রেলপথেও নিরাপত্তাহীনতার ছায়া

আপডেট : ২৭ জুন ২০১৯, ২১:৪০

অনেকটাই নিরাপদ, আরাম ও স্বস্তিদায়ক মনে করে সাধারণ মানুষ যাতায়াতের ক্ষেত্রে রেলকেই সর্বাগ্রে বেছে নিতে চায়। কিন্তু বাংলাদেশ রেলওয়ে নানা কারণে যাত্রীদের আস্থা হারানোর পাশাপাশি এখন অনিরাপদ হিসেবেও চিহ্নিত। যাত্রীসেবার মান নিয়ে অন্তহীন প্রশ্ন তো আছেই, একইসঙ্গে রেলওয়ের আধুনিকায়ন এবং রেলপথ উন্নতকরণের দৃশ্যত উদ্যোগ-আয়োজনও যেন লোক দেখানো বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুলনামূলক নিরাপদ বাহন হিসেবে বিবেচনা করে মানুষ ট্রেনে ভ্রমণ করতে আগ্রহী হলেও একের পর এক দুর্ঘটনা প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে—সড়কপথের মতো রেলপথও কি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে?

২৩ জুন রাত প্রায় সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকাগামী আন্তঃনগর ট্রেন উপবন এক্সপ্রেস বরমচাল অতিক্রম করে কুলাউড়া আসার পথে বড়ছড়ায় কালভার্ট ভেঙে পেছনের পাঁচটি যাত্রীবাহী বগি খালে পড়ে যায়। ঐ দুর্ঘটনায় চারজন নিহত ও শতাধিক যাত্রী আহত হয়। এই ঘটনার কয়েক দিন আগে বিভিন্ন রেলপথে ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা ঘটলেও সৌভাগ্যক্রমে আমাদের মর্মন্তুদ ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়নি। ঐসব ঘটনাকে সৌভাগ্যক্রমে রক্ষা পাওয়া হিসেবে বিবেচনা করা হলেও রেলপথে যাতায়াতকারীদের উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার বৃত্তবন্দি করেছে। সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রে বলা হয়েছে, ট্রেনটি কুলাউড়ার বড়ছড়ায় সেতু অতিক্রম করার সময় অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ সহ্য করতে না পারায় ঐ দুর্ঘটনা ঘটে। এই যুক্তি মানা যায়? বরং রেলসচিব যে দুটি সম্ভাব্য কারণ নির্দেশ করেছেন, তা আমলে নেওয়ার মতো। তাঁর মতে, হয় রেললাইনে ত্রুটি ছিল, নয়তো দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনের বগির চাকায় সমস্যা ছিল। তার কারণগুলো আমলে নিয়ে এক কথায় বলা যায়—রক্ষণাবেক্ষণের অভাব হলো অন্যতম একটি সমস্যা।

বাংলাদেশ রেলওয়েতে অনিয়ম, দুর্নীতিসহ বহুবিধ অসংগতির খবর গণমাধ্যমে প্রায়ই প্রকাশিত হয়ে থাকে। কুড়াউড়ায় দুর্ঘটনাকবলিত আন্তঃনগর উপবন এক্সপ্রেসটি সেদিন হয়তো আরো ভয়াবহ রকমের দুঃসহ ঘটনার স্মারক হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু খালে পানি কম থাকার কারণে মর্মান্তিকতার ছায়া দীর্ঘ হয়নি। এই ঘটনাটি এমন সময় ঘটল, যখন ঢাকা-সিলেট সড়কপথে শাহবাজপুরে ব্রিজ ভেঙে যাওয়ার কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত ছিল। অসংখ্য মানুষ এজন্য সংকটে পড়ে। তাছাড়া এখন রেলপথের উন্নতির জন্য বরাদ্দ, জনবল বাড়ানো হচ্ছে। পরিকল্পনা চলছে বাংলাদেশের রেলপথ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যুক্ত করার। কিন্তু রেল খাতের যে বিবর্ণ চিত্র ভাবনার নতুন উদ্রেক ঘটিয়েছে তাতে প্রশ্ন দাঁড়ায়—এত বড় কর্মযজ্ঞ সম্পন্নের পথ কতটা মসৃণ হবে?

