নিরন্তর এক নদী, কালের পর কাল পেরিয়ে তার বহে চলা, বাংলা কবিতা। নদীর দু পাড়ে আবহমান জনপদ, জনপদের যারা বসতি, কতরকমের মানুষ, নদীর মধ্যে কি নিহিত আছে সেই মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্ন, সংগ্রাম? নদী তো প্রবাহিত নিজের স্বভাবে, বাংলা কবিতার প্রবহমান তার কি কোনো নিজের স্বভাব আছে? নদী ভূগোলবাহিত, প্রকৃতিজাত, কবিতার সৃজন কবির হাতে। কোন কবির হাতে, সেই কবি কোন কালের? সেই কাল পাড়ি দিয়ে এসেও কবিতা যখন আরেক কালের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ে পাঠকের সামনে, সেই কবিও তখন উপস্থিত থাকেন নতুন কালের পাঠ-সুচয়নীতে। এইখানেই কবির ক্ষমতা, শারীরিক প্রয়াণের পরেও কবি উপস্থিত হন পরবর্তী সময়ের কোনো পাঠকের কাছে, অনাগত কালের কোনো গবেষকের চেতনায়। তাই আমরা দেখি যে, ১৯৪৭ সালে ভারত-উপমহাদেশ ভাগ হওয়ার প্রেক্ষিতে কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্যের একক স্থানও আর এককে থাকল না। কলকাতা থাকল বটে কলকাতার মতোই, যে কলকাতায় রবীন্দ্রনাথ, যে কলকাতায় ত্রিশের কল্লোল যুগ পড়ে রইল, সেই কলকাতা থেকে নতুন যুগের কবি-কথাসাহিত্যিকেরা বিশেষত মুসলিমগণ ফিরলেন ঢাকায়, তদানীন্তন পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানে। গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে বা মোটা দাগে ১৯৪৭-এর পর ঢাকা এক নতুন আবহাওয়ায় বিকশিত হয়ে সুযোগও পেল বটে। সেদিনের, সেই চল্লিশের দশকের তরুণ কবি আবুল হোসেন সেই নববিকশিত নতুন শহর ঢাকায় ন্যস্ত করলেন সে সব আজ সাহিত্যের ইতিহাস। তাই আজকের যিনি তরুণ কবি, ঢাকায় বসে কবিতাচর্চায় নিবিষ্ট, তাঁর পক্ষে হয়তো বা খুব সহজ নয় গত শতাব্দীর চল্লিশের দশককে, সেই রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতিতে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর আত্ম-লড়াইকে। সেইহেতু সেদিনের কবি ফররুখ আহমদ, সৈয়দ আলী আহসান, আহসান হাবীব, সানাউল হক, সুফিয়া কামাল কিংবা ‘নববসন্ত’-এর কবি আবুল হোসেনকেও বুঝতে হলে আমাদের শুধু বাংলা কবিতার ইতিহাসের দিকেই নয়, দেশভাগ তথা বাংলা ভাগের ইতিহাসের ধাক্কাটাও বুঝে ওঠার দায়বদ্ধতা থেকে যায়। পূর্ব বাংলার আধুনিক মুসলিম পারিবারিক ও সামাজিক-ধর্মীয় বন্ধনের মধ্যে সেদিনের তরুণ কবি আবুল হোসেন কীভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন, সেও এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তবে পূর্ব বাংলা সমৃদ্ধ হলো, আধুনিক বাংলা কবিতা আবুল হোসেনের কাব্যসম্ভারে, এটা তো সত্যি। আর এ কারণেই আবুল হোসেন আজও প্রাসঙ্গিক আমাদের কাব্যসাহিত্যের ভাণ্ডারে, যা নিয়ে আমরা আলোচনা করছি, কথা বলছি।
