সোনার ফ্রেমে বাঁধাই করে রাখার মতো একটি দিন

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:২৮

মিরপুর টেস্টের দ্বিতীয় দিনটা সোনার ফ্রেমে বাঁধাই করে রাখার মতোই। টেস্ট ক্রিকেটে এমন সাফল্যমন্ডিত দিন কমই আসে। দিন শেষে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স বর্ণনা যেন এক মধুর যন্ত্রণা। ঘটনাবহুল দিনের প্রত্যেকটা ঘটনাই গৌরবের বার্তা বাহক। দিনভর মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের সেঞ্চুরিতে যেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের লড়াইয়ের শক্তি চুষে নিয়েছিল বাংলাদেশ। শেষ বিকেলে বোলিংয়ে নেমে স্পিন বিষে সফরকারীদের নীল করে দিয়েছে স্বাগতিকরা। উইকেট বৃষ্টিতে বাংলাদেশ গড়েছে ইতিহাস।

উইন্ডিজদের ইনিংসের বয়স তখনও এক ঘন্টা হয়নি। এর মাঝেই ২৫ রানে সাজঘরে ফিরেন পাঁচ ব্যাটসম্যান। ব্যাটিং লাইনের প্রথম পাঁচ ব্যাটসম্যানের সবাই বোল্ড! প্রতিপক্ষের প্রথম পাঁচ ব্যাটসম্যানকে বোল্ড করে টেস্ট ইতিহাসে জায়গা করে নিল বাংলাদেশ। ১২৮ বছর পর এমন ঘটনা দেখলো টেস্ট ক্রিকেট। এর আগে যার নজির ছিল দুটি। ১৮৭৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ইংল্যান্ড, ১৮৯০ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়া এই লজ্জার কীর্তির শিকার হয়েছিল। তবে আগের দুই ঘটনাতেই পেসার-স্পিনদের সমন্বয় ছিল।

কিন্তু গতকাল মিরপুরে সাকিব আল হাসান ও মেহেদী হাসান মিরাজ উইন্ডিজদের টপঅর্ডার ধসিয়ে দিয়ে গড়েছেন অনন্য কীর্তি। তাই স্পিনে প্রথম পাঁচ ব্যাটসম্যান বোল্ড হওয়ার রেকর্ড এটিই প্রথমবার। এবং যার ধারক বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের ৫০৮ রানের বিশাল স্কোরের বিপরীতে গতকাল ম্যাচের দ্বিতীয় দিন শেষে প্রথম ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ ৫ উইকেটে ৭৫ রান। শিমরন হেটমায়ার ৩২, ডাওরিচ ১৭ রানে ব্যাট করছেন। এখনও ৪৩৩ রানে পিছিয়ে সফরকারীরা। অবশ্য তাদের সামনে এখন সবচেয়ে কাঙ্খিত গন্তব্য ফলো অন এড়ানো। সেই দূরত্ব পাড়ি দিতে তাদের করতে হবে আরও ২৩৩ রান।

বাংলাদেশের ঘূর্ণি জাদু ফণা তুলতে শুরু করেছিল ইনিংসের প্রথম ওভারেই। সাকিব বোল্ড করেছেন ক্রেইগ ব্রেথওয়েটকে (০)। তারপর মিরাজের জোড়া শিকার কাইরেন পাওয়েল (৪) ও শেই হোপ (১০)। আমব্রিসকে (৭) সাকিব ও রোস্টন চেজকে (০) ফেরান মিরাজ। পরের চারজনেরও স্ট্যাম্প ছত্রখান হয়েছিল। তখনই বিপর্যয়ের সপ্তমে চড়ে বসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। শেষ বিকেলে ষষ্ঠ উইকেটে ৫০ রানের জুটি গড়ে কিছুটা প্রতিরোধ গড়েছেন হেটমায়ার ও ডাওরিচ। অবিচ্ছিন্ন থেকেই ফিরেছেন তারা। মিরাজ তিনটি, সাকিব দুটি করে উইকেট নেন।

গতকাল দিনের সকালটাও বাংলাদেশের সাফল্যের সুবাতাসে ভরা ছিল। চতুর্থ ওভারেই তিনটি চার মেরে সাকিব গেঁথে দিয়েছিলেন গোটা দিনের সুরটা। ষষ্ঠ উইকেটে সাকিব-মাহমুদউল্লাহর জুটি বিছিন্ন হয়েছে ১১০ রান যোগ করে। সাকিব ৮০ রান করে ফিরেছেন। পরের সময়টাতে সঙ্গীদের নিয়ে বাংলাদেশের ইনিংসকে প্রলম্বিত করে গেছেন মাহমুদউল্লাহ। সপ্তম উইকেটে লিটন দাসের সঙ্গেও ৯২ রানের জুটি গড়েন তিনি। চতুর্থ হাফ সেঞ্চুরি করা লিটন ফিরেন ৫৪ রান করে।

পরে মিরাজ, তাইজুল, নাঈম হাসানদের সঙ্গেও মাহমুদউল্লাহর জুটি ডাবল ফিগার পার হয়েছিল। অপরিসীম ধৈর্য্য, পরিণত, শৃঙ্খলিত ব্যাটিংয়ে ২০৩ বলে ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান পূর্ণ করেন তৃতীয় টেস্ট সেঞ্চুরি। তিন টেস্টে এটি তার দ্বিতীয় সেঞ্চুরি। চা বিরতির পর শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হওয়ার আগে তিনি খেলেছেন ক্যারিয়ার সেরা ১৩৬ রানের (১০ চার) ইনিংস।

মিরাজ ১৮, তাইজুল ২৬, নাঈম হাসান অপরাজিত ১২ রান করেন। এর মাধ্যমেই টেস্টে প্রথমবার বাংলাদেশের ১১ ব্যাটসম্যানের রানই ডাবল ফিগার পৌঁছালো। হলো নতুন রেকর্ড। ১১ ব্যাটসম্যানেরই ডাবল ফিগারে যাওয়ার ঘটনা এটি টেস্ট ইতিহাসে ১৪তম। এই ইনিংসে বাংলাদেশের সবগুলো জুটিও ডাবল ফিগারে গিয়েছিল। যা টেস্টে তৃতীয়বার করলো টাইগাররা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওয়ারিক্যান, ব্রেথওয়েট, বিশু, রোচ দুটি করে উইকেট পান।

কার্যত ফলো অনের দুয়ারে দাঁড়িয়ে এখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এমনকি ক্যারিবিয়ানদের ইনিংস হারের সম্ভাবনাও প্রবল। বলা বাহুল্য, নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে এখনও প্রতিপক্ষকে ফলো অন করানো, ইনিংস ব্যবধানে হারানোর অভিজ্ঞতা নেই বাংলাদেশের। সাকিবদের স্পিন জাদু অব্যাহত থাকলে মিরপুর টেস্টে এই দুই গৌরবের অভিজ্ঞতা সঙ্গী হতে পারে টাইগারদের।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:বাংলাদেশ: ৫০৮, ১৫৪ ওভার, ওয়েস্ট ইন্ডিজ: ৭৫/৫, ২৪ ওভার