এক নেতার জন্ম
সেদিন ছিল চৈত্রের এক বিস্ময়াভিভূত বিকেল
সতেরোই মার্চ উনিশ শ কুড়ি
সূর্য যখন আকাশতলে ডুবেছিল মাত্র
দিগন্তে যখন অকস্মাত্ জ্বলে উঠেছিল সোনালি হরিদ্রাভ রং
তৃণভূমির ওপর দিয়ে যখন অস্তগামী সূর্য অবলীলায়
দান করেছিল বৃক্ষলতার অমরাবতী-রূপ
আকাশ থেকে তখন অস্ফুটে ঝরছিল সোনাঝরা আলো
তারাদের দল আয়োজনে ব্যস্ত ছিল মিটিমিটি হাসতে।
মলয় বাতাসের দল বয়ে যাচ্ছিল শান্ত-বিভবে
এক শ্বেতবিহগ খোশমেজাজে ফিরে এসেছিল তার শান্তির নীড়ে
তৃণদলে ঝরেপড়া বিকেলের এক ফোঁটা শিশিরে গলা ভিজিয়ে
চারদিকে চকিতে চোখ বুলিয়ে
মখমল কোমল মাথাটিকে দুলিয়ে দুলিয়ে
সে ফিসফিস শব্দ তোলে বাতাসে—
আমি শুনেছি এক অধিপতি আজ আসছেন এ ধরায়
আমি দিন গুনি তাঁর জন্য।
নৈঃশব্দের নিনাদের মাঝে ঘুরপাক খায় সেই ফিসফিসানি—
রাজাধিরাজ আসছেন আজ, আমি প্রহর গুনি তাঁর জন্য।
আকাশজুড়ে ধায় বেগে অমল ধবল মেঘ
যায় বয়ে যায় একে একে
বাইগার আর মধুমতীর জল বইছিল শান্ত সমাধিত ধারায়।
সেদিনের সন্ধ্যালোকে যেন স্পন্দিত হচ্ছিল অগুনতি হূদয়
দখিনা বাতাস বইছিল অপার আনন্দে
বিশ্ব চরাচরজুড়ে ছিল এক অব্যক্তেয় উচ্ছ্বাস
আর অপূর্ব আনন্দলোকের
দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ছিল এক অপার্থিব সুর
রূপালি চাঁদ আর রৌপ্যবত্ বালুরাশির মধ্যে যেন ঝংকৃত হচ্ছিল
অনাদি এক সংগীতায়োজন
আনন্দের এক অনুচ্চ ফল্গুধারা যেন দোল খাচ্ছিল মৃদুমন্দ হাওয়ায়।
আর এভাবেই ত্রিলোকজুড়ে যেন ছড়িয়ে পড়ছিল
এক আশা জাগানিয়া ফিসফিসানি—
রাজাধিরাজ আসছেন আজ।
অতঃপর এলো রাত
টলটলে জলের মতো স্বচ্ছ সেই গ্রীষ্মের রাত
খেয়ালি হাওয়া হয়ে ওঠে উচ্ছল আর আনন্দ-চঞ্চল
অসংখ্য রহস্যভরা নক্ষত্ররাজি আরো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে
আর সেসবের মাঝে এক অপূর্ব আভাসের স্রোত বয়ে যায় বাতাসে
আসছেন এক ত্রাতা—যাঁর ছোঁয়ায় জেগে উঠবে এক নীরব ব-দ্বীপ।
অবশেষে তিনি এলেন, জন্ম হলো এক নতুন যুগের
টুঙ্গিপাড়ার ছোট্ট কুটির হতে তিনি আবির্ভূত হলেন
তিনি এলেন লীন হাতে নিয়ে লাল-সবুজ পতাকা
তিনি এলেন অব্যক্ত ওষ্ঠে নিয়ে স্লোগান
তিনি এলেন মুঠোবদ্ধ হাতে নিয়ে কবিতা
প্রভাদীপ্ত বসুমতি হেসে ওঠে অপূর্ব উল্লাসে।
আমি আছি যেখানে—
তোমাদের ভেতরে আমি রয়ে যাব যুগ যুগ ধরে
তোমাদের সঙ্গে থাকব আমি যুদ্ধের দামামায়, শান্তির অমরাবতীতে।
সবুজ তৃণদলের মতো আমি ছড়িয়ে থাকব সমগ্র বাংলাদেশে।
আমি সেই অঙ্কুর, যা কি না প্রস্ফুটিত হবে আগামী সকালে
আমি সেই অনিন্দ্যসুন্দর বিহগ, যার কুজন যেন অপূর্বশ্রুত গান!