তিনি কবিতাচর্চা শুরু করেছিলেন স্কুলজীবন থেকেই। তাঁর গ্রন্থসংখ্যা ২৫টি। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নববসন্ত’ ১৯৪০ সালে প্রকাশিত হয়। অনুবাদ করা কবিতাগুলো হচ্ছে—‘ইকবালের কবিতা’, ‘আমার জন্মভূমি’, ‘অন্য ক্ষেতের ফসল’। ‘আমার এই ছোট ভুবন’ ও ‘আর এক ভুবন’ নামে দুটি স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ লেখেন। তাঁর অনুবাদ করা উপন্যাস হচ্ছে ‘অরণ্যের ডাক’। ‘পার্বত্যের পথে’ নামক ভ্রমণকাহিনিও লিখেছেন তিনি।
গবেষক আহমেদ মাওলা লিখেছেন, ‘আমাদের বাঙালি মুসলমান কবিদের মধ্যে প্রথম আধুনিক। ত্রিশোত্তর আধুনিক বাংলা কবিতার যে-ধারা উত্তরকালের কবিদের হাতে বিকশিত হয়েছিল, আবুল হোসেন ছিলেন সে-ধারার সফল উত্তরাধিকারী। জীবনদৃষ্টি ও কাব্যভাষা দিয়ে তিনি আমাদের যুক্ত করেছিলেন আধুনিকতার সঙ্গে। তাঁর সমসাময়িক মুসলমান কবিরা হলেন—আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ, বেনজীর আহমদ, আবদুল কাদির, সুফিয়া কামাল, মহিউদ্দিন, হুমায়ুন কবির, কাজী কাদের নেওয়াজ, বন্দে আলী মিয়া প্রমুখ। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের এই মুসলমান কবিরা, তাঁরা সেই সময়ে খুব পরিচিত ছিলেন। কিন্তু আধুনিকতাটা তাঁরা বুঝলেনই না। তাঁরা লিখলেন পুরনো ধাঁচের কবিতা। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিভাবান ছিলেন কবি আবদুল কাদির। তাঁর রুচি, রসবোধ ও পাণ্ডিত্য ছিল, কিন্তু তিনিও হাঁটলেন পুরনো পথে। আধুনিকতার পথে হাঁটলেন খুব স্বল্পসংখ্যক কবি—আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ, গোলাম কুদ্দুস এবং আবুল হোসেন। তাঁদের মধ্যে আহসান হাবীবের ‘রাত্রিশেষ’ (১৯৪৭), ফররুখ আহমদের ‘সাতসাগরের মাঝি’ (১৯৪৪) এবং আবুল হোসেনের ‘নববসন্ত’ প্রকাশিত হয় ১৯৪০ সালে। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধদেব বসু ও প্রেমেন্দ্র মিত্র সম্পাদিত আধুনিক বাংলা কবিতার প্রধানতম মুখপত্র ‘কবিতা’ পত্রিকায় গ্রন্থটির আলোচনা করেন নীহাররঞ্জন রায়, ‘রূপায়ণ’-এ সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত, ‘কৃষক’-এ আবুল মনসুর আহমদ, ‘সওগাত’-এ গোলাম কুদ্দুস, ‘চতুরঙ্গ’-তে শওকত ওসমান। একইসময়ে প্রকাশিত সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের (১৯১৯-২০০৩) ‘পদাতিক’-এর (১৯৪০) প্রথম কবিতা ‘সকলের গান’-এর পঙিক্ত—‘কমরেড, আজ নবযুগ আনবে না?/ কুয়াশাকঠিন বাসর যে সম্মুখে’ এবং আবুল হোসেনের নববসন্ত গ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘নবযুগ’-এর শেষ দুটি পঙিক্ত—‘কান পেতে দ্বারে সারারাত জেগে রই/ আসে আসে সে যে শুয়ে শুয়ে শুনি।’
আজকের তরুণ কবি সোহেল হাসান গালিবের বিশ্লেষণী আলোকপাত ‘তিনিই আমাদের প্রথম আধুনিক। বাঙালি মুসলমানের আধুনিকতায় প্রবেশ ঘটেছে, কবিতায়, মূলত চল্লিশের দশকে, আবুল হোসেনের হাত ধরে। একে প্রবেশ হিসেবে বিবেচনা করাই শ্রেয়, সিদ্ধি হিসেবে নয়। কেননা, এ দশক মূলত ভাবাদর্শ-পরিচালিত কবিদের উন্মেষপর্ব। পদাতিক ও সাত সাগরের মাঝি কাব্য দুটিই আমাদের সে কথা জানান দেয়। নতুন রাষ্ট্রগঠনের যে স্বপ্ন, তারই রঙের আড়ালে
