ভোটের আগে মাঠে সক্রিয় একাধিক জঙ্গি সংগঠন

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৩, ২১:৪১

দেশে থেমে থেমে জঙ্গি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটছে। একেকটি জঙ্গি সংগঠন নিষিদ্ধ করার পরপর আরেকটি জঙ্গি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এসব জঙ্গি সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে ভার্চুয়ালি (অনলাইন) যুক্ত। অনলাইনে ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও টেলিগ্রাম অ্যাপস বা অন্যকোনো নতুন অ্যাপসের মাধ্যমে ছদ্মনামে তারা প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। অনলাইনে প্রচারণা চালানোর পর তারা যখন বাস্তবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ছে। 

সম্প্রতি জামায়াতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া নামে একটি জঙ্গি সংগঠনকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পরপরই ‘ইমাম মাহমুদের কাফেলা’ নামে আরেকটি জঙ্গি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। ভারত উপমহাদেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল কায়েদার নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারী দাবিদার ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ নামের অনলাইনভিত্তিক সংগঠনটির সঙ্গে জামায়াতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া ও ইমাম মাহমুদের কাফেলার যোগাযোগ ছিল বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তদন্তে তথ্য পেয়েছে।

এর আগে ২০০৪ সাল থেকে চলতি বছরের ১২ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ১০টি জঙ্গি সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সংগঠনগুলো হলো শাহাদত-ই-আল হিকমা, হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ(হুজিবি), জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ ( জেএমবি), জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ ( জেএমজেবি), আনসার আল ইসলাম, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, হিযবুত তাহরীর, আল্লাহর দল, নব্য জেএমবি এবং জামায়াতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া। 

এ বিষয়ে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান ডিআইজি আসাদুজ্জামান বলেন, মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় ইমাম মাহমুদের কাফেলা নামে জঙ্গি সংগঠনের প্রধানসহ ৩৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই সংগঠনটি সম্পূর্ণ পৃথক একটি জঙ্গি সংগঠন। এটির কার্যক্রম ২০১৮ সাল থেকে গোপনে পরিচালনা করা হচ্ছিল। এরা যখন প্রকাশ্যে এসেছে তখনই সিটিটিসি এদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। 

জাতীয় নির্বাচনের আগে এরকম জঙ্গি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ জনমনে ভীতির সঞ্চার করবে কী না? এমন প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি আসাদুজ্জামান বলেন, সম্প্রতি জামায়াতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া নামে যে জঙ্গি সংগঠনটি নিষিদ্ধ হয়েছে সেটির কিন্তু কার্যক্রম ২০১৯ সাল থেকে চলমান ছিল। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এসব জঙ্গি সংগঠনের উদ্ভব এমন সংশ্লিষ্টতা তদন্তে মেলেনি। 

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, সম্প্রতি জামায়াতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া নামের জঙ্গি সংগঠনটিকে শনাক্ত করা না গেলে, এই সংগঠনটিই নির্বাচনের মাঠে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করত। কারণ এ ধরনের জঙ্গি সংগঠন প্রকাশ্যে আসার উদ্দেশ্য থাকে যে একটা সুনির্দিষ্ট সময়ে আন্তর্জাতিক মহলে জানান দেওয়ার জন্য। উপমহাদেশের অনলাইনভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’র সঙ্গে জামায়াতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার যোগাযোগ ছিল। এই সংগঠনটি এতটাই ভয়ঙ্কর ছিল যে এদের সঙ্গে আমাদের পার্বত্যাঞ্চলের কুকি-চিনেরও চুক্তি হয়েছিল। এই কুকি-চিনের কার্যক্রমকে ধ্বংস করতে আমাদের সেনাবাহিনীর সদস্যরা প্রাণ দিয়েছেন। 

ইমাম মাহমুদের কাফেলা নামের নতুন জঙ্গি সংগঠনটি সম্পর্কে র‌্যাবের কর্মকর্তা খন্দকার আল মঈন বলেন, এই সংগঠনের প্রধানসহ ৪ জন ২০২০ সালে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিল। তার আগে পুলিশের হাতেও গ্রেপ্তার হয়েছিল। তার অর্থ এই যে এরা গ্রেপ্তারের পর জামিনে ছাড়া পেয়ে আবারো জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। তবে অনলাইনে এসব জঙ্গি সংগঠনের কার্যক্রম শতভাগ বন্ধ করা সম্ভব না। শনাক্ত করার পরই তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।  

বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে হলি আর্টিজানের পর ব্যাপক অভিযানের ফলে জঙ্গি সংগঠনগুলো দুর্বল হয়ে গেলেও মাঝেমধ্যেই এরা নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে প্রকাশ্যে কার্যক্রম চালাচ্ছে। 

সিটিটিসি সূত্র জানায়, ইমাম মাহমুদের কাফেলা জঙ্গি সংগঠনের প্রধান জুয়েল মাহমুদ ওরফে কমান্ডার মেন্দি ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ প্রতিষ্ঠায় কুলাউড়ায় আস্তানা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। তাদের মতে, ইমাম মাহাদীর আগে এই যুদ্ধের নেতৃত্ব তার হাতে থাকবে। প্রচারণায় অনলাইনে মগজ এমনভাবে ধোলাই করা হচ্ছে যে তারা কথিত জিহাদে গিয়ে ‘শহীদ হওয়ার জন্য’ মরিয়া হয়ে উঠছে। বিষয়টি তারা তাদের নিকট আত্মীয় যেমন মা, বাবা, স্বামী ও সন্তানদের সঙ্গেও শেয়ার করছেন না। শুধু অনলাইন প্লাটফরমে তারা তাদের মতাদর্শ নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছে।

মানবাধিকার কর্মী ও জঙ্গি বিষয়ক বিশ্লেষক নূর খান বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেভাবে শক্ত হাতে জঙ্গিদের দমন করতে, তাতে তাদের বড় ধরনের হামলা চালানোর সক্ষমতা আছে বলে আমি মনে করি না।

ইত্তেফাক/এবি