খুলনায় নানা অপরাধে জড়াচ্ছেন চিকিৎসকরা

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৩, ০৩:৩০

খুলনায় বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে চিকিৎসকরা। সম্প্রতি যৌন হয়রানি, যৌন নিপীড়ন, বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণ, হত্যায় প্ররোচনা, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও মেডিক্যাল কলেজের ভর্তির প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো গুরুতর অপরাধ কর্মকাণ্ডে চিকিৎসকদের নাম এসেছে। ফলে এই মহান পেশায় জড়িতদের নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে।

এ ব্যাপারে চিকিৎসকদের সংগঠন বিএমএর নেতারা বলছেন, একটি আদর্শিক পেশায় অনৈতিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংবরণ করা উচিত। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি নিজ কর্মস্থান হক নার্সিং হোমে এক শিশু রোগীর মায়ের সঙ্গে  যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে  শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক ডা. নিশাত আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে। এছাড়া চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ঐ নারীকে মারধরেরও অভিযোগ করা হয়। উক্ত ঘটনায় ঐ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী নারী থানায় মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনার পর চিকিৎসকরা টানা চার দিন কর্মবিরতি পালনসহ আন্দোলন করে। এতে ঐ চার দিন খুলনার চিকিৎসাসেবা ভেঙে পড়ে।

ঐ  ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে গত ৬ জুন নিজ চেম্বারে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। অভিযোগ আছে, সেই দিনের ঘটনা মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে ধামাচাপা দেওয়া হয়। তবে বহুল পরিচিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ শহর জুড়ে সমালোচিত হয়। এর আগে নিজ স্ত্রীর কথা গোপন রেখে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি ও পরে বিয়েতে অস্বীকৃতি জানালে আত্মহত্যা করেন নগরীর গাজী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. মন্দিরা মজুমদার। গত বছরের ২৮ এপ্রিলের ঐ ঘটনায় খুমেক হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ডা. সুহাস রঞ্জন হালদার ও তার বোন সিঁথি মনি হালদারকে আসামি করে আত্মহত্যা প্ররোচনা মামলা করা হয়। বর্তমানে মামলাটির অধিকতর তদন্ত করছে মহানগর পুলিশের অপরাধ তদন্ত শাখা সিআইডি।

ডা. মন্দিরার বাবা প্রদীপ মজুমদার বলেন, ‘আমাদের মেয়েকে ডা. সুহাস বিয়ে করবে—এ কথা সে ও তার বোন নিজ মুখে আমাকে বলেছিল। সেভাবে তারা মেলামেশা করত। এর একপর্যায়ে আমার মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। পরে আমরা আনুষ্ঠানিক বিয়ের জন্য ডা. সুহাসকে চাপ দিলে সে সবকিছু অস্বীকার করে বলে যে, তার বউ রয়েছে। এই অপমান ও লোকলজ্জা সইতে না পেরে আমার মেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। আমি এ ঘটনার ন্যায় বিচার চাই।’

সর্বশেষ গত চার দিন ধরে খুলনার টক অব দ্যা টাউনে পরিণত হয়েছে মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের পাঁচ চিকিৎসকের জড়িত থাকার অভিযোগ। গত ১৮ আগস্ট নগরীর বাইতিপাড়ার নিজ বাসা থেকে ঢাকার সিআইডি সদস্যরা তুলে নিয়ে যায় খুমেক হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার, থ্রি ডক্টর মেডিক্যাল ভর্তি কোচিং সেন্টারের মালিক, স্বাচিপ নেতা ও খুলনা বিএমএর নির্বাহী সদস্য ডা. ইউনুস উজ্জামান খান তারিমকে। এছাড়া ঐ দিন বিভিন্ন সময়ে একই অভিযোগে সিআইডির সদস্যরা নিজেদের বাসা থেকে আটক করে খুমেক হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. লুইস সৌরভ সরকার, ডা. নাজিয়া মাহজাবিন তিশা, ডা. শর্মিষ্ঠা মণ্ডল ও ডা. মুসতাসিন হাসান লামিয়াকে।

পুলিশ জানায়, ডা. ইউনুস খান তারিম মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত। তিনি তার মালিকানাধীন থ্রি ডক্টরস কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির প্রশ্নপত্র ফাঁস করে গত ১৬ বছরে কোটি কোটি টাকা আয় করেছেন। ডা. তারিম খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের নিয়ে মেডিক্যালের প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্র গড়ে তুলেছেন। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি গোয়েন্দা সংস্থা এ বিষয়ে অনুসন্ধান শেষে এক প্রতিবেদনে বলেছে, খুলনার উক্ত কোচিং সেন্টার ভর্তি বাণিজ্যের মাধ্যমে ‘মেধাহীন’, ‘অযোগ্য’ ছাত্রছাত্রীদের মেডিক্যালে ভর্তির সুযোগ করে দিচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা জনপ্রতি ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা করে নেয়। এই ভর্তি বাণিজ্যের মাধ্যমে বছরে শতকোটি টাকার বেশি অবৈধ লেনদেন হয়। এ বিষয়ে খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান আল মামুন বলেন, ডা. তারিমকে ঢাকার সিআইডি টিম আটক করেছে। তবে বাকি চার জনের বিষয়ে আমার জানা নেই।

অপরদিকে খুলনার সিভিল সার্জন (সিএস) ডা. সুজাত আহমেদ, সাবেক সিভিল সার্জন ডা. নিয়াজ মোহাম্মদ ও খুলনা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) ডা. এস এম মুরাদ হোসেনসহ কয়েক জনের বিরুদ্ধে করোনা পরীক্ষার জন্য বিদেশগামী যাত্রীদের কাছ থেকে নেওয়া ২ কোটি ৬১ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় তাদের নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা দায়ের করেছে। ইতিমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।

চিকিৎসা পেশার মতো মহৎ পেশায় থাকা ডাক্তাররা কেন অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছেন—এ ব্যাপারে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) মানব সম্পদ উন্নয়ন ডিসিপ্লিনের সহকারী অধ্যাপক প্রসেনজিৎ তরফদার বলেন, নানাবিধ কারণে এসব হয়ে থাকে। এর মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে অপরাধ করে কোনো না কোনোভাবে পার পেয়ে যাওয়া, প্রভাবশালী মানুষের সংস্পর্শে থাকা এবং বিচার কার্যক্রম বিলম্বিত হওয়া। তবে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সুসম্পর্কে না থাকাসহ আরও বেশ কিছু কারণও এর সঙ্গে জড়িত।

এ বিষয়ে খুলনা বিএমএ সভাপতি ডা. শেখ বাহারুল আলম বলেন, অনৈতিক অবক্ষয়ের কারণে এমন ঘটনা ঘটছে। এছাড়া কিছু বিষয় আছে বিচারাধীন। তাই বিচার প্রক্রিয়া শেষে জানা যাবে আসলে তারা দোষী কি না।

 

ইত্তেফাক/এমএএম