পায়চারী করে চলে আসে নতুন সমাজব্যবস্থারও প্রস্তাব, আকাঙ্ক্ষা। আশ্চর্যের বিষয় এই যে আবুল হোসেন সেই অর্থে ভাবাদর্শ-পরিচালিত নন, যদিও তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম নববসন্ত। সদ্য কৈশোর পেরোনো এই তরুণেরও আছে নতুনের পিপাসা, বসন্তবাসনা, আছে প্রাগাধুনিক রোমান্টিকেরই বেদনা, কেননা এক নিঃসঙ্গ নাবিকের মতো ‘মনের দূরবীন পেতে রয়েছে সে :/ সমুদ্রের জল ছাড়িয়ে, অজানা গাছের ছায়া ফেলে,/ কত বেলাভূমি পার হয়ে/ কোথায় কোনখানে পড়বে তার দৃষ্টি,/ কোন সমতল ভূমির খড়-ছাওয়া/ ঘরের কোণে গিয়ে সে হবে স্থির।’ কিন্তু এই রোমান্টিকতার খোলস ছেড়ে স্পষ্টতই তাঁকে বেরিয়ে আসতে দেখি ‘স্বপ্ন’ কবিতায়, যখন তিনি বলেন : ‘আমরা পাইনি তৃপ্তি উড়ন্ত ডানায়,/ আমরা পাইনি তৃপ্তি স্বপ্নসুষমায়।/ আমরাও স্বপ্ন দেখি। তারা পচে মরে/ শতাব্দীর শাহারায় বন্দরে বন্দরে।’ রবীন্দ্র-পরিশ্রুত রোমান্টিকতা ও ন্যারেটিভিটিকে আশ্রয় করে তাঁর কাব্যারম্ভ। পরবর্তী সময়জুড়ে নানা অভিঘাতে ঘটেছে নানা অভিক্ষেপ। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘বিরস সংলাপে’ই সুর পাল্টে যাওয়া লক্ষ করি। প্রথম কবিতার শুরুটাই ভিন্ন অবলোকনে : ‘সারাদিন সূর্য ছুড়েছে নেপাম বোমা/ আর তারই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চীনে নববর্ষের হাওয়া/ গেসোলীনে ভিজিয়েছে সমস্ত ব্যাঙ্কক। শুঁটকির গন্ধে ভরে ঝলসানো নীল।’
ব্যঙ্গ কবিতার ভেতর বরং আবুল হোসেনকে বেশ তীর্যক দৃষ্টিভঙ্গিসহ আবিষ্কার করি আমরা। ‘অভ্যন্তরীণ ব্যাপার’ কবিতায় তিনি সরকারি বয়ানের প্রতিধ্বনি করছেন এভাবে : ‘কাকে ধরব কাকে মারব/ কার বাড়িঘর লুটব ভাঙব/ সে তো আমার নিজের ব্যাপার।/ আমরা না এক সার্বভৗম স্বাধীন সরকার।’ কিন্তু এখানেও প্রশ্ন থেকে যায়। সরকারের ভণ্ডামি আমরা টের পাই ঠিকই, কিন্তু, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক রাজনীতি থেকে যায় আড়ালে, সংশয়াতীত। পক্ষান্তরে ‘শেষ কথা’ কবিতায় আমরা শুনতে পাই যথার্থ বাক্য : ‘মাফ করে দাও ছেলেমানুষী—/ অকালপক্ব বাহাদুরী।/ এত দিনে বুঝি যতই না কেন মাথা খুঁড়ি/ কিছুই হবে না, না হলে তোমার একটু খুশি।’ কিংবা, ‘জনগণের বাসর’ কবিতায় : ‘আপনি যাবেন কাটতে ফিতে/ মুহুর্মুহু হাততালিতে।/ আমরা দেখব দূর থেকে তা—/চিরকালের আমজনতা।’ ছোটদের জন্য লেখা ছড়াতেও এই উলট পুরাণের বাস্তবতার মুখোমুখি তিনি দাঁড় করিয়েছেন আমাদের : দেখছ না ভাই তারাই এখন/ নিয়েছে যে রাজার আসন।/ সুয়োরা সব টানছে ঘানি,/ দুয়োরাই তো আসল রানী।’
কবি আবুল হোসেন তাঁর সাক্ষাত্কারে এভাবে বলেন যে, ‘কাব্যিকতাকে আমি ঘৃণা করি। কারণ, বাংলায় একটা কাব্যিক ভাষা গড়ে উঠেছিল, যা সাধারণ মানুষের ভাষা থেকে অনেকখানি ভিন্ন। কবিতায় আমি এই কৃত্রিমতা বর্জন করতে চেয়েছি। কবিকে আমি বিশেষ জীব বলে কখনো ভাবিনি। কবিও সমাজের অন্যান্য লোকের একজন। আমি নিজের পথটা খুঁজতে চেয়েছিলাম। কাব্যের একটা প্রচলিত ভাষা আছে, যে ভাষায় বা রীতিতে লিখলে সহজেই কবিখ্যাতি পাওয়া যায়, কিন্তু সেই সোজা সড়কে চলতে ইচ্ছে হয়নি আমার। অনেক পাঠক ভাবেন, আমি কেবল গদ্য কবিতা লিখি, মজার বিষয় হলো, আমার গদ্য কবিতা খুব কম। কথ্যরীতি ব্যবহার করে বাংলা কবিতা ক্রমেই সাধারণ লোকের কাছাকাছি আসতে পারবে। তাই আমি কথ্যরীতির প্রতি মনোযোগ দিয়েছি। আমার সৌভাগ্য কলকাতাকে আমি আমার প্রথম জীবনেই পেয়ে গেছি। সেই সময় কলকাতাই ছিল বাংলা সাহিত্যের তীর্থভূমি। মাধ্যমিক শেষ করে প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতি নিয়ে পড়তে গেলাম আমি। তারপর হয়ে গেলাম ওই কলেজের রবীন্দ্র সম্পাদক। ওখানে যাওয়ার পর প্রেমে পড়া, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্বয়ং চোখে দেখা, জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে পরিচয়, দেখা-সাক্ষাত্—সব মিলিয়ে কিংবা কবিতার রুচিবোধ বদলে যাওয়া, এসব কি আর কলকাতাকে না পেলে হতো! আজীবন শহরে মানুষ হয়েছি আমি। ছোট-বড় যা-ই হোক, সব শহরের চেহারা ও মেজাজ—গ্রাম থেকে ভিন্ন। গ্রামে প্রায় কখনো থাকিইনি। গ্রামীণ জীবনও তেমনভাবে ভেতর থেকে দেখার কখনো সুযোগ হয়নি। সত্যি বলতে কি, গ্রাম আমাকে তেমন আকর্ষণও করেনি। দুটো কি তিনটের বেশি কবিতা হবে না আমার, যার পটভূমি গ্রাম। মনের সংবেদনশীলতাটা যখন সবচেয়ে বেশি, সেই সময়টা আমার কেটেছে কলকাতায়। কলকাতাই ছিল তখন এ উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় শহর। এর ভেতরে ডুবেছিলাম আমি। নাগরিকতা বলতে তো শুধু ইট, কাঠ, পাথর, কংক্রিটের ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, হাসপাতাল, হোটেল, ট্রাক, বাস, মোটর গাড়ি, ট্রেন, ইলেকট্রিসিটি বোঝায় না। নাগরিকতাটা হলো মনের—গ্রামের মন থেকে যা ভিন্ন, সেটা ধরা পড়ে বক্তব্য, বিষয় ও ভঙ্গি, কথা বলার ধরন আর উপমা ও চিত্রকল্পে। আমার প্রথম দিকের যে কবিতাগুলো মানুষজনের চোখে পড়েছিল—‘ডাইনামো’, ‘ট্রেন’, ‘ডি এইচ রেলওয়ে’, ‘ঘোড়সওয়ার’, ‘বাংলার মেয়ে’—এগুলো কি কলকাতায় বা শহরে না থেকে লেখা যেত? অনেকদিন আগে একটা কবিতায় বলেছিলাম, ‘প্রচুর পয়সা কখনো চাইনি, বিত্তের পিছে ছুটতে যাইনি।’ মোট কথা মানবিকতাবোধকেই জীবনের সারবস্তু বলে গ্রহণ করেছি আমি। শহরের বৈচিত্র্য, বৈষম্য, ঐক্য-অনৈক্য, সংগতি, শৃঙ্খলা-বিশৃঙ্খলার মধ্যে বেড়ে না উঠলে কি এ বোধে পৌঁছাতে পারতাম? সেই ছত্রিশ/সাঁইত্রিশ সাল থেকে আমি আধুনিক কবিতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আমি যদিও সুরেলা কবিতা লিখি না, কবি সম্পর্কে আমার নিজের ধারণা দানা বেঁধে ওঠার পর থেকে অন্তত সে রকম আর লিখিনি, তবু আমি ভুলিনি যে সব ভালো কবিতায় ছন্দ, ধ্বনি, অনুপ্রাস অপরিহার্য, কিন্তু বেশি মিষ্টি কবিতা ভাবালুতায় ভরে থাকে। আমরা যখন লিখতে শুরু করি, তখনকার কবিরা তা ভুলে বসেছিলেন। অবশ্যই রবীন্দ্রনাথের বৃত্তে ঘুরতে ঘুরতে।
রবীন্দ্রনাথের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে আমারও অনেক দিন লেগেছিল। তবু খুব ছোটবেলা থেকেই লিখতে শুরু করেছিলাম বলে রবীন্দ্রনাথের বলয় থেকে যখন বেরিয়ে এলাম, তখনো আমার বয়স খুব কম। সেই সাহস পেয়েছিলাম তিরিশের কবিদের কাছ থেকে; তাঁদের সান্নিধ্যে। এ সব তো আমার কলকাতার স্মৃতি, ভুলি কেমনে! তাঁদের সেই নতুন কবিতার আন্দোলন, আধুনিক বাংলা কবিতা, তখন সবে দানা বেঁধে উঠেছে। মফস্বল শহর থেকে কলকাতায় এসে প্রেসিডেন্সি কলেজে ঢুকেছি। সেই কলেজ থেকে সমর সেন বেরিয়ে গেছেন কি বেরোননি। তাঁর লেখা নিয়ে খুব মাতামাতি হচ্ছে তখন। অধ্যাপকেরা পছন্দ করছেন না। সুবোধ সেনগুপ্ত, সোমনাথ মৈত্র, গৌরী ভট্টাচার্যরা রবীন্দ্রনাথেই ডুবে আছেন। ক্বচিত্ নজরুলের নাম করেন। আমি কলেজের ম্যাগাজিনে গদ্য কবিতাকে দুয়ো দিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখলাম। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকেই সরাসরি আক্রমণ। ‘রবীন্দ্রনাথ ও গদ্য কবিতা’ নাম দিয়ে মাসিক মোহাম্মদীতে দুই সংখ্যায় দীর্ঘ আলোচনা লিখি। সেই পাকামোর কথা ভাবলে আজ হাসি পায়। তবে মোদ্দা কথাটা কিন্তু একেবারে ভুল ছিল না। লেখাটা রবীন্দ্রনাথের চোখে পড়েছিল। ‘মোহাম্মদীর লেখকে’—এই শব্দবন্ধের উল্লেখ করে গদ্য ছন্দ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন প্রবাসী পত্রিকায়। সে সময় আমি গদ্য কবিতাকে গাল দিচ্ছি বটে, কিন্তু সমর সেন মনের ভেতর ঢুকে তাঁর কাজ করে গেছেন। গদ্য কবিতা তো রবীন্দ্রনাথ কত আগেই লিখেছেন। এর থেকে সমর সেন একেবারেই আনকোরা। তাঁর ভাষা, ছন্দ, বলার ভঙ্গি রবীন্দ্রনাথ থেকে যোজন যোজন দূরে। এ কবির কবিতায় কাব্য ছিল, কাব্যকল্পনা ছিল না। তাঁর গদ্য কবিতা যে কীভাবে সমগ্র বাংলা কবিতার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল, সে স্বীকৃতি তাঁর জোটেনি। তবে আমি কারও মতো লিখিনি। নিজের কথা নিজের মতো করে বলার চেষ্টা করেছি। আমার কাছে আমার কলকাতা পর্বকেই নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় বলে মনে হয়। কারণ, দেশভাগ না হলে আমি হয়তো আরও ভালো লিখতে পারতাম—এই আক্ষেপ কি মুছে ফেলা যাবে?’
এই কবি, আবুল হোসেন স্মরণীয় হয়ে থাকেন আমাদের কাছে, বাংলা কবিতার পাঠকের কাছে। আজকের তরুণ কবিও তাই আবুল হোসেনের কাছে যান, ঋণী থাকি আমি।
