জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ এবং লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ নাম্বারপ্রাপ্ত ও স্বর্ণপদকজয়ী শিক্ষার্থীদের বাদ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে উপাচার্য বলছেন, শিক্ষক নিয়োগে বিভাগের ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ১০ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত সিন্ডিকেট সভায় ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ এবং লোক প্রশাসন বিভাগে মোট ছয় জনকে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগে ৩৯তম ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী ইরতিফা আলম নাবিলা, ৪৩তম ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী জান্নাতুল হুসনা তুয়া ও ৪৪তম ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী অশরাফুল হাবিব নিয়োগ পেয়েছেন। এর মধ্যে ইরতিফা আলম নাবিলা ও আশরাফুল হাবিব বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মো. শাহেদুর রশিদের প্রার্থী। আর জান্নাতুল বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক খন্দকার হাসান মাহমুদের প্রার্থী। তবে খন্দকার হাসান মাহমুদ বিভাগের সভাপতি মো. শাহেদুর রশিদের অনুসারী বলে পরিচিত। অথচ সর্বোচ্চ নাম্বার পাওয়া ও সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের হাত থেকে ‘শরফুদ্দীন স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত’ দুই শিক্ষার্থীকে ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। তারা হলেন, বিভাগের ৪২তম ব্যাচের কামরুন নাহার ও ৩৬তম ব্যাচের তমা রানী সাহা। তাদের মধ্যে, কামরুন নাহার বিভাগের বিএনপিপন্থি শিক্ষক অধ্যাপক মো. নূরুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে স্নাতকোত্তরের থিসিস করেছেন। ফলে প্রথমে কামরুন নাহারকে সাক্ষাত্কারের জন্য ডাকা হয়নি। পরে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে জানাজানি হলে বিতর্ক তৈরি হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘শিক্ষকদের রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে শিক্ষার্থীদের ভূগতে হচ্ছে। যখন যে শিক্ষক বিভাগের সভাপতির দায়িত্বে থাকেন, তখন তিনি তার পছন্দের শিক্ষার্থীদের প্রাধান্য দেন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া ‘আইওয়াশ’ ছাড়া আর কিছুই না। কাদের নিয়োগ দেওয়া হবে, তা আগেই ঠিক করা থাকে।’
ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক মো. নূরুল ইসলাম বলেন, ‘স্বর্ণপদকজয়ীদের বাদ দিয়ে নিজের পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দিয়েছেন বিভাগের সভাপতি। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র আমার তত্ত্বাবধানে স্নাতকোত্তরের থিসিস করায় একজনকে বঞ্চিত করা হয়েছে। যদি আমার তত্ত্বাবধানে থিসিস করা কোনো শিক্ষার্থীর অপরাধ হয়, তাহলে আমি আর কোনো শিক্ষার্থীকে থিসিস করাব না।’
তবে ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সভাপতি শাহেদুর রশিদ বলেন, ‘এটা নিয়োগ বোর্ডের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত। সদস্যরা যাদেরকে যোগ্য মনে করেছেন, তাদেরকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছেন।’ তবে একজন প্রার্থীকে সাক্ষাৎকারের জন্য না ডাকার বিষয়ে প্রশ্ন করতে গেলে ফোন কেটে দেন তিনি।
অন্যদিকে, লোক প্রশাসন বিভাগে ৪২তম ব্যাচের ছন্দা খাতুন, ৪৩তম ব্যাচের ফাইরুজ আনিকা ও ৪৪তম ব্যাচের রিফা তাসফিয়াকে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে, ছন্দা ও রিফা তাসফিয়া বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মো. নুরুল আমিনের প্রার্থী। এছাড়া ফাইরুজ বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মুহাম্মদ ছায়েদুর রহমানের প্রার্থী ও একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহফুজুর রহমানের স্ত্রী। আবার ছায়েদুর রহমান বিভাগের সভাপতি নুরুল আমিনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।
অথচ স্বর্ণপদকজয়ী লোক প্রশাসন বিভাগের ৩৯তম ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী জাকিয়া হোসেন দ্যুতিকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তুলনামূলক যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে কম যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ বাতিলের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) চিঠি দিয়েছেন বিভাগের ৪২তম ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী জান্নাত আরা।
এ বিষয়ে জানতে লোক প্রশাসন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মো. নুরুল আমিনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. নূরুল আলমকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে এর আগে তিনি বলেছিলেন, ‘বিভাগের ফলাফলে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। স্বর্ণপদকজয়ী সবাইকে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, তবে তাদের মধ্যে একবারেই কাউকে নেওয়া হচ্ছে না তেমন না।’ এছাড়া স্বশরীরে সাক্ষাতে ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের একজন প্রার্থীকে সাক্ষাৎকারের জন্য না ডাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। তবে আমি জানতে পেরেই ঐ প্রার্থীকে সাক্ষাতকার নেওয়ার ব্যবস্থা করেছি।’
