শহুরে ব্যস্ততার কারণে দূরে যাওয়া হয় না অনেকেরই। কিন্তু মনটা হাসফাস করে সোদা মাটির গন্ধ পেতে। প্রাণ খুলে হাসতে ইচ্ছে করে প্রকৃতির সান্নিধ্যে। কখনো-বা একাকি বসে থাকতে ইচ্ছে করে নদীর ধারে। তার পরেও যাওয়া হয় না শুধুমাত্র যাপিত জীবনের ব্যস্ততার কারণে। প্রতিনিয়ত ইচ্ছেগুলো পিষ্ঠ হয় শহুরে কংক্রিটের চার দেয়ালে। যা একসময় জীবন মানে যন্ত্রণা এরকমটিই ভাবতে শিখায়। জীবন মানে যন্ত্র নয়, জীবন হলো মন্ত্র। আর এই মন্ত্রের সূত্র জানানোর জন্যই লিখেছি আজকের এই ভ্রমণ গল্প।
নেই যাদের সময়, তাদের জন্য এবার দিনে দিনেই হবে মিঠাই আর খই। যাদের নেই মোটরবাইক কিংবা প্রাইভেট গাড়ি তারা চলুন গুলিস্তান কিংবা গাবতলী। সেখান থেকে সাভারগামী বাসে চড়ে নেমে যান সাভার থানা বা বাজার বাসস্ট্যান্ড। মানুষ বেশি হলে অটো আর না হলে রিক্সায় চড়ে যাবেন নামাবাজার ব্রিজ। ব্রিজের গোড়া হতে ভাড়ায় খাটা মটরবাইক কিংবা টমটমে কাজিয়ালকুন্ড। এ গ্রামের বুক চিরে সদ্য পিচ করা সড়ক চলে গেছে একেবারে ঢুঁলি ভিটা পর্যন্ত।
সড়কের দুপাশে থাকা বৃক্ষের মৃদু হাওয়ার মায়াবি দোল, বর্ষার পানির ছলাত্ ছলাত্ শব্দে আপনার মন হারাবে অজানায়। গরুর দুধের এক কাপ মলাই চা পান করে চলে যান আড়ালিয়। খেয়ায় ধলেশ্বরী নদী পার হয়ে গ্রামের সবজি ক্ষেতের আল ধরে চলে যান বড়দাইল গ্রামে। দেখবেন কিভাবে কতটা পরিশ্রম করে শহুরে বাবুদের রসনা মিটানোর জন্য গ্রামটির বউ-মেয়েরা মুড়ি ভাজছে। এছাড়াও গ্রামটি খুব সুন্দর। যাকে বলে বাংলার খাঁটি রূপ।
এরপর আসুন আবারো ফোর্ডনগর ব্রিজ পার হয়ে চলে যাই পঞ্চবটি আশ্রম। সেখানে গ্রাম্য পদ্ধতিতে তৈরি মিঠাই, মুড়লী আর খই চিবিয়ে সাভার বাজার স্ট্যান্ড হতে যোগেসের দই চেটে চলে যাবেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। সম্ভব হলে হেঁটে হেঁটে, না হলে ভ্যানে চড়ে দৃষ্টিনন্দন পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে বটতলায় দুপুরে ভাত-ভর্তা দিয়ে উদর পূর্তি করে অটোয় করে চলে যান সিএন্ডবি সড়ক ধরে শ্যামপুর গোলাপ গ্রামে। হাজার হাজার গোলাপের মাঝে নিজেকে কিছুটা সময় বিলিয়ে দিয়ে, সবুজে বারোভাজা খেতে খেতে চলে যান এবার বিরুলিয়া জমিদার বাড়ি।
বিরুলিয়া যাওয়ার সময় পথের সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে একাকি গলা ছেড়ে গাইতে ইচ্ছে করবে পাগলা হাওয়ার তরে। গাইতে গাইতে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে যাবেন জমিদার রজনী কান্ত ঘোষের বাড়িতে। বাহির থেকে প্রথম দেখায় নিরাশ হবেন না। কিংবা কারো বারণ শুনে চলেও আসবেন না। চলে যাবেন বাড়ির ভিতরে। এবার দাঁড়ান কিছুক্ষণ উঠোনে। দেখবেন ধীরে ধীরে আপনার মাথায় কিছু একটা ভর করছে। কি, ভয় পেলেন? আরে নাহ, তেমন কিছু না। জাস্ট অন্দরমহল দেখার নেশা জাগবে। নেশার পারদ যখন চরমে তখন ভিতরে ঢোকা আর ঠেকায় কে?
স্থানীয় কিশোর মঞ্জুকে সঙ্গী করে প্রথমে অন্দর মহলে ঢুকি। এরপর একেবারে চিলেকোঠা পর্যন্ত ঘুরে দেখি। জমিদার বাড়িটিতে মোট ১১টি স্থাপনা রয়েছে। লোক মুখে জানতে পারি, বর্তমানে দুটি হিন্দু পরিবারের বসবাস রয়েছে। তারা নাকি জমিদারের বংশধর। কিন্তু আমার তা মনে হয়নি! আমরা যে স্থাপনাটিতে ঢুকেছি তা পুরোই ফাঁকা। ঘরের মেঝ, সিলিং, দরজা, জানালায় এখনো পুরানো দিনের আভিজাত্য দৃশ্যমান। নেই শুধু পাইক-পেয়াদাদের হাঁকডাক। কিংবা বাঈজির নুপূরের আওয়াজ।
দেখতে দেখতে দোতলা পেরিয়ে ছাদ। এরপর চিলেকোঠায়। বাহ্, আজ আর নেই কোনো জমিদারের নিরাপত্তারক্ষীর হুঙ্কার। নেই কোনো বাধা। ইচ্ছেমত ছাদ থেকে পুরো বাড়ি ও তার আশপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখলাম। বাড়িটি তুরাগের তীরে। বর্ষায় যার রূপ-যৌবন অনেকটাই ফিরে আসে।
এ বাড়ির পূর্ব মালিক ছিলেন জমিদার নলিনী মোহন সাহা। তার কাছ থেকে ৮ হাজার ৯৬০ টাকা ৪ আনা দিয়ে জমিদার রজণী কান্ত ক্রয় করেছিলেন। বাড়িটিতে রয়েছে বেশ কয়েকটি মন্দির, সদর ঘর, বিচার ঘর, সাজঘর, বিশ্রামাগার, পেয়াদা ঘর, ঘোড়াশাল। ১৯৬৪ সালের দাঙ্গার সময় রজনী কান্ত ঘোষের স্মৃতিসহ মূল্যবান অনেক কিছুই লুট হয়ে যায়। শুধু লুট হতে পারেনি জমিদার রজনী কান্তের নাম। ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোতে ঘুরতে গেলে মনের ভেতর এক ধরনের নস্টালজিয়া কাজ করে।
পুরো বাড়িটি ঘুরে এবার গিয়ে উঠলাম কোষা নৌকায়। তুরাগের পানিতে প্লাবিত বিলে নৌকা ভাসে। চারপাশের অনেক গ্রাম মূল ভূখন্ড হতে বিচ্ছিন্ন। যা আপনাকে হাওর ভ্রমণের আনন্দ দিবে। ভাসতে ভাসতে বিচ্ছিন্ন এক বট বৃক্ষের ছায়ায় নৌকা ভিড়াই।
বিরুলিয়ার নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা লিখে বোঝানো সম্ভব নয়। শুধু এতটুকুই লিখব— ঢাকার আশপাশ থেকেও যারা এখনো বিরুলিয়া দেখেননি, তারা যেন সুখময় জীবনের খোঁজই পাননি।
চলুন তবে
মোটরবাইক অথবা সাইকেলে ভালো। গুলিস্তান, গাবতলী সহ ঢাকার অনেক বাস স্টপেজ হতেই সাভার যাওয়া যায়।
খরচপাতি
পরিবহন খরচ খুব বেশি নয়। আর অন্যান্য খরচ নিজের চাহিদামত।
ভ্রমণ তথ্য
এ লেখায় উল্লেখিত জায়গাগুলোতে বছরের সব মৌসুমেই প্রকৃতি তার নানা রূপের পসরা মেলে ধরে।
