বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের গণতন্ত্রের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিমুখী নীতি

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৩, ১৭:৩০

বাংলাদেশের অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে যারা বাধা সৃষ্টি করবে তাদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার ঘোষণা দিয়ে দেশটিকে গণতন্ত্র প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে উঠে পড়ে লেগেছে যুক্তরাষ্ট্র। অথচ পাকিস্তানের মতো সামরিক শাসনে জর্জরিত একটি দেশ যেখানে গণগ্রেপ্তার, গুম ও নির্যাতনের মতো ঘটনাকে নিত্যদিনের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পরিণত করা হয়েছে সে দেশের ব্যাপারে নীরব বাইডেন প্রশাসন। এখানেই আমেরিকার দ্বিমুখী নীতির ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু কেন এই দ্বিমুখীতা?

এক কথায় এর উত্তর হলো, যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নির্দিষ্ট। তারা কেবল ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে যেদেশের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে সেসব দেশের ক্ষেত্রেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নীতি গ্রহণ করে থাকে। এমনকি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা এখন মার্কিন নীতি নির্ধারকদের কাছে জনপ্রিয় অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাইডেন প্রশাসন দুটো বিষয়কে কাজে লাগাতে চাইছে। প্রথমত, অধিকাংশ বাংলাদেশি রাজনীতিবিদদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা যুক্তরাষ্ট্র বা ব্রিটেনে বাস করে, যার মধ্যে আমেরিকান গ্রিন কার্ডধারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ও রয়েছে। দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের রপ্তানির সিংহভাগই যায় পশ্চিমা দেশগুলোতে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজার।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের বক্তব্য ছিল ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ‍ও নিরপেক্ষ করাই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য। এ বিষয়ে আপত্তি জানানোর সুযোগ নেই। তবে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য সুষ্ঠু নির্বাচনে বাধা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি তাদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য খুব একটা সহায়ক হবে না। বরং হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 

এদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতি ও প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা এবং দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত এপ্রিলে সংসদে বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার দেশের শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার পাঁয়তারা চালাচ্ছে। তারা দেশের গণতন্ত্রকে হটিয়ে এমন এক সরকারকে ক্ষমতায় আনতে চাইছে যাদের মধ্যে গণতন্ত্রের কোনো অস্তিত্বই নেই। আমেরিকার এ ধরণের পদক্ষেপ হবে একটি অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ।

২০০৯ সাল থেকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে একটি ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন যা বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা ঘৃণার চোখে দেখছে। তিনি দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছেন। তবে বর্তমানে দেশটির অর্থনীতিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব বিদ্যমান। 

পাকিস্তানের দেউলিয়ার দ্বারপ্রান্তে থাকা অর্থনীতির তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং রাজনীতি অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করেছে। এতকিছুর পরেও ২০২১ সালে এবং চলতি বছর আয়োজিত গণতন্ত্র সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানায়নি বাইডেন প্রশাসন। তবে তারা অঘোষিত সামরিক শাসনে জর্জরিত পাকিস্তানকে ঠিকই আমন্ত্রণ জানিয়েছে, যদিও পাকিস্তান এতে যোগ দেয়নি। 

স্বল্পমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাইডেন প্রশাসন পাকিস্তানকে পুরস্কৃত করার বিপরীতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সমালোচনা করে আসছে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের এলিট ফোর্স র‌্যাবের ছয় সদস্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তারা দেশে মাদক ও জঙ্গিবাদ দমনে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র এই ফোর্সের ছয় সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনে। 

এদিকে গতবছর ডিসেম্বরে, বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস কর্তৃপক্ষের কাছে বাংলাদেশ পুলিশ এবং কট্টরপন্থী ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনকারী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) একটি সংঘর্ষের তদন্ত করার দাবি জানান। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন সুশীল সমাজকে ভয় দেখানো এবং রাজনৈতিক সহিংসতার ব্যাপারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেনের কাছেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। 

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের ভিসা-নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি স্পষ্টতই শেখ হাসিনা সরকারের আইন প্রয়োগকারী ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের উদ্দেশ করে করা হয়েছে যদিও এটি ঘোষণার সময় বিরোধী দলের সদস্যদের কথাও উল্লেখ ছিল। কিন্তু বিদেশি কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা কূটনীতিকে বাধাগ্রস্ত করা ছাড়া আর কোনো ভূমিকাই রাখতে পারে না। এর ফলে অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিও সৃষ্টি হতে পারে।

জুন মাসের শুরুর দিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব লয়েড অস্টিন চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জেনারেল লি শাংফুকে সিঙ্গাপুরে বৈঠকের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু লি শাংফু ওয়াশিংটনের এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ পাঁচ বছর আগে ওয়াশিংটন তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র গমনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। 

এছাড়া ২০২১ সালে মিয়ানমারে ক্ষমতা দখল করে জান্তা সরকার। এরপর সামরিক বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ মিন অং হ্লাইং এবং অন্য তিনজন সিনিয়র কমান্ডারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এই নিষেধাজ্ঞা তাদের ওপর কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। বরং দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও জটিল হয়েছে এবং চীনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে জান্তা সরকার।

মিয়ানমার, ইরান, বেলারুশ ও কিউবাতেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা রাজনৈতিক কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। বিশ্বে আমেরিকার প্রভাব কমে যাওয়া এবং পশ্চিম থেকে প্রাচ্যে বৈশ্বিক ক্ষমতার চলমান পরিবর্তন মার্কিন নেতৃত্বাধীন নিষেধাজ্ঞাগুলোর কার্যকারিতা বরং আরও কমিয়েছে। তবে তারা এখনো ডলারের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী আর্থিক আধিপত্য ধরে রাখতে পেরেছে। এ কারণেই নিষেধাজ্ঞার মতো পন্থাকে বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করছেন মার্কিন নীতিনির্ধারকরা।

ঢাকার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এমন কঠোরতার গুরুতর কোনো মানে নেই। শেখ হাসিনার সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ এবং এশিয়ার নিরাপত্তা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে। বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে আলোচনার জন্য গত মাসে যখন শেখ হাসিনা ওয়াশিংটনে গিয়েছিলেন তখন বাইডেন প্রশাসনের কেউ তার সঙ্গেও দেখা করেনি।

জবরদস্তি করে বিশ্বের সপ্তম জনবহুল দেশের নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার বিষয়ে সহায়তা করা তো অনেক দূরের কথা, ১৯৭১ সালে যখন ইসলামাবাদ থেকে দেশটি স্বাধীনতার জন্য লড়ছিল তখন কোথায় ছিল মার্কিন নীতি। তারা তো ঠিকই পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল যারা বাঙালিদের ওপর নির্যাতনের স্ট্রিম রুলার চালিয়েছিল এবং ৩০ লাখ মানুষ পাকিস্তান আর্মির নির্মম গণহত্যার শিকার হয়েছিল?

লেখক: নয়াদিল্লির সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের প্রফেসর এবং ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক উপদেষ্টা। তিনি ‘ওয়াটার: এশিয়াস নিউ ব্যাটলগ্রাউন্ড’সহ ৯টি বইয়ের লেখক।

ইত্তেফাক/এসএটি