আমি সেই সোনালি ফসলের পেকে-ওঠা শস্যকণা
আমি সেই মৃদুমন্দ মলয় বাতাস,
যা তোমাদের শ্রান্ত প্রাণ জুড়িয়ে দেয় অপূর্ব পরশে।
বুড়িগঙ্গায় আমি মিশে আছি প্রতিটি ঢেউয়ের দোলায়
অঝোর বর্ষণের প্রতিটি জলকণায় মিশে আছি আমি বিন্দু হয়ে।
অন্ধকার চূর্ণ করা ভোরের নিস্তব্ধতায় মিশে আছি আমি অনিঃশেষ আবেশে
গোধূলির গহিন নীরবতায় ত্রসরেণুর মতো হয়ে মিশে আছি আমি।
করুণার অপূর্ব ফল্গুধারার ভেতরে আমি থাকব তোমাদেরই সাথে,
বিভীষিকাময় কৃষ্ণরাতেও আমি জেগে রবো তোমাদেরই হূদয়ে।
ব্রাহ্মমুহূর্তের প্রথম রবিকর আমি, রাতের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক।
পলিমাটি, নুড়িপাথর অথবা নদীর কলতান ছেয়ে
বৃক্ষের সালোকসংশ্লেষণে আমি মিশে আছি সমগ্র বাংলাদেশে।
স্বাধীনতার দুর্বার যুদ্ধে আমি শানিত করেছি তোমাদের,
মুক্ত করেছি আবহমান দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে।
আমার অঙুলি হেলনে রচিত হয়েছে মুক্তির প্রথম পঙিক্ত।
রাজনীতির মহাকবি আমি—
বিপ্লবের ইশতেহার লিখে দিয়েছি অবিনাশী কালিতে।
আমি গ্রাহ্য করি না কাউকে, ঈশ্বর ছাড়া।
শান্তিময় জীবন নির্মাণের অবিসংবাদিত দূত আমি।
তবে অশান্তি সৃষ্টিকারী দুষ্টের দমনে আমি
হাতে তুলে নিতে দ্বিধা করি না বিধ্বংসী ধ্বংসাস্ত্র।
সুতরাং কেউ যদি ভাবে আমাকে ছাড়াই লেখা হবে ইতিহাস—
তাহলে সে এমন এক অন্ধ—
যে কি না নির্বোধের মতো মনে করে—সে দেখতে পায়!
বাংলাদেশের পতাকা আমি
বাংলাদেশের পতাকা আমি
অবিনশ্বর প্রতীক আমি আরাধ্য স্বাধীনতার
অবারিত মুক্তি আর নীতি-ন্যায়পরতার প্রতিমূর্তি আমি।
আমার লাল আর সবুজে প্রতিফলিত হয়
স্বাদেশিক আদর্শ আর গৌরবময় জাতীয় বোধ
আমার রক্তিম উদ্ভাস রাঙিয়ে দেয় অপার আবেগের পুণ্যভূমি।
একাত্তরে যে রুধিরধারা ঝরেছিল এ বদ্বীপজুড়ে
সেই রক্তের লালচে আভা প্রতিফলিত হয় আমার পতাকায়।
অকুতোভয় পরাক্রম আর দেশবাসীর অখণ্ড ঐক্য আমি।
আমি ধারণ করি শান্তি, সম্মান, শুভ্রতা আর নির্মলতাকে
আমি বাস করি সত্য-সততা আর মর্যাদালোকে।
ন্যায়বিচার, গৌরব আর মানসশক্তির পরাকাষ্ঠা আমি।
এমন সব পরিচয়েই আমি ব্যাপ্ত হই বিশ্বময়।
আমার অবস্থান গণতন্ত্র আর সমাজতন্ত্রে,
নিরপেক্ষতা আর সমতার সাম্যলোকে।
আমি বাঙালি, সৃষ্টিকর্তা ছাড়া নত হই না কারো কাছে।
মুক্তির বীজ আমি বুনে গেলাম,
স্বাধীনতা আর আশার তরি আমি ভাসিয়ে গেলাম,
জীবনের প্রতিটি সমরে মানুষ খুঁজে পাবে আমাকে
অনুপ্রাণিত হবে অটল সাহসে।
জাতির অখণ্ডতা আর ঐক্যের প্রতীক আমি,
আমার প্রতিটি সংগ্রাম ছিল এই পতাকার জন্য
সাতই মার্চ আমি গর্জে উঠেছিলাম এই পতাকার জন্য
মুক্তির শাশ্বত আত্মা আমি
আমার আলোকশিখা ম্লান হবে না কখনো
গগনলোকে চির উন্নত রবে এই অনির্বাণ জ্যোতি।
ভাষান্তর: তাপস কুমার দত্ত
[বরেন চক্রবর্তীর কবিতার বই A Nation Confesses (অবসর, ২০১৪) থেকে প্রকাশিত A Leader Was Born, I Am Every Where, I am the flag of Bangladesh শিরোনামের তিনটি ইংরেজি কবিতার সংক্ষেপিত ভাবানুবাদ]

