শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ৮ আশ্বিন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

প ঙ তি মা লা

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৩, ১৭:১৮

সৌন্দর্য ধুয়ে পানি খাওয়া
আহমাদ মাযহার

আমাদের মঞ্চে দর্শক-শ্রোতার চেয়ে
বক্তারা সংখ্যায় বেশি;
শিল্পীর কণ্ঠে যতটা সুর তার তুলনায়
জোরে চাওয়া হয় করতালি!
চর্চার পটভূমি নেই বলে গুরুত্ব বেশি অনুদানে।

সমাদর না হলেও চলে আয়োজকের
মুখ্য যে তার কাছে দর্শকের সংখ্যা!
প্রেমিকের ভালোবাসা নেই
আছে শুধু অধিকার ফলানো,
স্ত্রীর ভালোবাসা ঢাকা পড়ে তার অর্থের দাপটে,
কবিতার সাধনা নয়, কাঙ্ক্ষিত কবিখ্যাতি
রচনার চেয়ে গুরুত্ব বইয়ের প্রকাশনা উত্সবে;
অর্জনের চেয়ে বেশি লাভ তার উদযাপনে,
জাঁকজমকের তুলনায় উপেক্ষা সৌন্দর্যকে।

আমাদের যাপিত জীবনের এই তো স্বাভাবিকতা!
বিষণ্ন সাধক কবি কালপ্রভুকে জিজ্ঞাসা করলেন,
এই কালে কি তাহলে সৌন্দর্যের স্থান নেই?
ক্ষুব্ধকণ্ঠে জবাব দিলেন তিনি,
‘সৌন্দর্য ধুয়ে পানি খাওয়ালে চলবে তোমাদের?’

সাধক কবি ক্ষীণ কণ্ঠে যা বললেন
উদযাপন-উত্সবের ড্রামের আওয়াজে
তা ঢাকা পড়ে গেল,
কালপ্রভুর কানে পৌঁছাল না।

যদি সাধক কবির মুখের কাছে কান নিয়ে
কেউ শুনতে চাইত কী বলছেন তিনি
তাহলে শুনতে পেত—
‘সৌন্দর্য ধুয়ে পানি খাওয়ার লোকেরই
বড্ড অভাব আমাদের!’

এই ফাঁকে লিখব কিছু
আবু তাহের মুহাম্মদ

বেতন দিতেই খেপে গেল তোমার ক্লাসটিচার
প্রশ্ন—আমি কে তোমার?

তুমি বুঝে গেছিলে, প্রতিদিন হাঁটার ছলে
গোল পাহাড় মোড়ে দু-একবার দেখেছও ঘুরে।
সাদা হাফহাতা শার্টের সাথে মিলাতাম
গুঁড়ো সাবানের মডেলের কালো বোতাম
সেজেগুঁজে সন্ধে নামত যেন তোমার প্রিয় বান্ধবী
মনে কি আছে? আলমাস, সাপ্তাহিক ছুটি রবি।

কথার আঘাত
আজাদুর রহমান

কথার আঘাতে কেটে গেছে আপনার শরীর,
কাটা শরীর নিয়ে আপনি ক্লিনিকে গেছেন।
বেশ কিছু টেস্ট করা হয়েছে।
খলিলুর রহমানের চেম্বার পাঁচতলায়—
তিনি রিপোর্টগুলো দেখলেন,
তাকালেন চোখ নরম করে।
বললেন—ভয়ের কিছু নাই।
তারপরও কিছু ঔষধ লিখে দিচ্ছি,
ভালো ঘুম হলে দেখবেন, সব ঠিকঠাক,
আগের মতো সবকিছু।
...দেখুন, পৃথিবীর পরিস্থিতি ভালো না!
কারোরই ঘুম ভালো হচ্ছে না!

...আপনি নিচে এসে রিকশা নিলেন,
সত্যি, শরীরের কোথাও আঘাতের চিহ্ন নেই।
আপনি হেসে ফেললেন—
ঠিক সেই মুহূর্তে অন্যরকম হয়ে গেল শহরটা,
চারপাশে সবুজ সবুজ গাছ, গাছে গাছে পাখি,
পাখিদের কিচিরমিচির শুনতে পেলেন!
মন ভালো হয়ে গেল আপনার।
প্রেসক্রিপশনটা আপনি ভাসিয়ে দিলেন হাওয়ায়।
কাকরাইল পার হয়ে বেইলি রোড,
তারপর হলি ফ্যামিলি...রিক্সাটা আর যাচ্ছে না,
মগবাজার মোড়ে এক মধ্যবয়সি
রক্তে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
কথার আঘাতে কাটা পড়েছে সে।
চারদিক থেকে যারা তাকে দেখছে
তাদেরও শরীর রক্তাক্ত, ঠিক আপনার মতো—
কথার আঘাতে রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত।

