বেসরকারি খাতে এলএনজি বিক্রি করতে পারবেন আমদানিকারকরা

আপডেট : ২৭ জুন ২০১৯, ২২:৫৮

বেসরকারিভাবে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানির অনুমোদন দেওয়ার পর এবার সেই আমদানিকৃত গ্যাস বেসরকারি খাতে বিক্রির অনুমোদন দিতে যাচ্ছে সরকার। কয়েকটি প্রাইভেট কোম্পানি এলএনজি আমদানি করে সরবরাহ এবং বাজারজাত করার আগ্রহ প্রকাশ করার পর এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত নীতিমালা চূড়ান্তও করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এখন সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নের কারিগরি প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন ফি নির্ধারণ নিয়ে আলাদা করে চিন্তা-ভাবনা চলছে।

দেশে বর্তমানে এলএনজি আমদানি করছে সরকারি সংস্থা পেট্রোবাংলা এবং বেসরকারি কোম্পানি সামিট। বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী সরকারি বা বেসরকারি— যারাই এলএনজি আমদানি করুক তারা রূপান্তরিত গ্যাস পেট্রোবাংলার কাছে বিক্রি করে। পেট্রোবাংলা তা সরকারি বিতরণ কোম্পানির মাধ্যমে গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহ করছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী আমদানিকারক কোম্পানিগুলো সরাসরি নিজেদের শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বা অন্য কোম্পানির কাছে এলএনজি বিক্রি-সরবরাহ করতে পারবে। এ জন্য সরকারের পাইপলাইন বা সঞ্চালন-বিতরণ অবকাঠামো ব্যবহার করবে তারা। এক্ষেত্রে পাইপলাইন ব্যবহারের জন্য পৃথক ফি-মাশুল দিতে হবে। পেট্রোবাংলা সংশ্লিষ্ট কোম্পানি জিটিসিএল’র মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করবে।

জ্বালানি বিভাগের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, পেট্রোবাংলা এবং সামিটের বাইরে আরো অন্তত আটটি দেশি-বিদেশি কোম্পানি এলএনজি আমদানির জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। শুধু পেট্রোবাংলার মাধ্যমে গ্যাস বিক্রি-বিতরণে দীর্ঘসূত্রতা তৈরির পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে গ্যাস সরবরাহে জটিলতা তৈরি করে বলে তারা দাবি করছেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আমদানিকৃত এলএনজি সরবরাহ এবং বাজারজাতকরণের আগ্রহের প্রতি সরকার ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। এছাড়া সারাদেশে ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এগিয়ে চলছে। এতো বিস্তৃত এলাকায় দ্রুত গ্যাস সরবরাহে বেসরকারি অংশগ্রহণ সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ঐ কর্মকর্তা আরো জানান, বেসরকারি পর্যায়ে এলএনজি বেচাকেনার মূল্যহার নিয়ে সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করবে না।

বেসরকারি পর্যায়ে এলএনজি আমদানি নীতিমালা ২০১৯ অনুযায়ী, এলএনজি আমদানিকারকের বিদ্যুত্-জ্বালানি-ভারী শিল্প খাতে প্রকল্প নির্মাণ বা পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। অথবা আমদানিকারক কোনো তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে কনসোর্টিয়াম গঠন করে থাকলে ঐ অংশীদারের এলএনজি খাতে প্রকল্প নির্মাণ বা পরিচালনার কমপক্ষে ৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এরপর সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর হতে এলএনজি এবং রূপান্তরিত এলএনজি পরিবহন ও রিফুয়েলিংয়ের অনুমতি নিতে হবে।

পেট্রোবাংলার পূর্বানুমতি নিয়ে বেসরকারি উদ্যোক্তারা সংস্থাটির সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন ব্যবহার করে গ্যাস সঞ্চালন-সরবরাহ করতে পারবে। এক্ষেত্রে পৃথক হুইলিং চার্জ (পাইপলাইন ব্যবহারের মাশুল) নির্ধারণ করা হবে এবং তা পরিশোধ করতে হবে। এলএনজি আমদানি, সরবরাহ ও প্ল্যান্ট নির্মাণের জন্য প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ন্যাশনাল হাইড্রোগ্রাফিক কমিটি, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, বন্দর কর্তৃপক্ষ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনাপত্তি গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজন হবে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের লাইসেন্সও।

এছাড়া বেসরকারি আমদানিকারককে নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য প্রতি বছর যে পরিমাণ জ্বালানির প্রয়োজন হবে তার যৌক্তিকতাসহ প্রাক্কলন সরকারকে জানাতে হবে। আর অন্যদের কাছে বিক্রির ক্ষেত্রে ঐ গ্রাহকের নাম, ঠিকানা ও চাহিদাকৃত জ্বালানির পরিমাণ জানাতে হবে।  

পেট্রোবাংলা ও সামিটের ভাসমান টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ৬০ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় পাইপলাইন নির্ধারিত সময়ে নির্মিত না হওয়ায় আরো ৪০ কোটি ঘনফুট গ্যাস গ্রাহকপর্যায়ে বিতরণ করা যাচ্ছে না।

শিল্প উন্নয়ন বৃদ্ধি এবং দেশীয় গ্যাসের মজুদ কমার কারণে এলএনজির চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। এর বাইরে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ উত্পাদনেও জোর দিয়েছে সরকার। কিন্তু কয়লা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। সেই ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের জন্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবে এলএনজির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পেট্রোবাংলার প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৪১ সাল নাগাদ দেশে বার্ষিক ৩ কোটি টন এলএনজি আমদানির প্রয়োজন হবে।