মূল সমস্যাকে স্পর্শ না করিয়া কেবলমাত্র টাকা-পয়সা ঢালিয়া সাত দশকের পুরানো ফিলিস্তিন সংকট সমাধানের অভিনব এক পরিকল্পনা হাজির করিয়াছে আমেরিকা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার হইতেছেন এই পরিকল্পনার মুখ্য চরিত্র। মঙ্গলবার বাহরাইনের রাজধানী মানামাতে ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের অনুপস্থিতিতে ‘পিস টু প্রসপারিটি’ শীর্ষক পরিকল্পনাটি উপস্থাপন করেন কুশনার। এই পরিকল্পনাতে, ফিলিস্তিন ও ইহার সীমান্তসংলগ্ন তিন দেশ জর্দান, মিশর ও লেবাননে প্রাথমিকভাবে ৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের জন্য দাতা-সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হইয়াছে। উল্লেখ্য, প্রতিবেশী এই দেশগুলিতে দশকের পর দশক ধরিয়া বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি শরণার্থী জীবন কাটাইতেছে। সদ্য পেশকৃত এই পরিকল্পনাটিকে ফিলিস্তিনিদের জন্য ‘শতাব্দীর সুযোগ’ হিসাবে বর্ণনা করিয়াছেন কুশনার। তাঁহার দাবিমতে, অর্থনৈতিক দিক হইতে অগ্রসর হওয়া ব্যতিরেকে ফিলিস্তিনি সংকটের সমাধান হইবে না। আবার এইক্ষেত্রে ইসরায়েলের নিরাপত্তা এবং ফিলিস্তিনি আত্মমর্যাদার সংরক্ষণকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে নতূন পরিকল্পনাতে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং আমেরিকা সর্বদাই ফিলিস্তিনিদের পাশে আছে বলিয়াও দাবি করেন কুশনার।
ফিলিস্তিন সংকটের প্রধানতম বিষয় হইতেছে রাষ্ট্র হিসাবে ফিলিস্তিনের স্বীকৃতি ও ইসরায়েল কর্তৃক ফিলিস্তিন ভূমিতে অবৈধ দখলদারিত্ব। লক্ষণীয় বিষয় হইতেছে, এই দুই সমস্যার বিষয়ে কুশনারের পরিকল্পনাতে তেমন কোনো প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হয় নাই। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ যে শুরুতেই এই পরিকল্পনাটি প্রত্যাখ্যান করিয়াছে তাহাতে আর বিচিত্র কী আছে? ফিলিস্তিনিরা অবশ্যই ট্রাম্পের মেয়াদের শুরু হইতেই আমেরিকার দিক হইতে নানা বিরূপতার মধ্য দিয়া যাইতেছে। উদাহরণস্বরূপ, গত দুই বত্সরের মধ্যে ফিলিস্তিনের জন্য আমেরিকার সাহায্য-সহযোগিতার মাত্রা নিম্নগামী হইয়াছে, জেরুজালেম ইসরায়েলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি পাইয়াছে এবং আমেরিকাতে ফিলিস্তিনের কূটনৈতিক মিশনটি বন্ধ হইয়া গিয়াছে। ফিলিস্তিন অবশ্য মিশন বন্ধের পূর্বেই ইসরায়েলের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আনিয়া ট্রাম্প প্রশাসনের সহিত যোগাযোগ বন্ধ করিয়াছে। কুশনারের পরিকল্পনাটি আরব দেশগুলির মধ্যেও তেমন কোনো আলোড়ন তুলিতে ব্যর্থ হইয়াছে। সৌদি আরব অবশ্য ইহার প্রতি নামেমাত্র সমর্থন ব্যক্ত করিতেছে। একটি রাজনৈতিক সমস্যাকে অরাজনৈতিক উপায়ে মোকাবিলা করিবার উদ্যোগ সাফল্য পাইবে না বলিয়াই মনে করিতেছেন বেশিরভাগ বিশ্লেষক।
কট্টর ডানপন্থি জায়নবাদী ও ইহুদি মৌলবাদীরা বর্তমানে ইসরায়েলের সরকার ও রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করিতেছে। ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে আগমন ইহাদের জন্য সোনায় সোহাগা হইয়াছে। এই দুই গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্রমাগত সংকট সমাধানের পথ-স্বরূপ বিবেচিত ‘দুই রাষ্ট্র’ ধারণা হইতে সরিয়া আসিতেছেন। ইসরায়েল বর্তমানে ‘এক রাষ্ট্র’ ধারণাটিকে শক্তিশালী করিয়া ফিলিস্তিনিদের জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইস্যুটিকে দূরে ঠেলিয়া দিতে চাহিতেছে। আমলতান্ত্রিকতা ও দুর্নীতিতে জেরবার ফিলিস্তিনের ক্ষমতাসীন ফাতাহ পার্টি বর্তমানে ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদ চাঙ্গা করিবার ক্ষেত্রে তেমন কোনো লক্ষণীয় ভূমিকা রাখিতে পারিতেছে না। অন্যদিকে, ফাতাহর হাত হইতে গাজার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণকারী হামাসের উগ্রপন্থি ভাবমূর্তি, ফিলিস্তিন আন্দোলনকে বেশ খানিকটা ক্ষতিগ্রস্ত করিতেছে। এমতাবস্থায়, ফিলিস্তিনের ভবিষ্যত্ ভাবিলে শঙ্কা জাগিতে বাধ্য।
