মালটিলেভেল মার্কেটিং কোম্পানির প্রতারণা, পালটেছে কৌশল

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৩, ০৭:০০

বহুস্তর বিপণন বা মালটিলেভেল মার্কেটিং কোম্পানি মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ (এমটিএফই) গ্রুপ ইনকরপোরেটেড বাংলাদেশে রীতিমতো প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়ে মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে। ব্যবহার করেছে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক লেনদেনব্যবস্থা। কিন্তু প্রতারণার ঘটনার পর এখন সরকারি সংস্থাগুলোর কেউই দায় নিতে রাজি নয়। মালটিলেভেল মার্কেটিং বা এমএলএম ব্যবসার জন্য বাংলাদেশে আইন আছে। তবে অনুমোদিত কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। তার পরও এমটিএফই এ ধরনের ব্যবসা করে কীভাবে অর্থ হাতিয়ে নিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও প্রতারিত গ্রাহকের হিসাব অনুযায়ী, এমএলএম প্রতিষ্ঠান এবং ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কাছে মানুষের প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা আটকা। ইভ্যালি বা আরো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের যেসব গ্রাহক ২০২১ সালের ৩০ জুনের আগে টাকা দিয়ে প্রতারিত হয়েছেন, তাদের ব্যাপারে কিছু করার বাস্তবতা কম। অবশ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মানুষের সামনে যাতে লোভের ফাঁদ কেউ পাততে না পারে, সেটা নিশ্চিত করতেই সংস্থা তৈরি করা হয়। এমটিএফইর ‘প্রতারণার’ ধরনটি ভিন্ন, তবে কৌশল ডেসটিনির মতোই। ডেসটিনি যেভাবে গ্রাহকের মাধ্যমে গ্রাহক সংগ্রহ করত, তেমনি এমটিএফইও ‘বিনিয়োগকারী’ সংগ্রহ করেছে। কত মানুষের টাকা খোয়া গেছে, তার হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন জেলায় হাজার হাজার মানুষ কোটি কোটি টাকা হারানোর দাবি করছেন। দীর্ঘ সময় ধরে এ কার্যক্রম চললেও সরকারের কোনো দপ্তরের কাছে তা ধরা পড়েনি।

বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে ‘প্রতারণা’ করার আগে নাইজেরিয়া ও শ্রীলঙ্কার নাগরিকদের টাকা ‘আত্মসাত্’ করেছে এমটিএফই। দুই দেশের সংবাদমাধ্যমের খবর বলেছে, নাইজেরিয়ায় এমটিএফই আত্মসাত্ করেছে ১০০ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১০ হাজার ৮০০ কোটি টাকার সমান। শ্রীলঙ্কায় তারা নিয়েছে ১০০ কোটি রুপি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৪ কোটি টাকা। বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে এমটিএফই কত টাকা নিয়েছে, তার কোনো পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন জেলায় হাজার হাজার মানুষ কোটি কোটি টাকা খোয়ানোর দাবি করছেন।

অবৈধ অনলাইন গ্যাম্বলিং ক্রিপটো ট্রেডিং করা এ প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতের পথ মূলত ডিজিটাল পেমেন্টেই ত্বরান্বিত হয়েছে বলে মনে করেন আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি আগাম আর্থিক অপরাধ শনাক্তে দেশে মজবুত ভিত্তি গড়ে না ওঠাকেও দায়ী করছেন তারা। বাংলাদেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী এমএলএম ব্যবসা পরিচালনা এবং ক্রিপটো কারেন্সিতে লেনদেন অবৈধ ও নিষিদ্ধ। এর পরও কমপক্ষে ৫০০ ডলার বিনিয়োগ করলে দিন শেষে ৫ হাজার টাকা লাভ হবে এমন চটকদার প্রলোভনে গ্রাহকরা বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। অনেকে গহনা ও মূল্যবান সামগ্রী বন্ধক রেখেও বিনিয়োগ করেছিলেন। অ্যাপের মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিং বা বাইন্যান্সের মাধ্যমে টাকা নিত এমটিএফই। পরে স্থানীয় এজেন্টরা সেই অর্থ বাইরে পাচার করত। ডিজিটাল পেমেন্ট সুবিধা নিয়ে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে অ্যাপের মাধ্যমে এমটিএফই দেশে অবৈধ এমএলএম ব্যবসা পরিচালনা করে এলেও লাপাত্তা হওয়ার দুই সপ্তাহ আগে বিষয়টি আলোচনায় আসে। ততক্ষণে প্রায় ৭০ হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে ১১ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয় বলে দাবি করেন ক্ষতিগ্রস্তরা।

আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমএলএমের মাধ্যমে ডেসটিনি-ইউনিপেসহ আরো অনেকেই প্রতারণা করেছে। তবে সে সময় ডিজিটাল পেমেন্টের সুবিধা না থাকায় সরাসরি গিয়ে টাকা জমা দিতে হতো। এক জেলা থেকে অন্য জেলা বা এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে এ ধরনের লেনদেনের ক্ষেত্রে বেশ সময়ের ব্যাপার ছিল। কিন্তু ডিজিটাল পেমেন্টের যুগে টাকা বহন করে নেওয়া বা অতিরিক্ত সময় কোনোটিরই প্রয়োজন হচ্ছে না। এ সুযোগই এমটিএফইর অর্থ আত্মসাতের পথ ত্বরান্বিত করেছে। পাশাপাশি এ ধরনের আর্থিক অপরাধের ক্ষেত্রে আগাম শনাক্তকরণ ব্যবস্থা গড়ে না ওঠাকেও এ ধরনের অপরাধ বিস্তারের কারণ হিসেবে মনে করছেন তারা। এমটিএফইর মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার হয়েছে বলে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডিরও সন্দেহ। এমটিএফই দেশে যে ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে সেটি পুরোপুরিই অবৈধ। এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করে তারা আত্মসাতের অর্থ পাচার করে থাকতে পারে। এরই মধ্যে গ্রাহকরা দাবি করেছেন, ১১ হাজার কোটি টাকা আত্মসাত্ হয়েছে।

অনলাইন প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে গত পাঁচ বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ইভ্যালি, ধামাকা, দালাল, ই-আরেঞ্জের মতো অন্তত ১৭টি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাত্ ও পাচারের অভিযোগ রয়েছে। অনলাইনে অ্যাপভিত্তিক প্রতারণার কার্যক্রম রোধে গৃহীত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বিটিআরসি টেলিকম রেগুলেটরি অথরিটির। কিন্তু তাদের সরাসরি মনিটরিংয়ের সুযোগ নেই। ক্ষতিকর অ্যাপস সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চিহ্নিত করে জানালে তারা ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন। এর বাইরে আর্থিক লেনদেন বা অপরাধের বিষয়টি মনিটরিংয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রয়েছে। টাকা অবৈধভাবে পাঠানোর ব্যবস্থা বন্ধ করা গেলেই এ ধরনের অপরাধ রোধ করা সম্ভব।

এমটিএফইর মতো অন্তত ১ হাজার প্রতিষ্ঠান সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। অথচ সরকার বিষয়টাকে হালকাভাবে নিয়েছে। প্রথমে যুবক, ডেসটিনির মতো এমএলএম; পরে ইভ্যালির মতো ই-কমার্স এবং এখন এমটিএফইর মতো ক্রিপটো কারেন্সির (ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা) মাধ্যমে অর্থোপার্জনের মোহে পড়েছেন যুবকেরা। কেন এমন হচ্ছে, এ ব্যাপারে গবেষণা হওয়া দরকার। বাংলাদেশের মতো অত্যন্ত ঘনবসিতপূর্ণ দেশে সরকার বা কর্তৃপক্ষের অজান্তে কোনো মানুষের পক্ষে ব্যাবসায়িক ‘নেটওয়ার্ক’ পরিচালনা করা   অসম্ভব। এর পরেও ঘটে চলেছে একের পর এক প্রতারণা।

ইত্তেফাক/এএইচপি