একটি উদ্ভট ক্রিকেট ম্যাচের কাহিনি

আপডেট : ২৭ জুন ২০১৯, ২০:০৭

হ্যারল্ড ম্যাকফারলেন রচিত ‘অ্যা ম্যাচ ফর অ্যা মিলিয়ন’ গল্পটি ছোটগল্প কিংবা ক্রিকেট খেলা সংক্রান্ত রচনার সেরা দৃষ্টান্ত নয়। তবে ক্রিকেট ঐতিহাসিক অরুনাভ সেনগুপ্ত মনে করেন, ক্রিকেট নিয়ে এ যাবত্ যত গল্প লেখা হয়েছে, তার মধ্যে এটা সম্ভবত সবচেয়ে বেশি অদ্ভুত বা কৌতূহলোদ্দীপক।

সে যুগের ইংল্যান্ডের স্কুল বালকদের জন্য ‘দি ক্যাপ্টেন’ নামে ম্যাগাজিনটি ১৮৯৯ সাল থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিমাসে প্রকাশিত হতো।

লন্ডনভিত্তিক এই ম্যাগাজিনে তরুণদের জন্য গল্প ও কবিতা ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, ঘটনা এবং সমসাময়িক ত্রিকেট এবং ফুটবল খেলার ফলাফল নিয়েও রচনা থাকত।

তবে ঔপন্যাসিক পিজি উডহাউস রচিত ‘স্কুলের গল্পগুলো’ প্রকাশের জন্যই আজকাল এই ম্যাগাজিনটি সবিশেষ পরিচিত। ম্যাগাজিনটির বিভিন্ন সংখ্যার পাতা উল্টালে ‘টেইলস অব সেইন্ট অস্টিন’-এর বেশকিছু অংশ খুঁজে পাওয়া যায়। এছাড়া ‘মাইক’ উপন্যাসটি খণ্ড খণ্ডভাবে এই ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল, যা এখনো ম্যাগাজিনটির বিভিন্ন সংখ্যায় দেখা যায়। সবশেষে উল্লেখ করা উপন্যাসটিতে, মাইক জ্যাকসন নামে অসাধারণ ক্রিকেট প্রতিভাসম্পন্ন একজন স্কুলবালকের কার্যকলাপ তুলে ধরা হয়েছে। এই স্কুলবালকটির মাঠের বিভিন্ন কার্যকলাপ ছাড়াও তার সহপাঠী অতুলনীয় ক্রিকেটার পিস্মিথের সঙ্গে আমাদের এখানেই প্রথম পরিচয় হয়।  

পিজি উডহাউসের যে কোনো ভক্ত অবশ্যই ‘দি ক্যাপ্টেন’ ম্যাগাজিনের পুরনো সংখ্যাগুলোর পাতা উল্টাতে পছন্দ করবেন, তবে তিনি যদি একজন ক্রিকেটপাগল মানুষ হন, তবে সত্যি সত্যি কিছু অবিশ্বাস্য বা বিস্ময়কর ঘটনার বিবরণ এখানে খুঁজে পাবেন। 

অনেক সংখ্যায় অলরাউন্ডার ক্রিকেটার ডব্লিউ জি গ্রেস সম্পর্কে পূর্ণ ফিচার, সঙ্গে মজার মজার সত্য ঘটনা, স্কেচ এবং গ্রেসের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ছবিও এতে রয়েছে। এসব খুব একটা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। সমসাময়িক ক্রিকেট খেলোয়াড়দের সম্পর্কেও বেশকিছু রচনা ম্যাগাজিনের বিভিন্ন সংখ্যায় দেখা যায়, যার মধ্যে কয়েকটি রচনা করেছিলেন ক্রিকেটার ও রাজনীতিবিদ সি বি ফ্রাই। এছাড়া বিভিন্ন রচনায় বিগত দিনের স্কুল ক্রিকেট ম্যাচের রেজাল্টও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। 

এবং সবশেষে ক্রিকেটের ওপর ভিত্তি করে রচিত কয়েকটি পূর্ণাঙ্গ গল্পও ম্যাগাজিনটিতে প্রকাশিত হয়েছে।

এটা অবশ্য খুব একটা বিরল ঘটনা নয়। গত শতকের শেষ দিকে এই অনবদ্য খেলাটি নিয়ে বড়-ছোট সব লেখকই অনেক গল্প লিখেছেন। আমরা ইতিপূর্বেই উল্লেখ করেছি, লেখক পিজি উডহাউস অত্যন্ত অধ্যবসায়ের সঙ্গে পাবলিক স্কুলের পিচের আশপাশের ঘটনাবলি থেকে তাঁর গল্পের প্লট তৈরি করতেন। স্যার আর্থার কোনান ডয়েল কিছু সময়ের জন্য শার্লক হোমসের রোমাঞ্চকর কাহিনি এবং চ্যালেঞ্জার সিরিজ রচনায় বিরতি দিয়ে ‘স্পেডেগিউ’স ড্রপার’ নাম একটি ছোট গল্প রচনা করেছিলেন। এছাড়া লেখক-সাংবাদিক হাফ দ্য সেলিনকোর্ট থেকে শুরু করে সিগফ্রিড স্যাসন পর্যন্ত আরো অনেকেই একইপথে চলেছিলেন।

দি ক্যাপ্টেন ম্যাগাজিনের পাতায় পাতায় বিভিন্ন ধরনের লেখকের সবধরনের ক্রিকেটের গল্প প্রকাশিত হতো। তাই এটা বেশ স্বাভাবিক যে কিছু কিছু অদ্ভুত বা আজব ধরনের কাহিনিও পাঠকের চোখে পড়ত। 

১৮৯৯ সালের বড়দিনের সংখ্যায় আমরা এ ধরনের একটি গল্পের দেখা পাই। অ্যা ম্যাচ ফর অ্যা মিলিয়ন শিরোনামের গল্পটি রচনা করেছিলেন হ্যারল্ড ম্যাকফারলেইন।

 

শিম্পাঞ্জির ঘূর্ণিবল বা টুইস্টার

 

ব্যক্তিগতভাবে আমি ক্রিকেট নিয়ে রচিত প্রচুর উপন্যাস পড়েছি। যার মধ্যে হাস্যরসাত্মক        অপরাধমূলক উপন্যাস ‘দি এমাজিং টেস্ট ম্যাচ ক্রাইম’ থেকে শুরু করে গ্যারি সোবার্স রচিত ‘বোনাভেন্টুর অ্যান্ড দি ফ্ল্যাশিং ব্লেড’ নামে কল্পবিজ্ঞান কাহিনিও রয়েছে। এছাড়াও সবধরনের এবং বিভিন্ন রুচির কাহিনিও পড়েছি।

তবে আমাকে অবশ্যই বলতে হবে যে, অ্যা ম্যাচ ফর অ্যা মিলিয়ন-এর মতো এমন জঘন্য বা নীতিবিবর্জিত কাহিনি আমি আর কখনো দেখিনি।     

তখনকার দিনের পাঠকপ্রিয় জনপ্রিয় কাহিনির রীতিতে গল্পটি রচিত হয়েছিল। এতে বিখ্যাত ক্রিকেট খেলোয়াড় ডু কেইনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ক্রিকেট ম্যাচের বর্ণনা রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের চ্যাম্পিয়ান ব্যাটসম্যান ডু কেইন কাউন্টি সার্কিটেও একজন অতিপ্রজ ব্যাটসম্যান ছিলেন। একবার তিনি টেন্ট ব্রিজ উইকেটে ৮৭ রান করেছিলেন, এটাকে তাঁর সেরা ইনিংস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে কাহিনির সন্ধ্যায় দেখা যায়, ব্যাটসম্যান একটি আরামদায়ক ফায়ারপ্লেসের সামনে বসে তাঁর সবচেয়ে ‘উল্লেখযোগ্য’ ইনিংস খেলার বর্ণনা করছেন। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কথাটিকে আক্ষরিক অর্থেই ধরতে হবে। 

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ডু কেইন বড়দিনে একটি ক্রিকেট ম্যাচের বর্ণনা করলেন। এবং স্বভাবতই তাঁর সঙ্গী ধরে নিলেন যে, খেলাটা অস্ট্রেলিয়ায় হয়েছিল, কেননা এই বিখ্যাত ব্যাটসম্যান আসলেই সেখানে কয়েকটি সফল শীতকাল কাটিয়েছিলেন। তবে ডু কেইন বরং উল্টো উত্তর দিলেন যে, খেলাটা ইয়র্কশায়ারের উত্তরাঞ্চলের কাউন্টিতে হয়েছিল।

তারপর তিনি তাঁর সেই ভয়ঙ্কর কাহিনি বলা শুরু করলেন।   

দীর্ঘ এক ট্রেন জার্নির কাহিনি দিয়ে গল্পটা শুরু হয়েছে। প্রাক্তন বাগদত্তার সঙ্গে দেখা করার জন্য তিনি ট্রেনে চড়ে যাচ্ছিলেন। পথে প্রচুর তুষারপাত হওয়ায় তরুণ প্রাণোচ্ছল ক্রিকেটার ট্রেন থেকে নেমে পায়ে হেঁটে বাকি পথ পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করলেন। আর পরিণতিতে তিনি একজন বৃদ্ধ এবং ধনী কৃষকের সঙ্গে রাত কাটালেন, যিনি ক্রিকেট খেলার একজন দারুণ ভক্ত ছিলেন। 

এখান থেকেই রচনাটির বাচনভঙ্গি মাঝে মাঝে বেশ অস্বাভাবিক বা খুবই আনুষ্ঠানিক ক্লিষ্ট মনে হয়েছে। এছাড়া নিম্নমানের এবং অপ্রয়োজনীয় ক্রিকেটীয় উপমাও এর জন্য কম দায়ী ছিল না।

একটি দৃষ্টান্ত এরকম ছিল, ‘উত্তর অটারিংটনে যখন আমি দ্বিতীয়বারের জন্য খেলার পোশাক পরছিলাম, তখন যে তুষারঝড় জেগে উঠছিল, সেটা আমাদের ইঞ্জিনের জন্য দ্রুত স্কোর করার  প্রতিশ্রুতি বয়ে আনেনি।’ এবং এরপর আবার—‘আমি বুঝতে পারলাম, আমার খেলায় যে আত্মরক্ষামূলক কৌশল জেগে উঠেছে, তাতে ঘণ্টাপ্রতি স্কোরের হার শূন্যে নেমে আসবে।’

তবে মাঝেমাঝেই প্রত্যাশিত রসবোধ অর্জিত হয়েছিল। যেমন, যখন ডু কেইনের ফিঁয়াসি গ্রেস এডেন তাঁর সঙ্গে এনগেজমেন্ট ভেঙে দেন, তখন ডু কেইন বলেছিলেন, ‘তাকে আমার ক্রিকেট খেলাকে অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে সবসময় অনুসরণ করতে হবে এবং আমি প্রত্যাশা করি যে, প্রতিপক্ষ যেন আমাকে যথেষ্ট সুখী জীবন দেন।’

তবে নিচে যা বর্ণিত হলো, তার জন্য আমরা মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না।

ডু কেইনের নামহীন আতিথ্যকর্তা বা হোস্ট একজন পাগলাটে ধরনের মানুষ ছিলেন। অনেক কৌশল আর ভয়ভীতির মাধ্যমে তিনি ডু কেইনকে একটি নারকীয় বা শয়তানসুলভ বাজিতে ব্যাট করার জন্য প্রলুব্ধ করেছিলেন।    

তাঁর হোস্ট নিকটেই একটি গির্জার ভূগর্ভস্থ কক্ষ খুলে তাঁকে দেখালেন, যেখানে রাজা অষ্টম হেনরির আমলের মালিকানাবিহীন বিশাল ধনভাণ্ডার সঞ্চিত ছিল। ওই জায়গার বেশ কাছেই একটি কৃত্রিম ইনডোর উইকেটও ছিল।

ডু কেইনের জন্য বাজি ধরা হয়েছিল, সেই উইকেটে তাঁকে চিন নামে একজন বদমেজাজী বা দুর্বিনীত বোলারের বোলিংয়ের বিরুদ্ধে ডবল সেঞ্চুরি করতে হবে। যদি তিনি সফল হন, তবে সেই দাবীদারহীন ধনভাণ্ডার তাঁর হবে। আর যদি তাঁর স্ট্যাম্পে বল আঘাত করে, তবে ব্যাটসম্যানের বুক এবং মাথায় গুলি ছোড়া হবে। আর ব্যাটসম্যান যদি এলবিডব্লিউ হন, তবে তাঁকে চিনের সঙ্গে আমরণ কুস্তি লড়তে হবে।

ব্যাপারটা আরো জটিল হয়ে দাঁড়াল, যখন দেখা গেল চিন আসলে একটি ‘বিশালাকৃতির শিম্পাঞ্জি জাতীয় প্রাণী।’  

তিনি যে একজন অপেশাদার খেলোয়াড়, একথা বলে ডু কেইন বাজি থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করলেন, তবে এতে কাজ হলো না। অগত্যা প্রাণ বাঁচাবার তাগিদে এই বানর প্রাণীর বোলিং মোকাবেলা করতে তিনি বাধ্য হলেন।

ডু কেইন বর্ণনা করলেন—‘আমার সবসময় একটা ধারণা ছিল যে, বাহুর ত্রুটিপূর্ণ গঠনের কারণে গরিলা, বনমানুষ, এ ধরনের নরসদৃশ প্রাণীর হাত ঘুরিয়ে বোলিং করা অসম্ভব। তবে আমি দেখলাম যে, চিনের ব্যাপারে আমার ধারণাটা ভুল প্রমাণিত হলো, সে একেবারে নিখুঁত স্টাইলে বোলিং করল। অসম্ভব লম্বা হাত দিয়ে সে বিখ্যাত অস্ট্রেলিয়ান বোলার [হাফ] ট্রাম্বলের মতো অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে ব্যাটসম্যানকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য বলটা ডানে বাঁয়ে ফ্লাইট করাতে লাগল।’ 

এখানে ট্রাম্বলের সঙ্গে তুলনার ব্যাপারটিই মনে হয় কাহিনির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।

এর বেশ কয়েক বছর পর আরেক অস্ট্রেলীয় খেলোয়াড়, আরেকটি বনমানুষের সঙ্গে নিজের তুলনা করার ব্যাপারে আপত্তি তুলেছিলেন, যদিও অফ-স্পিনার হিসেবে তিনি ট্রাম্বলের সমকক্ষ ছিলেন না। তবে লোকে বলে এটা তেমন উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল না।

ম্যাচ যতই এগিয়ে চলল, গল্পের কাহিনি ততই এক কিম্ভূতকিমাকার ক্লাইমেক্সের দিকে ছুটে চলল।

সাহিত্য কিংবা ক্রিকেট সম্পর্কিত রচনা হিসেবে খুব একটা সেরা মানের না হলেও, ক্রিকেট সম্পর্কে যাদের বিশেষ আগ্রহ রয়েছে, তাদের জন্য অ্যা ম্যাচ ফর অ্যা মিলিয়ন গল্পটি একটি সঠিক আবিষ্কার।

 

ক্রিকেট কাউন্টি.কম, ২৮ মে, ২০১৭ থেকে অনূদিত।