২১ জুন গাজীপুরে লাইনচ্যুত হয়েছিল রংপুর এক্সপ্রেস। এর আগের সপ্তাহে কিশোরগঞ্জে লাইনচ্যুত হয়েছিল আরো একটি ট্রেন। আমরা যদি পেছনের দিকে তাকাই, তাহলে এই তালিকা আরো দীর্ঘই হবে। মেয়াদোত্তীর্ণের ভারে রেলওয়ে জর্জরিত।  সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেলওয়ের ৯০ শতাংশ সেতু মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ! সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ২৮ হাজার ৭৮ কিমি. রেলপথে ৩ হাজার ৬২৯টি ছোটো-বড়ো সেতু রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৩ হাজার ২৪০টি সেতুই ঝুঁকিপূর্ণ! অন্য উন্নত দেশের কথা বাদ দিলেও আমরা যদি আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের দিকে তাকাই তাহলেও দেখব তাদের রেলপথ যতটা দক্ষতা, দূরদর্শিতা, পরিকল্পনা ও আন্তরিকতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে, আমাদের দেশে তা সম্ভব হচ্ছে না। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের রাষ্ট্রীয় এই পরিবহন খাতটি বহুবিধ নেতিবাচক কারণে লোকসানের বোঝায় শ্বেতহস্তীতে পরিণত হয়েছে। বিলম্বে হলেও সরকার যখন সীমাহীন অনিয়ম-অবহেলার পর রেলের অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনতে মনোযোগী হয়েছে তখনো সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন নেতিবাচকতার। এতসব ঝুঁকি জিইয়ে রেখে মানুষের হূত আস্থা পুনরুদ্ধারের কাজটি সহজ নয়।

আমরা জানি না, কুলাউড়ার ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহল ভবিষ্যতের জন্য যথার্থ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে কি না। যদি তা না হয়, তাহলে ঝুঁকি আরো প্রকট হয়ে উঠবে। নিশ্চয়ই এমনটি আমাদের কাম্য হতে পারে না। যখন একের পর এক এমন ঘটনা ঘটতে থাকে, তখন তা নিশ্চিতভাবেই ভীতিকর বাস্তবতায় রূপ নেয়। তাই উদাসীনতা, দায়িত্বহীনতা, অদূরদর্শিতার খতিয়ান আর বিস্তৃত না করে ত্বরিত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এত ঝুঁকি রেখে উন্নয়নের পথ নিষ্কণ্টক করা দুরূহ। বাংলাদেশ রেলওয়ে এতদিন চলেছে জোড়াতালি দিয়ে আর এখন এর পুনরুজ্জীনের যখন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে কিংবা হচ্ছে তাও প্রশ্নমুক্ত নয়। ব্যবস্থায় গলদ রেখে আর যা-ই হোক, অবস্থার উন্নতি আশা করা যায় কি?  পৃথক মন্ত্রণালয় করেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় এ খাতের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হয়নি। এ খাতের উন্নয়ন কিংবা সংস্কারে যেসব পরিকল্পনা ইতিমধ্যে গৃহীত হয়েছে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াও প্রত্যাশা মোতাবেক গতিশীল নয়। উল্লেখ্য, অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ বেড়েছে। এবারের বাজেটেও সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত খাত বলতে গেলে অবকাঠামো উন্নয়ন। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, সেখানে নতুন অবকাঠামো নির্মাণে বেশি নজর দেওয়া হয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ সেতু বা রেললাইন নির্মাণ কিংবা পুনর্নির্মাণের চেয়ে নতুন স্টেশন নির্মাণে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে গতি আরো কমে আসছে রেলের আর এজন্যই নিরাপত্তাহীনতার ছায়া হচ্ছে দীর্ঘ।

n লেখক : কলাম লেখক ও গবেষক