মা চেঁচিয়ে ডাকলেন, এই মিনু, মিনু! ঐরাবত দেখবি? আয় তবে দেখে যা।
মায়ের কথা শুনে থতমত খায় মিষ্টি মেয়ে মিনু। সবে সে স্কুলে যেতে শুরু করেছে। ঐরাবত কী, সে জানেই না।
ব্যাপারটা বুঝতে পেরে মা মুচকি হেসে বললেন, ঠিক আছে মিনু, তোকে ঐরাবত দেখতে হবে না, তুই হাতি দেখবি?
এবার কিন্তু খুব উত্সাহ দেখায় মিনু। হৈ হৈ করতে করতে সে বাসা থেকে বেরিয়ে আসে। মা হাত তুলে দেখান, ওই তো ঐরাবত। মানে হাতি।
হাতি দেখতে তার উত্সাহ আর ভয় দুটোই আছে। উরি ব্বাস! কী বড় বড় থামের মতোন পা! কান তো নয়, যেন দুখানা কুলা। আর ওই শুঁড়টা! আফ্রিকান নীল গাইয়ের লেজের মতোন দ্যাখো ড্যাঙ ড্যাঙ করে নাচছে!
ততক্ষণে মায়ের সঙ্গে মিনু রাস্তায় এসে পড়ে। হাতিটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে কী যেন করছে। তার পিঠে চেপে বসে আছে একজন। মা বললেন, ওর নাম মাহুত। মানে যে হাতির খেদমত করে বা হাতি চালায়।
কিছুক্ষণ দেখেটেখে মিনু মরা গলায় বলল, মা দ্যাখো, তোমার ওই ঐরাবত কেমন শুকিয়ে গেছে। ও কিন্তু মোটেও ছবির হাতির মতোন নাদুসনুদুস নয়। কী করে এমন শুকাল বলো তো মা?
মাও বেশ নজর করে দেখলেন হাতিটা। তা-ই তো! হাতিটা এমন মরো মরো কেন! শুকিয়ে যেন আমসি। পরে অবশ্য তিনি নিজেই বুঝিয়ে বললেন, দেখ মা মিনু, হাতিটার তো জঙ্গলে থাকার কথা, কিন্তু সে উঠে এসেছে শহরের রাস্তায়। এখানে কি তার পছন্দমতো খাদ্যখানা সে পায়!
হাতিরা কী খায় মা? বেণি দুলিয়ে অমনি প্রশ্ন করে মিনু।
কী খায় না তা-ই বল! মা হাসলেন। তবে হাতির সবচে প্রিয় খাদ্য কী জানিস—কলাগাছ। কলাগাছ পেলে তার আর কিচ্ছু চাই না। কিন্তু এই শহরে মাহুত কলাগাছ কোথায় পাবে! কলাবাগানে তো আর কলাগাছ নেই।
তাহলে সে কী খায় এখন? মিনু বলল। তখন তাকে খুব চিন্তিত দেখায়, যেন হাতির জন্যে তার দরদ উপচে পড়ছে।
এই প্রশ্নের উত্তর জানেন না মিনুর স্কুলশিক্ষক মা। ঢাকা শহরে এমন কী আছে, যা খেয়ে হাতির পেট ভরতে পারে! নাহ, কিচ্ছু নেই। এটা একটা জ্যাম আর জ্বালাতনের শহর। এই শহরের মানুষেরা কেউ ভালো নেই, সুখে নেই। আনমনে বললেন তিনি।
মিনু খেয়াল করে, হাতিটা খুব অনিচ্ছায় হাঁটছে। মাহুতটা তাকে ছোট্ট লোহার শলার মতো কিছু একটা দিয়ে পিঠে খোঁচা মারে, তখন হাঁটে হাতিটা। অল্প অল্প লেজ নড়ে তার। হাতির লেজ দেখে খুব মজা পায় মিনু। এত্তবড় হাতিটার একটুখানি লেজ! হি হি হি!
মাহুত ইশারা করলেই হাতি গাড়ি থামিয়ে তার শুঁড় তুলে টাকা চায়। তার মানে ভিক্ষা করছে হাতি! ছি ছি! কী লজ্জার কথা!
হাতির পিছে পিছে মিনু ও তার মা হাঁটে। হাতির পিঠে অনেক ময়লা। কতদিন গোসল করেনি কে জানে!
মিনু আঙুল তুলে বলল, ওই মহুত, হাতিকে গোসল করাও না কেন! ওর পিঠে যে পোকা পড়বে! নিয়মিত গোসল না করালে হাতির গরম লাগে না বুঝি!
মাহুত ওর কথার জবাব দেয় না। সে হাতিকে আবারও শলা দিয়ে খোঁচা মারে। চল চল হাট, সামনে যাই।
মিনু অবাক হয়ে লক্ষ করে, হাতিটা কাঁদছে। সে বলল, দ্যাখো মা, হাতির চোখ দিয়ে পানি গড়ায়। তার মানে ও কাঁদছে।
মিনুর কথা মিছে নয়, সত্যি সত্যি হাতির চোখে পানি। ওর মা ঠিক ধরতে পারেন না, হাতিটা কাঁদছে কেন! নাকি ঠান্ডা লেগে ওর চোখ উঠেছে! তা আবার উঠবে না! হাতি জঙ্গুলে প্রাণী। ইট-কাঠ পাথরের এমন নিষ্প্রাণ শহরে কি ওর ভালো লাগে! না খেতে পেয়ে ওর পেটটা কেমন চুপসে গেছে দ্যাখো।
হাতির কান্না দেখে মিনু খুব কষ্ট পায়। মাহুত হাতিটাকে আর দাঁড় করায় না। একখানে বসে থাকলে কি তার কামাই হবে!
আহারে অবোলা হাতি! মনে মনে বলেন মিনুর মা। নগরে এমন ঐরাবত ঠিক মানায় না।