সেই বিকেলের মৃত্যু নেই
সারওয়ার-উল-ইসলাম

কোনো কোনো বিকেলের বয়স বাড়ে না,
থেকে যায় স্নানরত কিশোরীর ঠোঁটের মতো ডাঁসা।
তেমনই এক শীতের বিকেল।
দুপুর শেষের মিষ্টি রোদে বাসা থেকে
কিছুটা পথ এগিয়ে দুজন রিকশায় চড়ি।
হুড তোলা নিয়ে দুজনের ভেতর সংকোচ-দ্বিধা।
তুমিই প্রথম বলেছিলে, ইজি হয়ে বসো।
এ কথায় আমি আরো জড়োসড়ো।
চন্দ্রিমা উদ্যানের সামনে নেমে
পশ্চিমে লেকের পাড় দিয়ে দুজন হাঁটি।
আহা কি সতেজ শীতের সেই বিকেল!
কৈশোর উত্তীর্ণ আমাদের সেই বিকেলকে মনে করে
জেগে থাকি মেঘলা রাতে, যখন বৃষ্টিতে ভিজে
পবিত্র হয় বারান্দায় ফোটা টকটকে রঙ্গন ফুল।
সেই বিকেলের উষ্ণতা আজও টের পাই।
টের পাই তোমার শরীরের ঘ্রাণ মোহনীয় হাসি
লেকের পানিতে ঝরনার শব্দ কানে বাজে আজও।

তোমার কাছ থেকে পাওয়া সেই বিকেলকে
যতনে তুলে রেখেছি বুকপকেটে।
এনজিওগ্রাম করেও ওখানে ব্লক পায়নি ডা. দেবী শেঠি।
সেই বিকেলের মৃত্যু কি হতে পারে?

বৃষ্টিসূত্রে রচিত
মতিন রায়হান

বৃষ্টি এলে মন-ময়ূরের পাখা নাচে গমকে গমকে

বৃষ্টিসূত্রে তাকে তুলে নিই বুকে! বিজন সৈকতে
ডাকে বুঝি চোরাবালি! ঘোরলাগা ঝাউবনও
উসকে দেয় স্মৃতি; সবুজ পাহাড়গুলি যেন ভ্রমণের
নিত্য প্রণোদনা—ফেরি করে রাশিরাশি মেঘের
ঘুঙুর; পায়ে বাজে তারামাছ, শামুক ঝিনুক
আর রোদেপোড়া মীনের মেয়েরা; কী নাম
দেবে গো তার? সুস্বাদু শুঁটকি? প্রোটিনের গল্পে
কাঁদে ব্যক্তিগত মত্স্য-সমাচার! সমুদ্র-জাহাজ
ভাসে দূর কোনো বন্দরের টানে...কোথায়
রয়েছে আজ দূরগামী নাবিকের ছায়ামায়াপ্রেম!
বুকের কিনারে বাজে চিনচিনে ব্যথা; এ জগত্যে
ন এক ব্যথার আধার! বাদ্য বাজে ঠমকে ঠমকে

বৃষ্টি এলে মন-ময়ূরের পাখা নাচে গমকে গমকে

সমীপেষু
সাহিনা মিতা

আপনাকে বলি,
এত যে পাঠ ও পাণ্ডিত্য, মন বোঝেন?
নৈঃশব্দের ডাক, অব্যক্ত বাক্য বোঝেন না?

এখানে পরিপাটি স্নিগ্ধতা, ঘাসের ডগায়
নাকছাবির মতো গেঁথে থাকে শুভ্র শিশির,
হলুদরঙা সকালের রোদ আর লেজকাটা
ঘুড়ির মতো উড়ে চলা ছোপ ছোপ মেঘ,
এখানে দু’হাত ভরে বকের পালক নিয়ে
আমি দাঁড়িয়ে আছি আপনার অপেক্ষায়!

মেঘের পালকে ভেসে ভেসে আমারও যে
দু’হাতে লেগেছে দুটি জাদুর ডানা, যাতে
ভর করে যখন-তখন দেখা হয় আপনার সাথে,
অথচ কিছুই রাখেন না খোঁজ!
ঐ বুকের ঠিকানায় পাঠানো তাবৎ’ মায়াখাম
পড়ে নিন, আমার সমান রংধনু শতরঙে
ছুঁয়ে দেবে আপনার আলোকিত মুখ!

আলো-আঁধারের গল্প
গোলাম সরোয়ার

পৃথিবীর মানুষগুলো সেই তো কবেই মরে গেছে
এখন পড়ে আছে জীবিত লাশগুলো।
বিবেক বিবর্জিত মানুষ কি সত্যিই বেঁচে আছে?
নাকি এগুলো বেঁচে থাকার অভিনয়।
মৃত্যুসম জীবনকে নিয়ে মানুষ বাহাদুরি করছে
অথচ চোখ বুজলে সবই এলোমেলো।
বিবেকের দরজা কি আজ আদৌ খোলা আছে
নাকি একান্ত নিজস্ব ভ্রান্তি এগুলো?
ভয়টা চৌকাঠে আটকে দেখো সামনে কী আছে
চৌকাঠ পার হলেই দেখবে আলো।

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন