১৫ আগস্টের শকুনের ছায়া দেখি ২১ আগস্টের বাংলাদেশে

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৩, ১৪:২৫

বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি আর অসাম্প্রদায়িকতা এই চারটি শব্দকে হত্যা করার জন্যই বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার দিকে গ্রেনেড ছুড়েছিল ঘাতকেরা। ১৫ আগস্টের বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতাই ছিল ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকার শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা। শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলও সে দিনের হামলায় নিহত হন ২৪ জন। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হত্যা, তথ্যপ্রমাণ নষ্ট, হত্যাকারীদের আড়াল করতে এর পর সাজানো হয় জজ মিয়া নাটক। এই প্রতিটি আয়োজনই ছিল বাংলাদেশে সন্ত্রাসের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য। ২১ আগস্ট বাঙালিকে আবার মনে করিয়ে দেয় — 'বাংলাদেশ শুধুমাত্র একটা রাষ্ট্র নয়, বাংলাদেশ একটি দর্শন'।

আগস্ট যেন বাংলাদেশের জন্য এক চরম বিপর্যয়ের মাস। সেই যে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার নৃশংস ঘটনা, তারপর একে একে ভয়াল বিপর্যয় নিয়েই এসেছে আগস্ট। মুক্তিযুদ্ধবিজয়ী এই রাষ্ট্রকে পেছনের দিকে ঠেলেছে আগস্ট। বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়ে প্রগতিশীল বাংলাদেশ যে অন্ধকার পথে ধাবিত হয়েছিল, সেই বাংলাদেশকে অন্ধকার থেকে পরিপূর্ণ আলোতে আর কখনও আনা যায়নি। যায়নি বলেই সামরিক শাসন, মৌলবাদ- জঙ্গিবাদ তথা ধর্মান্ধতার সন্ত্রাস থেকে আজও মুক্ত হয়নি মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনার রক্তফসল এই দেশ।

পৃথিবীর বহু দেশে যুগে যুগে সরকারপ্রধান তথা রাষ্ট্রপ্রধান নিহত হয়েছেন ঘাতকের হাতে কিংবা অভ্যুত্থানে, কিন্তু তাতে কোনো রাষ্ট্রেরই মৌলিক দর্শন পরিবর্তিত হয়ে যায়নি, শুধু আমূল পরিবর্তন ঘটেছে মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের।

যে ধর্মান্ধতা, সামরিকতন্ত্র আর মৌলবাদের বিরুদ্ধে, শাসন- শোষণের বিরুদ্ধে ২৩ বছর লড়াই করে বঙ্গবন্ধু তার জনগণকে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন এবং লাখ লাখ শহিদের রক্তের বিনিময়ে একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজতান্ত্রিক দর্শনের কৃষক-শ্রমিকের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই রাষ্ট্র বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে একেবারেই বিপরীত পথে যাত্রা করে!

পতাকা আর নামটি ছাড়া পঁচাত্তরের পরের বাংলাদেশ যেন পাকিস্তানেরই আরেক সংস্করণে পরিণত হয়! বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আসার পর বাংলাদেশকে তার হারানো মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় পথে ফেরানোর চেষ্টা আবার শুরু হয়। সে চেষ্টা সাফল্যের মুখ দেখে ১৯৯৬ সালের জুনে, আওয়ামী লীগের সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে।

দীর্ঘ ২১ বছর পরে গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল চিন্তার পথ ধরে বাংলাদেশ পরিচালিত হলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র চলতেই থাকে। সেই ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায়ই বার বার শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। গত ৪০ বছরে প্রায় ১৯ বার শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে।

এই হত্যা পরিকল্পনা বাস্তবায়নেরই চূড়ান্ত অপচেষ্টা হয়েছিল ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট।

নিয়মতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ক্ষমতাসীন দল কর্তৃক স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী সেই সময়ের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে জঙ্গি হামলার দ্বিতীয় কোনো উদাহরণ বিশ্বের কোনো প্রান্তে আছে বলে আমাদের জানা নেই। উপমহাদেশের খুনের রাজনীতি থেকেও ২১ আগস্টকে আলাদা করা যায়। ইন্দিরা হত্যাকাণ্ডে  উগ্র শিখ সম্প্রদায়, রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ড ও চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা হত্যাচেষ্টায় এলটিটিই, পাকিস্তানের  জিয়াউল হক হত্যাকাণ্ডে সামরিক বাহিনী  জড়িত ছিল। 

বাংলাদেশে ২১ আগস্ট হামলার আগে-পরে যত জঙ্গি হামলা হয়েছে, তার বেশির ভাগেরই উদ্দেশ্য ছিল ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে আঘাত করা। সাংস্কৃতিক কর্মী, রাজনৈতিক কর্মী বা পুরোহিত-যাজককে হত্যা করে তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা তাদের শত্রু মনে করে। কিন্তু ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করা এবং অনিবার্যভাবে মূল লক্ষ্যবস্তু ছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি কালো অধ্যায়। বিশ্বে গণতন্ত্র চর্চাকারী যে কোনও রাষ্ট্রে  বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এ ধরনের বর্বর হামলার নজির বিরল। তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রধানসহ দলটির শীর্ষ নেতাদের হত্যার উদ্দেশ্যে পরিচালিত ওই ন্যক্কারজনক ঘটনা দেশের রাজনীতিতে এক ধরনের স্থায়ী অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। আর এই ক্ষত নষ্ট করে দিয়েছে রাজনীতির পারস্পরিক ন্যূনতম বোঝাপড়ার জায়গাটিও। মতপার্থক্য থাকলেও দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে আগে  যে ধরনের সমঝোতার সম্পর্ক চলে আসছিল ২১ আগস্টের নৃশংস ঘটনার পর তা দৃশ্যত আর অবশিষ্ট নেই। বরং ঘটনার পরম্পরায় অবিশ্বাস বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়ে বিভক্তির সূত্রপাত করেছে।

সেদিনের সকল পত্রিকার প্রথম পাতা রক্তাক্ত ছবি নিয়ে সে ঘটনার সাক্ষ্য দিচ্ছে। কান্না আহাজারি সহ সব মিলিয়ে দেশে নেমে আসে প্রগাঢ় অন্ধকার। দেশি পত্র -পত্রিকার পাশাপাশি বিদেশি পত্র-পত্রিকাতেও এই হামলার ঘটনা স্থান পায় বড় ঘটনা হিসেবে।

সে বছরের ২২ আগস্ট আল-জাজিরা এ ঘটনা বড় করেই প্রকাশ করে। তারা লেখে, ‘Unrest hits Bangladesh‘ ঢাকায় বিরোধীদলীয় সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় ১৮ জন নিহতের ঘটনায় বিক্ষুব্ধ প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে। অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন বিরোধীদলীয় প্রধান’ অনেকটা এরকমভাবেই ‘সাব-হেডিং’ সাজায় তারা। 

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি আগস্টের ২২ তারিখে এ ঘটনায় ‘Blast hit Bangladesh party rally‘’ শিরোনাম করে। ‘সাব-হেডে’ লেখে, ‘ঢাকায় বিরোধীদলের বিশাল সমাবেশে বেশ কয়েকটি গ্রেনেড হামলায় ১৮ জন নিহত এবং শতাধিক আহত’।‘Bangladesh bomb causes chaos in Dhaka' শিরোনাম সংবাদ প্রকাশ করে অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যম এবিসি নিউজ।

প্রতিটি গণমাধ্যমেই হামলার রক্তমাখা ছবিসহ মানুষের আহাজারি, কান্নার সংবাদ প্রকাশ করা হয়। ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর অন্তত পাঁচদিন দেশের প্রতিটি পত্রিকায় হামলার ঘটনাটি প্রাধান্য পায়। হামলা পরবর্তী বিক্ষোভ, হরতালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া নিয়ে নানামুখী সংবাদ প্রকাশ হতে থাকে।
ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকরা সেসময় এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন।গ্রেনেড হামলার ঘটনায় তৎকালীন জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনান ২৪ আগস্ট ২০০৪ তারিখে নিন্দা জানান।

তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল জানান, গ্রেনেড হামলায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ। গ্রেনেড হামলার কয়েকদিন পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সাথে টেলিফোনে কথা বলেন কলিন পাওয়েল।

বাংলাদেশে নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হ্যারি কে টমাস গ্রেনেড হামলার ঘটনায় অবাক হয়েছেন বলে জানান। এছাড়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতরা হামলার ঘটনায় সুষ্ঠু এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্তের  আহবান জানান।

২১ শে আগস্টের ঘটনায় গ্রেনেড হামলায় আহত হয়েছিলেন বেশ কয়েকজন সাংবাদিকও।  ঘটনার পর বিভিন্ন পত্রিকায় সাংবাদিকরা সমগ্র ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিভিন্ন পত্র -পত্রিকায় লেখালেখি করেন।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা বা তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস চালিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার ঘটনা ইতিহাসে কম নেই। লাতিন আমেরিকার ডোমিনিকান রিপাবলিকের প্রেসিডেন্ট রাফায়েল ১৯৩০ থেকে ১৯৬১ সালে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার আগ পর্যন্ত খুনের রাজনীতি করেই টিকে ছিলেন। ডব্লিউ জন গ্রিন `A History of Political Murder in Latin America: Killing the Messengers of Change’ বইয়ে লিখেছেন, উদারভাবে রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর রাজনৈতিক হত্যা, নির্যাতন ও সন্ত্রাস চালানো ছিল রাফায়েল শাসনের বৈশিষ্ট্য। কয়েক দশক ধরে তাঁর শত শত বিরূপ সমালোচনাকারীদের   এবং সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা করেছে।

বাংলাদেশে ২১ আগস্টের গ্রেনেডের হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সত্যিই তাঁদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিলেন, এটা বিবেচনায় নেওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডির ঘটনায় এই মাটির লোকজনই জড়িত ছিলেন। সুতরাং ধরে নিতে হবে যে 'Visions of Annihilation' আমাদের সমাজে আছে। সে কারণে খুন ও ধর্ষণের মতো অপরাধের বিচার–প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার সঙ্গে একটা সামাজিক-সাংস্কৃতিক যোগসূত্র আছে কি না, সেটা আমাদের গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে হবে।

১৫ আগস্টের বর্বরতা ঘটেছিল জনগণের চোখের আড়ালে, রাতের অন্ধকারে। কিন্তু ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা হয়েছে প্রকাশ্যে। কোনো জনসভায় হামলা চালিয়ে একটি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের মূল নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা চালানোর কোনো নজির স্মরণকালের আধুনিক ইতিহাসে বিরল। আগস্টের দুই রক্তপাতের মধ্যে  যোগসূত্র যেন এক সুতোয় গাথা। এমনকি ১৯৭৫ সালে তারিখ হিসেবে ১৫ আগস্ট এবং ২০০৪ সালে মাস হিসেবে আগস্টের মিলটাও লক্ষণীয়। ১৫ আগস্টের মতোই ২১ আগস্টের ঘটনাটিও ছিল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার অপচেষ্টা।

সেদিন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাসহ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী, এমপি এবং জঙ্গিদের সম্মিলিত প্রয়াসে পাকিস্তান থেকে সরবরাহ করা আর্জেস গ্রেনেড দিয়ে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার চক্রান্ত বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার।

বঙ্গবন্ধু তনয়া তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা ও  আওয়ামী লীগের সকল শীর্ষনেতাসহ একই সঙ্গে হত্যার সেই ভয়ংকর অভিযান পরিচালিত হয়েছিল সেদিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত এক সন্ত্রাসবিরোধী আলোচনা সভায়।

এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে ১৯৭৫ সালের আগস্টের পর থেকে ১৯৯৬ সালের জুন পর্যন্ত যে সরকারগুলো দেশ পরিচালনা করেছে, তারা সবাই পাকিস্তানি মডেলে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। পাকিস্তানের মতো এ দেশেও ধর্মীয় মৌলবাদ এবং সামরিকতন্ত্র ক্রমাগত বিকশিত হয়েছে। প্রশাসন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সব অঙ্গনে ক্ষমতায়িত হয়েছে এই দর্শন। ফলে সব সময়ই তারা সহযোগী শক্তি হিসেবে সশস্ত্র জঙ্গিবাদী ও মৌলবাদী শক্তিকে ব্যবহার করেছে।

একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে সশস্ত্র ভূমিকা পালনকারী পাকিস্তান বাহিনীর অনুচর এই ধর্মীয় রাজনীতির ধারকেরা ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির চেয়েও বেশি প্রতিহিংসাপরায়ণ ছিল।

মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদী রাজনীতির পৃষ্ঠপোষক বিএনপি ও জামায়াতের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দেশে মৌলবাদী জঙ্গিগোষ্ঠীর ব্যাপক উত্থান ঘটে। হরকাতুল জিহাদ, জামায়াতুল মুজাহিদিনসহ জঙ্গি সংগঠনগুলোর প্রবল উত্থানে বাংলাদেশ যেন আরেক আফগানিস্তানে পরিণত হয়ে যাচ্ছিল! পাশাপাশি পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা ঢাকাতেই তাদের দূতাবাসের মাধ্যমে ব্যাপক অপতৎপরতা শুরু করে। তৎকালীন সংবাদপত্রসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ রয়েছে।

একুশে আগস্টে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে একসঙ্গে হত্যার জন্য ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা জঙ্গি-মৌলবাদী এবং পাকিস্তানপন্থিদের সম্মিলিত উত্থানের চূড়ান্ত রূপ। সেই ভয়ংকর হামলার পূর্বাপর ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করলেই বোঝা যাবে যারা হত্যা-ক্যুর রাজনীতি এদেশে শুরু করেছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে, তাদের অনুসারীরাই একুশে আগস্ট 'All out' পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিল জঙ্গিদের দিয়ে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে।

ওই ঘটনায় আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪জন নেতা-কর্মী নিহত হয়েছিলেন এবং প্রায় তিন শতাধিক নেতা-কর্মী গ্রেনেডে আহত হন! যারা বেঁচে আছেন, অনেকেই শরীরে স্প্লিন্টারের যন্ত্রণা বহন করে চলেছেন!

একুশে আগস্টের কুশীলব এবং যারা নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছেন, সেই অপরাধীদের সকলেরই মুখোশ উন্মোচিত হয়ে গেছে এই মামলার বিচারের মধ্য দিয়ে। অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ডসহ নানা মেয়াদের শাস্তি প্রদান করেছে আদালত। যদিও সেই রায় কার্যকরের প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়নি। উচ্চ আদালতে আপিলসহ দুটি মামলাই এখনও চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষায়। কিন্তু একুশে আগস্টের ষড়যন্ত্রের  নাটের গুরু তারেক রহমানকে মৃত্যুদণ্ড থেকে অব্যাহতি প্রদান  করে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের রায় ব্যথিত করেছে বিচার প্রার্থীদের।   

২১ আগস্টের ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ এই প্রথম দেখল একটি দেশে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও মদদে প্রকাশ্য দিবালোকে কী নৃশংস হামলা হতে পারে, যেখানে এত মানুষ হতাহত! শুধু তাই নয়, ঘটনাস্থলের ব্যবহৃত-অব্যবহৃত গ্রেনেডসহ সমস্ত আলামত ঘটনার পর পরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়েই নষ্ট করে ফেলা হয়।

একজন সাধারণ নাগরিক, সুদূর নোয়াখালীর প্রত্যন্ত গ্রামের জজ মিয়াকে গ্রেপ্তার করে গল্প ফাঁদা হয়েছিল এই গ্রেনেড হামলার ঘটনা সাজিয়ে! হত্যাকাণ্ডের মোটিভ সম্পূর্ণ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য। এর সবকিছুই করা হয় সামরিক-বেসামরিক একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে। যতই বিস্ময়কর হোক, এটাই ছিল বাস্তবতা। বিচার বিভাগীয় তদন্তের নামে এক সদস্যের জয়নাল আবেদিন কমিটি যে প্রহসনের তদন্ত করেছিলেন, তা এখন গণমাধ্যমে কলঙ্কিত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
জজ মিয়াকে দিয়ে যে আষাঢ়ে গল্প তৈরি করা হয়েছিল, তা দেশের গণমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়লে শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালে জজ মিয়াকে বাদ দিয়ে চার্জশিট জমা দেয় সিআইডি। ২০০৯ সালে মুক্তি পান জজমিয়া।

পরবর্তীকালে তদন্তে বেরিয়ে আসে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর জন্য তৈরি এসব গ্রেনেড এবং টাকার উৎস ছিল পাকিস্তান। হরকাতুল জিহাদের একসময়ের আমির এবং চারদলীয় জোট সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর বাসা থেকেই গ্রেনেড নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়েছিল জঙ্গিরা।
এর সঙ্গে একাধিক মন্ত্রী, এমপি এবং হাওয়া ভবনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য আদালতে প্রমাণিত হয়েছে। হরকাতুল জিহাদনেতা মুফতি হান্নানের আদালতের দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সেই হামলার পূর্বাপর সব ঘটনা শুনলে যে কেউ চমকে উঠবেন! 

১৫ আগস্ট ৭৫ থেকে ২১ আগস্ট ২০০৪ একই সূত্রে গাঁথা, সেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতি আর মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার রাজনীতিই অব্যাহত। 

 বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়ে ঘাতকেরা মনে করেছিল যে, আওয়ামী লীগের রাজনীতি তথা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের রাজনীতি চিরতরে শেষ হয়ে গিয়েছে। তারা কল্পনাও করতে পারেনি বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকার দুই কন্যা বিদেশ থেকে এই বাংলায় কোনোদিন ফিরে আসতে পারবেন।

জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের দৃঢ় ঐক্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দেশব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির সুদৃঢ় অবস্থানই মূলত আওয়ামী লীগকে আবার বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার ভিত্তি রচনা করে দিয়েছে। এর কৃতিত্ব অনেকখানি দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার। কারণ তিনি আওয়ামী লীগের ঐক্যের একমাত্র প্রতীক। তাকে হত্যার চেষ্টা অতীতে হয়েছে, এখনও হচ্ছে, তিনি যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিনই হবে। কথায় বলে: রাখে আল্লাহ, মারে কে! বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াত কোনোদিন বদলাবে না, কিন্তু বিএনপি বদলাতে পারত, সে সুযোগ ছিল তাদের। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শোষণহীন সমাজ গড়ার মহত্তম আদর্শের রাজনীতিতে যদি বিশ্বাস স্থাপন করতে পারত, তা হলে অনেক ইস্যুতে আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করে এদেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশে যারা বিএনপিপন্থি রাজনীতি করেন তাদের অন্তরে সেই শুভবুদ্ধির উদয় এখনও হয়নি। আর সে কারণেই তারা অন্ধকারের রাজনীতি তথা মৌলবাদীদের সঙ্গে নিয়ে চলার রাজনীতিতেই বিশ্বাসী।

প্রগতিবিরোধী ধর্মান্ধ তালেবান, আল-কায়েদার অনুসারীরা এখনও এদেশের স্লোগান দিয়ে চলেছে সেই শক্তির বলেই। বিদেশি নাগরিক হত্যা, হলি আর্টিজান হামলার মধ্য দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের হত্যা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খ্রিস্টান ধর্মযাজক, হিন্দু পুরোহিতের মতো একেকটি স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়  একটাই লক্ষ্য সামনে রেখে, আওয়ামী লীগের সরকার উৎখাত করা। শেখ হাসিনাকে নিশ্চিহ্ন করা।

আধুনিক পোশাকে যারা স্বাধীনতাবিরোধীদের আদর্শের রাজনীতি করেন, শুধু এই রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষদের কারণে বাংলাদেশকে থামিয়ে দিতে চায় পাকিস্তানসহ বিভিন্ন শক্তি ও তাদের অনুচররা। বাংলাদেশে আল কায়দা আছে এই অপপ্রচার চালিয়ে, ষড়যন্ত্র করা হয় বিদেশি হস্তক্ষেপের।

এরকম ভয়ংকর বাস্তবতায়ই চলছে বাংলাদেশের দ্বিধাবিভক্ত জাতীয় রাজনীত। যে কারণে প্রগতিবিরোধী ধর্মান্ধতার অনুসারীরা এদেশের রাষ্টীয় আদর্শের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে চলেছে ১৯৭৫ সাল থেকে। বিএনপি একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল! কই একবারও তো তাদের দলীয় প্রধান বেগম খালেদা জিয়াকে হত্যার কোনো চেষ্টা হয়নি! অথচ যখনই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় তখনই বোমা-গ্রেনেড হামলা, নানামুখী সন্ত্রাস আর দলকে নেতৃত্বশূন্য করতে হত্যাচেষ্টা।

গ্রেনেড হামলার মধ্য দিয়ে রক্তের স্রোত বয়ে গেল আরেক আগস্টে, এই বাংলায়। বিস্ফোরণ, ধোঁয়া, স্প্লিন্টার,আর্তনাদ! নেতা-নেত্রীরা ঘিরে ধরলেন জননেত্রী শেখ হাসিনাকে, রচনা করলেন মানববর্ম। এই মানববর্ম গড়ে উঠুক দেশজুড়ে, মানুষে মানুষে- এই কামনা।

আরো অনেক বছর বেঁচে থাকুক সফল রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা যার গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের দরবারে উন্নয়নের রোল মডেল। আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশে রাজনীতি হোক পরমত সহিষ্ণুতা, পারস্পারিক সহাবস্থান , সম্প্রীতি এবং  সৌহার্দের। বন্ধ হোক হাত্যা,  জ্বালাও- পোড়াও, সন্ত্রাসের রাজনীতি।

ড. আব্দুল ওয়াদুদ

লেখক: ড. আব্দুল ওয়াদুদ ফিকামলি তত্ত্বের জনক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রেসিডিয়ামসদস্য-বঙ্গবন্ধু পরিষদ, প্রধানপৃষ্ঠপোষক- বাংলাদেশ মনোবিজ্ঞান সমিতি

ইত্তেফাক/এএইচপি