে, তাহলে দীর্ঘকালের জন্য বিস্মৃতির অন্ধকারে চলে যেতে হবে। কবে ফিরব তা জানি না।’
বঙ্গবন্ধু হত্যা-পরবর্তীকালে এদের অনেকেই উল্লাস করেছিলেন আর জিয়া ক্ষমতা দখল করে এই সব দুর্বৃত্তকে নিয়েই তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করেন। কালো টাকা সাদা করার সংস্কৃতি তিনি চালু করেছিলেন এই অজুহাতে যে সেই টাকা শিল্পে বিনিয়োগ হবে। পানির দরে তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানা তাঁর বশংবদ লুটেরাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তারই ধারাহিকতায় বিশ্বের বৃহত্তম পাটকল আদমজী তাঁর স্ত্রী বেগম জিয়া বন্ধ করে দিয়ে হাজার হাজার শ্রমিককে রাতারাতি বেকার করে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু বাঙালিদের খুব ভালোবাসতেন। তাদের ওপর অতিমাত্রায় বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু তিনি জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন তাঁর কাছের মানুষের ওপর এত বেশি আস্থা আর বিশ্বাস একটি মারাত্মক ভুল ছিল। বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকার তাঁর কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কি একই ভুল করছেন? এই প্রশ্ন এখন অনেকের।
ধন্যবাদ জানাতে চাই দেশের নূতন প্রজন্মের অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে, যিনি গত রবিবার জাতীয় সংসদে দেশের তিনশত শীর্ষ ঋণখেলাপির একটি তালিকা প্রকাশ করেছেন, যাদের কাছে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাওনা ৫১ হাজার কোটি টাকা আর ঋণের ওপর দেয় সুদ মওকুফ করা হয়েছে এক বছরে ১২০০ কোটি টাকা। এর অর্থ হচ্ছে এরা জনগণের টাকা নিয়ে নানা ছল-চাতুরী করে তারা ফেরত দিচ্ছেন না, সাধারণ কথায় এরা জনগণের তথা রাষ্ট্রের এই বিশাল পরিমাণের অর্থ মেরে দিয়েছেন। পূর্বের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমন ৩০ জনের একটা তালিকা সংসদে প্রকাশ করেছিলেন। যেই পরিমাণের ঋণখেলাপি হয়েছে সেই পরিমাণের অর্থ দিয়ে দুটি পদ্মা সেতু তৈরি সম্ভব।
এটি নিছক জনগণের অর্থ নিয়ে শুধু খেলাপি হওয়া বিষয় নয় এটি একেবারেই রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে অর্থ লুট করা। যারা এই কাজটি করেছে তারা সমাজে যে খুব বেশি অপরিচিত তাও নয়; আর এই কাজটি কোনো একটা সরকারের আমলে ঘটেছে, তাও নয়। যারা করেছে এটি তাদের স্বভাব। তাদের অধিকাংশের পরিচয় তারা শিল্পপতি। পরিবারের সদস্যদের প্রায় কেউ দেশে থাকেন না। সকলে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দুবাই, কানাডা, ব্রিটেন, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য কোটি ডলারের বাড়ি কিনেছেন। পরিবার ওখানেই থাকেন। কানাডার টরেন্টো শহরে একটি বিরাট এলাকার নামই তো ‘বেগম পাড়া’।
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলি। ১৫ জনের বোর্ড সদস্য। নয়জনকে জোরপূর্বক বিশ্ববিদ্যালয়টির কাছে আসতে দেওয়া হয় না। বাকি ছয়জন পরিচালকের ফ্লোর নামে একটি বিলাসবহুল ফ্লোরে ততধিক বিলাসবহুল অফিস বানিয়েছেন। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে একজন শিক্ষার্থীকে গড়ে ১৫ লাখ টাকা খরচ করতে হয়। ওই ছয়জন পরিচালক শিক্ষার্থীদের অর্থে বিএমডাব্লিউ গাড়ি হাঁকান। কিছুদিন আগে সিদ্ধান্ত হয়েছে সকলে মার্সিডিজ বেঞ্জ কিনবেন। একটি বোর্ড সভার সিটিং অ্যালাউন্স ১ লাখ টাকা। মাঝেমধ্যে বোর্ড সভা বিদেশে করতে হয় কারণ দেশে খুব গরম। শিক্ষা সফরের নামে বোর্ডের কোনো কোনো সদস্য শিক্ষার্থীদের অর্থে সপরিবারে বিজনেস ক্লাসে উড়াল দিয়ে সভায় যোগ দিতে বিদেশ ভ্রমণ করেন, পাঁচ তারকা হোটেলে থাকেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন অনেক কীর্তি ওপেন সিক্রেট।
বঙ্গবন্ধুকন্যার সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার দুবার সুযোগ হয়েছে। মনে হয়েছে, তিনি তাঁর পিতার মতো অনেক কিছু করার স্বপ্ন দেখেন। তাঁর পিতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন; কারণ তিনি বাঙালিদের একটা স্বাধীন দেশ দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা তাঁর কর্মকাণ্ড দ্বারা ইতোমধ্যে ইতিহাসে তাঁর জন্য একটি জায়গা করে নিয়েছেন। তিনি বিশ্বে একজন স্বীকৃত রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর একটা প্রিয় কবিতা রবার্ট ফ্রস্টের ‘Stopping by woods on a snowy evening’ যার একটি লাইন ‘I have miles to go before I sleep’ তিনি প্রায়ই আবৃত্তি করেন। সামনাসামনি তাঁকে বলতে পারিনি, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, কাদের নিয়ে এই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করবেন? আপনি যাদের বিশ্বাস করে দায়িত্ব দিয়েছেন, আপনার প্রতি তাদের কজনার অঙ্গীকার আছে? কজন আপনার মতো বাংলাদেশকে ভালোবাসেন? যাদের হাতে কিছু দায়িত্ব তুলে দিয়েছেন তাদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে দেখলে বোঝা যাবে তাদের কজন তাদের ওপর দেওয়া আপনার আস্থা আর বিশ্বাস রাখতে পেরেছেন। সব খবর তো আপনার কাছে পৌঁছায় না। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িতের সন্তান আওয়ামী লীগের চেতনা ধারণ করবেন, এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর বেলজিয়ামে দায়িত্ব পালনরত রাষ্ট্রদূত সানাউল হককে সেই দায়িত্ব না দেওয়ার জন্য অনেকে বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করেছিলেন। উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ও আমার সন্তানতুল্য, তাকে অবিশ্বাস করা ঠিক নয়। কিন্তু সানাউল হক ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পর বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাকে এককথায় সপরিবারে জোরপূর্বক তাঁর বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। জেনারেল জিয়ার সার্ভিস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছিল ১৯৭৫ সালের মার্চ মাসে। জিয়া এই আদেশ বাতিল করার জন্য বঙ্গবন্ধুর একজন অত্যন্ত কাছের মানুষের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তার অনুরোধে বঙ্গবন্ধু সেই আদেশ বাতিল করেছিলেন। বাকিটা তো ইতিহাস।
ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশ করার জন্য অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ আর তাঁকে তা প্রকাশ করার অনুমতি দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে কৃতজ্ঞতা। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি একটু কঠোর হন, এই সব দুর্বৃত্তদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব। আসল কথা হচ্ছে আপনি যাদের নিয়ে অনেক দূর যেতে চান, তারা তা চান কি না তা খোঁজ নিয়ে দেখুন। সত্যটা প্রকাশ হতে খুব কষ্ট হবে না। সবশেষে ইংরেজ লেখক জর্জ অরওয়েলের একটি উক্তির উদ্বৃতি দিতে চাই। তিনি বলেছিলেন, ‘সত্য হতে একটি সমাজ যত বেশি দূরে সরে যাবে তত বেশি যারা সত্য বলেন তারা ঘৃণার পাত্র হবেন।’ (The further a society drifts from truth the more it will hate those who speak it.)
n লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক
