কী অসহ্য গরম! ঘরে-বাইরে টেকা দায়। শুধু কি শহরে? না বন্ধুরা! গ্রামেও একই চিত্র। গরমে বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে স্বাভাবিক জীবনযাপন। তোমরা তো জানো, বাংলাদেশ গরম কিংবা শীতপ্রধান দেশ নয়। নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার দেশ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। পৃথিবীর খুব কম দেশেই ছয়টি ঋতু আছে। বেশিরভাগ দেশে একটি-দুটি বড়জোর চারটি ঋতু পাওয়া যায়। আমাদের আছে ছয় ছয়টি ঋতু। এমন দেশে জন্মানোর সৌভাগ্য ক জনের হয় বলো!
কিন্তু কষ্টের কথা কী জানো! দিন দিন ষড়ঋতুর চিরচেনা রূপ হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের জন্মভূমি থেকে। প্রচণ্ড গরম আর তীব্র শীতের দেশ হয়ে উঠছে আমাদের এ দেশ। এটি সত্যিই এদেশের মানুষ এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি। শেষ কয়েক বছরে তীব্র শীত ও গরমের কারণে বেশ সংখ্যক মানুষ মারা গেছে, অনেক বেশি মানুষ নানান জটিল ও কঠিন রোগে ভুগেছে। আবহাওয়ার এমন বৈরী আচরণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তোমাদের মতো ছোট্ট বন্ধুরা।
হায়! বড়রা যদি বুঝত, পৃথিবীকে ছোটদের বসবাসের উপযোগী রেখে যাওয়ার দায়িত্ব তাদের কাঁধেই, তাহলে এভাবে ভুগতে হতো না বর্তমান এবং ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে। একটু খুলেই বলি—প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য প্রকৃতির উপাদানগুলো অর্থাত্ বন-নদী-পাহাড়-বাতাস ইত্যাদি সঠিক পরিমাণে থাকা জরুরি। বলতে খারাপ লাগছে যে, বিগত দিনগুলোতে আমরা নদী মেরে ফেলেছি, বনভূমি উজাড় করেছি, পাহাড় ধ্বংস করেছি, বাতাস দূষিত করেছি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, প্রকৃতিকে আঘাত করলে প্রকৃতি ফের আঘাত করে। নিউটন বলেছেন, প্রতিটি ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। এই যে প্রকৃতি আমাদের সঙ্গে বৈরী আচরণ করছে, এর কারণ হলো—আগে আমরা প্রকৃতির সঙ্গে নির্মম আচরণ করেছি। প্রকৃতি এখন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে মাত্র। এটা সত্যিই হতাশার কথা। কিন্তু তোমরা চাইলেই এদেশকে আবার সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা করে গড়ে তুলতে পারবে। হ্যাঁ বন্ধুরা, তোমরাই পারবে। প্রয়োজন শুধু ইচ্ছাশক্তির। জানো তো, ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়।
এখন চলছে বর্ষাঋতু। এই ছোট্ট বয়সে তোমরা যে কাজটি করতে পারো তা হলো, বেশি করে গাছ লাগাতে পারো। প্রতি বছর যদি অন্তত একটি করে গাছও লাগাও দেখবে একসময় তোমার বাসায়, বারান্দায়, ছাদে, বাড়ির আঙিনায় চমত্কার বাগান গড়ে উঠেছে। সে বাগানের নামকরণ না হয় তোমার নামেই কোরো। গাছ শুধু লাগালেই হবে না, যত্নও নিতে হবে। প্রতিদিন যেমন প্রিয় বন্ধুর খোঁজখবর নাও, তার সঙ্গে আড্ডা দাও, খেলা করো; ঠিক একইভাবে গাছের সঙ্গেও আড্ডা দিতে হবে। হাসতে হবে। মন খারাপ থাকলে শেয়ার করতে হবে। তুমি যদি গাছকে বন্ধু বানাতে পারো, একসময় মানুষের মতো গাছের বন্ধুত্বও অনুভব করতে শুরু করবে।
কেন গাছ লাগানো এত গুরুত্বপূর্ণ? আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন অক্সিজেন। আমরা গাছ থেকে অক্সিজেন নিই। সে অক্সিজেন আমাদের ফুসফুসে ঢুকে কার্বন ডাই-অক্সাইড হয়ে বেরিয়ে আসে। তোমরা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছ, আমাদের নিঃশ্বাস খুবই গরম। তো বেরিয়ে যাওয়া নিঃশ্বাসের তাপে পৃথিবী সেদ্ধ হয়ে যেত যদি গাছবন্ধু তা টেনে না নিত। গাছ কার্বন ডাই-অক্সাইড টেনে নেয় বলেই পৃথিবী গরমে সেদ্ধ হয়ে যায়নি। আমাদের দেশে গাছ কমে যাওয়ার কারণেই গরমে অতিষ্ট হয়ে উঠেছি আমরা।
তোমরা বইয়ে পড়েছ, প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য একটি ভূখণ্ডের ২৫ শতাংশ বনভূমি প্রয়োজন। জাতিসংঘের হিসাবমতে, বাংলাদেশের বনভূমির পরিমাণ মাত্র ১৩ শতাংশ! যা প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। তো এই ভয়াবহ পরিস্থিতি কমিয়ে আনতে গাছ লাগানোর কোনো বিকল্প নেই। পৃথিবী তোমাদের। একে বাসযোগ্য রাখার দায়িত্বও তোমাদেরই নিতে হবে। আর সেটা শুরু করো এখন থেকে, আজ থেকেই। তোমাদের পরবর্তী প্রজন্ম গভীর মমতার সঙ্গে স্মরণ করবে তোমাদের এই পৃথিবী গড়ার সাহসী সিদ্ধান্তকে।
