বেক্সিমকোর ঋণ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে ভয়াবহ মিথ্যাচার!

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৩, ১৯:৪৫

গণমাধ্যম সমাজের বিবেক হিসেবে কাজ করে, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে ধরা হয় সংবাদমাধ্যমকে। তাই সাংবাদিকদের দায় রয়েছে এই অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালনের। সম্প্রতি মূলধারার অনেক গণমাধ্যম ব্রেকিং নিউজ দেওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে অনেক ভুল বা অর্ধসত্য সংবাদ প্রচার করছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৩ সালের প্রথম ছয় মাসে প্রায় ১৫০০ ভুল প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যমগুলো। সংখ্যাটা নিতান্তই কম নয় বরং ঢের বেশি। এই ভুল সংবাদের কবলে পড়ে হয়তো অনেকের সম্মানহানী ঘটেছে, অনেকের আর্থিক ক্ষতিসাধন হয়েছে আবার অনেকে পড়ে‌ছে অধিক মানসিক চাপে।  তাই যেকোনো সংবাদ প্রচার বা প্রকাশের পূর্বে অবশ্যই তার সত্যতা যাচাইপূর্বক গণমাধ্যমে আসা উচিত। এ ব্যাপারে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের আরও বেশি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। 
 
গত ২২ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশ নামক পত্রিকায় বেক্সিমকো গ্রুপ নিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়।  ‘বিশেষ বিবেচনায় বেক্সিমকোকে ২২ হাজার কোটি টাকা ঋণ’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে নেতিবাচকভাবে বেক্সিমকো ও জনতা ব্যাংককে উপস্থাপন করা হয়েছে।  

প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য ছিলো, নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বেক্সিমকো গ্রুপকে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী কোনো একক গ্রাহককে মূলধনের ২৫ শতাংশের (ফান্ডেড ও ননফান্ডেড) বেশি ঋণ দেওয়ার নিয়ম নেই। কিন্তু বেক্সিমকো গ্রুপকে সেই নিয়ম ভঙ্গ করে ঋণ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে তথ্য গোপন করেছে জনতা ব্যাংক।  এরপর নতুন করে বেক্সিমকো আরও ৪৭৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকার ঋণের আবেদন করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি চাইতে যায় জনতা ব্যাংক আর তখনই বিষয়টি আলোচনায় চলে আসে। 

উপরোক্ত প্রতিবেদনের সত্যতা চ্যালেঞ্জ করার মতো বেশ কয়েকটি ফ্যাক্ট এখানে রয়েছে। প্রথমত, নিয়মের ব্যত্যয় আসলেই ঘটেছে কিনা ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে তা দেখা এবং এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল নিয়মটা কি তা পর্যালোচনা করা।  দ্বিতীয়ত, বেক্সিমকো গ্রুপ কী ২২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পর আবারও ৪৭৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকার ঋণের আবেদন করেছে কিনা। আর তৃতীয়ত, বেক্সিমকো সংক্রান্ত কোন তথ্য জনতা ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আদৌ গোপন করেছে কিনা। যদি এর কোনটিই ঘটে না থাকে তবে এই প্রতিবেদনটি বেক্সিমকো গ্রুপের জন্য চরম মানহানিকর; কারণ এটি সত্যের বিকৃত তথ্য উপস্থাপন। 

বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের সকল বাণিজ্যিক ব্যাংককে একটি নিদের্শনায় জানিয়েছিলো যে, একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির জন্য ঋণসীমা হিসেবে মোট মূলধনের পরিবর্তে পরিশোধিত মূলধনকে বিবেচনায় নিতে হবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী  কোনো একক গ্রাহককে মূলধনের ২৫ শতাংশের (ফান্ডেড ও ননফান্ডেড) বেশি ঋণ দেওয়া যাবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জনতাসহ অন্য ব্যাংকগুলোকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঋণ ও ঋণসুবিধা উল্লিখিত সীমার মধ্যে আনার জন্য নির্দেশ দেয়। এই নির্দেশনার পর বেক্সিমকো গ্রুপকেও জনতা ব্যাংক ঋণসুবিধা উল্লেখিত সময়ের মধ্যে আনার কথা জানায়। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নির্দেশনার অনেক আগেই জনতা ব্যাংক থেকে এই ঋণসুবিধা নিয়েছিলো বেক্সিমকো। ফলে নতুন নির্দেশনা কার্যকর হওয়ার পর একক ঋণগ্রহীতা হিসেবে ঋণের সীমা অতিক্রম করে গ্রুপটির। এজন্য জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ছাড়ের আবেদন করে বেক্সিমকো গ্রুপ। যথাযথ বিবেচনার পর বাংলাদেশ ব্যাংক বেক্সিমকোকে প্রয়োজনীয় অব্যাহতি প্রদান করে।  

তবে শর্ত হিসেবে বলা হয় যে, ২০২৪  সালের ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে মোট ঋণের স্থিতি নতুন নীতিমালায় নির্ধারিত সীমার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে এবং তা সেই সীমা অতিক্রম করতে পারবে না।  এর কারণ হলো, যেহেতু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নির্দেশনা জারির আগেই বেক্সিমকো ঋণ নিয়েছিলো তাই এক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতফসিল ও একক গ্রাহক ঋণসীমা অতিক্রমের দায় থেকে জনতা ব্যাংককে মুক্তি দিলেও দুটি শর্ত জুড়ে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।  সেই শর্তে স্পষ্টভাবে আছে, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে গ্রাহকের ঋণসুবিধা ২৫ শতাংশ সীমার মধ্য নামিয়ে আনতে হবে। ফলে জনতা ব্যাংক বেক্সিমকোকে যে সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে সেখানে ৩০ ডিসেম্বরের কথা উল্লেখ আছে।  তাই বেক্সিমকোকে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে মর্মে যে কথাটি উল্লেখ করা হয়েছে সেটি সর্বৈভ মিথ্যা।  ব্যাংকের সকল নিয়ম মেনেই বেক্সিমকো এই ঋণসুবিধা পেয়েছে। 

এবার আসা যাক, বেক্সিমকো নতুন করে ৪৭৯ কোটি ৩৬ লাখ  টাকা ঋণ জনতা ব্যাংকের কাছে চেয়েছে কিনা সে প্রসঙ্গে। এর সরাসরি উত্তর হচ্ছে না। প্রতিবেদক না বুঝে অথবা উদেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার প্রতিবেদনে এমনটা উল্লেখ করেছেন। এই ৪৭৯ কোটি টাকা ক্রয়াদেশের বিপরীতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের উৎপাদনের জন্য নেওয়া যা পুরোনো ২২ হাজার কোটি টাকার মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত। পণ্যের রপ্তানি সম্পন্ন হলে এই বিক্রয়লব্ধ টাকা এলসিরর বিপরীতে জনতা ব্যাংকেই আসবে যা ব্যাংক লভ্যাংশ ৭% বেক্সিমকোকে দিয়ে ৪৭৯ কোটির পুরোটাই সমন্বয় করে নেবে। বেক্সিমকোর এই টাকা হাতে পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।  রপ্তানি পণ্যের ক্রয়াদেশের বিপরীতে ব্যাংক থেকে ব্যাবসায়ীদের টাকা গ্রহণ একটি সিদ্ধ প্রক্রিয়া।  এমন কোন রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান পাওয়া যাবে না যারা এই সুযোগ গ্রহণ করে না। বেক্সিমকোকে নতুন কো‌নো ঋণের অনুমোদন দেয়া হয়নি অথবা নতুন কোন ঋণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করেনি গ্রুপটি। তাই নতুন করে ঋণ নেওয়ার যে তথ্য প্রতিবেদনে এসেছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।  

এবার আসা যাক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জনতা ব্যাংক কোন তথ্য গোপন করেছে কিনা সে প্রসঙ্গে। মূলত ২২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া এবং নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী ঋণের স্থিতি নির্ধারিত সীমার মধ্যে নিয়ে আসা সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম জনতা ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে গোপন করে করেনি।  সবকিছুই কাগজে কলমে এবং নির্দেশিত নিয়ম অনুসারেই হয়েছে তাই বেক্সিমকো ঋণ নিয়ে জনতা ব্যাংক তথ্য গোপন করেছে এমন অভিযোগটিও সত্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন।  প্রকৃত সত্য হচ্ছে, এই ঋণগুলো কয়েক দশক ধরে গ্রহণ করা হয়েছে এবং প্রতিবেদনে উল্লেখিত অনেক কোম্পানির শুরু থেকেই নেওয়া হয়েছে।  প্রত্যেক কোম্পানিই আলাদাভাবে নিজস্ব ব্যবসা পরিচালনা করছে, ব্যবসার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাংক থেকে লোন নিচ্ছে এবং নিয়মিত পরিশোধ করছে।  এতে ব্যাংকও তাদের ব্যবসায়িক ধারাকে চাঙ্গা রাখতে পারছে যা ব্যবসার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক। দিনে দিনে এই কোম্পানিগুলো যেমন বড় হয়েছে তেমনি বেড়েছে এগুলোর ব্যাংকিং পরিধি।  অতীতে আরও অনেককে এমন ছাড় দেওয়া হয়েছে যা একটি সাধারণ ব্যাংকিং চর্চা।  

এবার একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক, জনতা ব্যাংক ও বেক্সিমকো’র লেনদেনের দিকে।  সবার জানা দরকার, জনতা ব্যাংকের সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক গ্রুপ হিসেবে কিন্তু বেক্সিমকো পুরস্কার লাভ করেছে।  ব্যাংক মারফতে জানা যায়, জনতা ব্যাংকের ২০২০ সালে মোট রপ্তানির ৬৬ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে লোকাল অফিসের মাধ্যমে। আর লোকাল অফিসের ৭৬ শতাংশ রপ্তানি সম্পন্ন হয়েছে বেক্সিমকো লিমিটেডের মাধ্যমে। এছাড়াও একক গ্রুপ হিসেবে লোকাল অফিস ও ব্যাংকের শীর্ষ রপ্তানিকারক হিসেবে অবদান রেখেছে বেক্সিমকো। এমনকি করোনাভাইরাসের কারণে অন্যান্য কোম্পানিগুলো ঋণ পরিশোধ না করলেও ২০২০ সালে কোনো কিস্তি বাকি রাখেনি বেক্সিমকো।  ২০২০ সালে ঋণের কিস্তি হিসেবে ৪২৬ কোটি টাকা প্রদান করেছে গ্রুপটি।  ২০২১ সালে বেক্সিমকো গ্রুপ জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে ১১ হাজার ৬১০ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি করেছে যা ১ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের সমমান।  শুধু বেক্সিমকো গ্রুপের মাধ্যমে জনতা ব্যাংকের মুনাফা ছিল ৭০৭ কোটি টাকা।  তাই চমৎকার একটি লেনদেনের সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এমন ভুয়া প্রতিবেদন একটি গণমাধ্যম করে তা খতিয়ে দেখা উচিত। 

প্রতিবছর দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে অবদান রাখা একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে বিকৃত তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে হেয় করতে চাওয়াটা খুব নিম্নমানের সাংবাদিকতা। তাছাড়া পুরো প্রতিবেদনটিতে বেক্সিমকোর কোন কর্তাব্যক্তির বক্তব্য নেওয়ার নূন্যত্বম সৌজন্যতাবোধটুকুও দেখানো হয়নি। একপাক্ষিক বক্তব্য উপস্থাপন করে যাওয়া হয়েছে এবং তিনটি ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে যা নিঃসন্দেহে হলুদ সাংবাদিকতা। এমন প্রতিবেদন অন্যান্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে হুমকির মুখে ফেলবে। তাই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা এই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আশা রাখছি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে। কারণ এমন পেশাদারিত্বহীন মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভরপুর কোনো প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে যদি এখনি শক্ত অবস্থান নেয়া না হয় তবে সামনের দিনে এভাবেই অন্যান্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সম্মানহানি ঘটবে গণমাধ্যমের ভুল প্রতিবেদন দ্বারা।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ইত্তেফাক/পিও