শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ৭ আশ্বিন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

সংবিধানে অটল থাকলে নির্বাচনের বিকল্প নেই

  • কেউ আসুক বা না আসুক নির্বাচনের বাইরে আর কিছুই ভাবছে না আওয়ামী লীগ
  • ১ নভেম্বর থেকে ৯০ দিনের হিসাব শুরু
  • নভেম্বরের প্রথমার্ধে নির্বাচনের তপসিল, গঠিত হতে পারে নির্বাচনকালীন সরকার
  • তবে সংসদ ভেঙে দেওয়া হলে নির্বাচন পেছাতে পারে
আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৮:০০

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপিসহ দলটির মিত্র জোট-দলগুলো সরকারের পদত্যাগ দাবিতে এক দফার আন্দোলনরত। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ছাড়া নির্বাচনে না যাওয়ার কথা বলছে বিএনপি ও তাদের বন্ধুবলয়। আর কিঞ্চিত পরিমাণও অস্পষ্টতা না রেখে আওয়ামী লীগের পরিষ্কার অবস্থান-সংবিধান অনুযায়ীই যথাসময়ে নির্বাচন। রাজনীতির ময়দানের প্রধান দুই প্রতিপক্ষের বিপরীত অবস্থানে আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে জনমনেও হরেক প্রশ্ন। রাজনীতির বাইরে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ধরনের তৎপরতা জনমনে সৃষ্ট প্রশ্নকে আরও জটিল করে তুলছে। ঘুরেফিরে সর্বত্র একটাই প্রশ্ন, কী হতে যাচ্ছে? রাজনীতি, কূটনীতি, ভূরাজনীতি ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের অভিন্ন মত, বিদ্যমান সংবিধান অটল থাকলে নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো বিকল্প নেই।

বর্তমান একাদশ সংসদের ২৪তম অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৃহস্পতিবার সংসদে বলেছেন, ‘অক্টোবরে চলতি সংসদের আরেকটি অধিবেশন বসবে। সেটিই হবে শেষ অধিবেশন। এরপর আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে।’ সরকারপ্রধানের এই বক্তব্যের সারকথা, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের পথে এগোচ্ছে সরকার ও আওয়ামী লীগ।

সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাংগিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে; এবং মেয়াদ-অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার  ক্ষেত্রে ভাংগিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে।’

চলতি একাদশ সংসদের প্রথম বৈঠক বসেছিল ২০১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি। সেই হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছরের ২৯ জানুয়ারি। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ বহাল রেখে ২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারি থেকে এর পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যে কারণে, এ বছরের ১ নভেম্বর থেকে সেই ৯০ দিন গণনা শুরু হবে। সেই ৯০ দিনের আগে সময় রয়েছে আর মাত্র ৪৩ দিন। সংবিধানে থাকা নির্বাচনি সময়সীমা অনুযায়ী এই ৪৩ দিন পরেই শুরু হয়ে যাবে নির্বাচনের ক্ষণ গণনা।

নির্বাচন কমিশনার (ইসি) মো. আনিছুর রহমান গতকাল রবিবার বলেছেন, আগামী বছর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নির্বাচন হবে, আর নভেম্বরের প্রথমার্ধে তপসিল ঘোষণা করবে ইসি। এর আগে গত ৯ আগস্ট এই কমিশনারই সাংবাদিকদের বলেছেন, আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপসিল নভেম্বরের যে কোনো দিন ঘোষণা করা হবে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘আমরা সাধারণত ভোটগ্রহণের দিনের আগে ৪০ থেকে ৪৫ দিন সময় হাতে রেখে তপসিল ঘোষণা করে থাকি। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ বা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে হবে। এই সময় ধরে যথাসময়ে তপসিল ঘোষণা করা হবে।’

বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ীই জানুয়ারির মধ্যে না করে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যেও নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ রয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে মেয়াদপূর্তির আগে সংসদ ভেঙে দিতে হবে। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদেই এ ব্যাপারে বলা আছে, মেয়াদ-অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ যেদিন সংসদ ভাঙবে, তার পরের ৯০ দিনের মধ্যে ভোট করতে হবে। যদি ধরে নেওয়া হয় যে, কোনো কারণে জানুয়ারিতে মেয়াদ শেষের আগেই সংসদ ভেঙে দেওয়া হলো, তাহলে সেক্ষেত্রে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। 

সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের (৩) দফার (ক) উপ-দফা অনুযায়ী, সংসদ আহ্বান, স্থগিত ও ভেঙে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত হলেও রাষ্ট্রপতি তার এ দায়িত্বটি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী পালন করে থাকেন। সংসদের মেয়াদ হলো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান-পরবর্তী প্রথম বৈঠকের তারিখ থেকে পাঁচ বছর; তবে এক্ষেত্রেও মেয়াদ পূর্তির আগে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে সংসদ ভেঙে দিতে পারেন।

সংবিধানে এ-ও বলা আছে, সংসদের মেয়াদ পাঁচ বছর হলেও প্রজাতন্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত থাকাকালে সংসদের আইন দ্বারা এর মেয়াদ এককালে অনধিক এক বছর বৃদ্ধি করা যায়; তবে যুদ্ধ শেষ হলে বর্ধিত মেয়াদ কোনোক্রমে ছয় মাস অতিক্রম করতে পারবে না। আবার সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর এবং সংসদের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে রাষ্ট্রপতির কাছে যদি সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হয় যে, প্রজাতন্ত্র যে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে, সে যুদ্ধাবস্থার বিদ্যমানতার জন্য সংসদ পুনঃ আহ্বান করা প্রয়োজন, তাহলে যে সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, রাষ্ট্রপতি সেটি আহ্বান করবেন। এক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্যসম্পন্ন করতে হয়।

তবে, সরকার ও আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংবিধানের এসব বিকল্প নিয়ে সরকার কিংবা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ একদমই ভাবছে না। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের স্পষ্ট করেই বলেছেন—সংসদ ভাঙবে না, সংবিধান অনুযায়ী সংসদের মেয়াদ পূর্তির পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি এটাও বলেছেন, কেউ আসুক আর না আসুক—যথাসময়েই নির্বাচন, নির্বাচনি ট্রেন কারো জন্য থেমে থাকবে না।

গত ২১ জুলাই রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর সভায় ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আমাদের নির্বাচন হবে আমাদের নিয়মে, সংবিধানে যেভাবে লেখা আছে। বিএনপির দাবি একটাই—শেখ হাসিনার পদত্যাগ। শেখ হাসিনার পদত্যাগ মানে সংবিধানের চরম লঙ্ঘন। আমরা সংবিধান লঙ্ঘন করতে পারি না। একই দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় খাড়েরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিশেষ বর্ধিত সভায় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি আর কখনোই ফিরবে না। ঐ দিনই কুড়িগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় যোগদানের আগে সেখানে সার্কিট হাউজে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ীই নির্বাচন হবে। সংবিধানের এক চুলও ব্যত্যয় হবে না।

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, ১ নভেম্বর থেকে নির্বাচনি ক্ষণ গণনা শুরু হওয়ার পর ঐ মাসের শুরুতে মন্ত্রিসভা ছোট করে আনতে পারেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যদিও সংবিধানে নির্বাচনকালীন সরকার বলতে কিছু নেই, তারপরেও নির্বাচনকালীন সরকারের আদলে ছোট মন্ত্রিসভা গঠন করতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘সংসদে যেসব দল রয়েছে তারা রাজি থাকলে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোকে নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা যেতে পারে।’

প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যের বিষয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ইত্তেফাককে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের উদ্যোগ নিলে এবং তাতে আমাদেরকে বা আমাদের দলকেও যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হলে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। আমরা বিষয়টাকে ইতিবাচকভাবেই নেব।’ ১৪ দলের আরেক শরিক জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুও ইত্তেফাককে বলেন, নির্বাচনকালীন সরকারে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানালে জাসদ সেটিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করবে।

এদিকে, সংবিধানের ৭২(১) অনুচ্ছেদ মোতাবেক সংসদের একটি অধিবেশন শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে পরবর্তী অধিবেশন ডাকার বাধ্যবাধকতা আছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর সংসদের ২৪তম অধিবেশন শেষ হয়েছে। সংসদনেতা ও প্রধানমন্ত্রী বৃহস্পতিবার সংসদেই বলেছেন, অক্টোবরে চলতি সংসদের শেষ অধিবেশন বসবে।

একটি অধিবেশন শেষ হওয়ার দিন এবং পরবর্তী অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের মধ্যে ৬০ দিনের বেশি বিরতি দেওয়া যাবে না বলা থাকলেও সংবিধানে এটাও বলা হয়েছে, তবে এই বিধান সংসদের মেয়াদ পূর্তির আগের ৯০ দিনের (পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়) ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সে হিসাবে আগামী ২৫তম অধিবেশনের পর আর সংসদের অধিবেশন ডাকার কোনো সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকবে না। 

প্রসঙ্গত, বিগত দশম সংসদের শেষ বৈঠক বসে ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর। ঐ বছরের ৮ নভেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনের তপসিল ঘোষণা করেছিল নির্বাচন কমিশন এবং ৩০ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণ হয়।

ইত্তেফাক/এমএএম